গত ৩রা মে হেফাজতের সমাবেশে ব্লাসফেমী আইন চাওয়া হয়েছে ব্লাসফেমী আইন- ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে বৈধতা বিচার ও একটি অর্šÍভেদী বিশ্লেষণ (২য় পর্ব)
, ০৯ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ০৯ ছানী আ’শার, ১৩৯২ শামসী সন , ০৮ মে, ২০২৫ খ্রি:, ২৫ বৈশাখ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মন্তব্য কলাম
উপরোক্ত বক্তব্যের পেছনে যুক্তি অনেক। কারণ আজ যারা ব্লাসফেমী আইনের দাবি তুলছে, ব্লাসফেমী আইনের বৈধতা বাদ দিয়েও যে কথাটি তাদের বলতে হয় যে, এক্ষেত্রে তারা কেবলই দাবিদার।
বলাবাহুল্য, এ দাবি তারা উত্থাপন করেছে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং সেটা আদায়ের বা ব্লাসফেমী আইন পাশের যে রূপরেখা তারা দিয়েছে, তা হলো- সংসদে ভোটের দ্বারা পাশের মাধ্যমে অর্থাৎ এটাও ঐ একই গণতান্ত্রিক রীতিতেই। আর তাদের দাবি মেনে নেয়ার মালিক হলো, কার্যতঃ গণতান্ত্রিক সরকার। তাহলে এ অবস্থায় তারা দু’টো জিনিস প্রমাণ করলো- (১) তারাও ইসলামপন্থী নয়, তারাও গণতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী। (২) এ আইন পাশ হলে তারা ধর্ম রক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে বলে তারা স্বস্তি পাবে। অর্থাৎ এই প্রচলিত পাশ্চাত্য গণতন্ত্রও সার্বিকভাবে দ্বীন ইসলাম পালনের ব্যবস্থা করতে পারে, এই বিশ্বাসেই তারা বিশ্বাসী। আর সে ক্ষেত্রেও তাদেরকে যারা কামিয়াবী পাইয়ে ছিলো, তারা হলো- দেশের উঠতি কিছু মুরতাদ। কিন্তু কথা হলো- যদি এই মুরতাদ গোষ্ঠীর অভূদ্যয় না হতো বা দেশে পূর্ব থেকেই ব্লাসফেমী আইন প্রবর্তিত থাকতো অথবা এখনও যদি ব্লাসফেমী আইন পাশ হয় কিংবা ভবিষ্যতে হয়, তাহলেও কি তাদের কিছুই করার ছিলো না বা থাকবে না? যদি থেকে থাকে, তাহলে তো বুঝতে হবে যে, এরা মূল লক্ষ্যকে বাদ দিয়ে সামান্য বিষয়কে নিয়েই মাতামাতি করছে বা মেতে আছে। অথবা মূল লক্ষ্যকে উপলব্ধি করতে এবং এর দিক নির্দেশনা মূল্যায়ন করতে বা করাতে বিশেষভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
বলাবাহুল্য, এই মূল লক্ষ্যটি নতুন কিছুই নয়। খিলাফত কায়িমের জন্য কোশেশ হিসেবে যা সকলেই অবগত। তবে এ কোশেশটা যে অবশ্যই গণতান্ত্রিক আর কমিউনিস্ট পদ্ধতিতে নয়, হরতাল, ঘেরাও, লংমার্চ, গাড়ী ভাংচুর, গজারীর লাঠি দিয়ে মাথা ভেঙে, ছবি তুলে, ভিডিও করে, আর রাস্তায় বেপর্দা মহিলাদের মিছিল করিয়ে নয় বরং কেবলমাত্র দ্বীন ইসলাম নির্দেশিত মতে ও পথেই চালিত হতে হবে। আবার ব্লাসফেমী আইনের দাবি জানিয়ে, “পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ও সার্বিকভাবে ইসলাম পালনের ব্যবস্থা করতে পারে, এই বিশ্বাসে তারা বিশ্বাসী হলেও ব্যাপারটি কিন্তু আদৌ তা নয়।
গণতান্ত্রিক সরকারের সংবিধানের আওতায় সকল ধর্মীয় দাবি কখনও পূরণ সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের সংবিধানের কথা বলা যায়। কারণ, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ (২) মতে, “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তা হলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে।
“আবার ২৬ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এ ভাগ বর্ণিত প্রচলিত মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইনের বিরোধীয় অংশ বাতিল হবে।
২৬ (২) অনুচ্ছেদ মতে রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের বিরোধীর কোন আইন প্রবর্তন করবে না এবং এরূপে কোন আইন প্রণীত হলে, তা মৌলিক অধিকারের বিধানের সাথে যতটুকু অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততটুকু বাতিল হবে।
সুতরাং দেখা যায়, এদেশের বিচার কাঠামোতে সংবিধানের পরিপন্থী কোন আইন প্রয়োগ হবে না, তা যতই ধর্মীয় হোক বা চিরন্তন ঐতিহ্যবাহী হোক। পক্ষান্তরে ধর্মের পরিপন্থী কোন আইন সংবিধানের থেকে বাদ যাবে না, যদি তা সংবিধানে গৃহীত হয় এবং বলাবাহুল্য এরূপ আইনের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তাই এ সম্পর্কিত বিরোধ উত্থাপিত হয়েছে বহুক্ষেত্রে। যেমন- মুসলিম বিবাহ আইন, মুসলিম উত্তরাধিকার ও মিরাস আইন, মুসলিম তালাক আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনসহ আরো বহু আইন। পক্ষান্তরে ইসলামিক ফৌজদারী আইন, দেওয়ানী আইন, শ্রম, ঋণ, শেয়ার বলতে গেলে প্রায় সিংহভাগ মুসলিম আইনেরই কোন প্রয়োগ বাংলাদেশের সংবিধানে নেই।
তো এসব ক্ষেত্রে কথিত ব্লাসফেমী আইনের দাবিদারদের কি করার আছে? কাজেই এতসব কিছু বাদ দিয়ে কেবলমাত্র হুজুগে মেতে ব্লাসফেমী আইনের জন্য হৈ চৈ করা কি তাদের নিরেট অন্তঃসারশুন্যতা প্রমাণ করে না? এবারে- যে বিষয়টি বাদ দিয়ে এতক্ষণে আলোচনা করা হলো, তার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হয়। এটি হলো- ব্লাসফেমী শব্দটি কখনই ইসলামে গৃহীত হতে পারে না। কারণ বিজাতীয় খৃস্টানদের দ্বারা এর উৎপত্তি এবং এ সম্পর্কে এই বিজাতীয় কৃষ্টি কালচার বা তাদের করা নামকরণ নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে? ইতিমধ্যে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফে বহুবার বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে এবং একই কারণে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে- লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ ইত্যাদি। (আগ্রহী পাঠক চাইলে তা পড়ে নিতে পারেন) তবে হ্যাঁ ইসলামী খিলাফত থাকলে অবশ্যই মুরতাদদের জন্য শাস্তি নির্ধারিত হতো কিন্তু কখনই তা ব্লাসফেমী আইন নামে নয় বরং তা ইসলামের নিজস্ব শষ্য ভান্ডার থেকেই সেটা ঘোষিত হতো।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য আজ যারা ব্লাসফেমী আইন চাইছে, তারা কখনও ভেবে দেখেছে কি? যে তারা দ্বীন ইসলামের নামে অন্যায় কুৎসা রটনা করছে। এটা এই অর্থে যে, যেহেতু তারা খৃস্টানদের থেকে ধার করা ব্লাসফেমীকেই মুরতাদ দমনের আইন হিসেবে চাচ্ছে, সেহেতু তাদের কারণে সম্মানিত ইসলামকে অপূর্ণ বলে সাব্যস্ত করা হয়। অথচ দ্বীন ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। এমন কিছু নেই যা এতে বর্ণনা করা হয়নি।
আবার এখানেই ইতি নয়। দুঃখজনক বোধহীনতার ব্যাপার রয়েছে আরও। একটু তলিয়ে দেখলে বিষয়টি ধরা পড়তো তাদের কাছেও। কিন্তু না, তারা এখনও উপলব্ধি করতে পারছে না যে, যেই ব্লাসফেমীর কারণে খৃস্টানরা কাউকে মৃত্যুদ- দিয়ে নরকী বলে অভিহিত করে, সেই মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ব্যক্তিই আবার শাহাদাতের মর্যাদা পেয়ে বেহেশতে স্থান পেতে পারেন। যদি সে খৃস্টানদের কল্পিত যীশুর বিরুদ্ধে কথা বলে ইসলাম গ্রহণ করে এবং এটা কেবল নিছক কল্পনাই নয়। এর ঐতিহাসিক সত্যতাও রয়েছে- প্রমাণ ইসাবেলার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী এতে জানা যায় যে, ইসলাম প্রীতির কারণে ইসাবেলাকে তথাকথিত ইনকুইজিশন সেন্টারে নিপীড়িত হতে হয়েছিলো। আর এই ইনকুইজিশন নামের কুখ্যাত ধর্মীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করে পোপ নবম গ্রেগরি ১২৩৩ সালে। যার কাজ ছিলো, ব্লাসফেমী আইনে ধর্মদ্রোহীতাকে শাস্তি দেয়া। যে ক্ষেত্রে ইসলাম গ্রহণ করলেও ধর্মদ্রোহী হিসেবেই বিবেচিত হতো। কাজেই আজ যারা উচ্চকন্ঠে ব্লাসফেমীর আইন বাস্তবায়নের প্রচার করছে, তাদের উচিত অজ্ঞানতার কূপমন্ডক থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ঈমানকে হিফাজত করা এবং মানুষের ঈমান নষ্ট হতে না দেওয়া। আর এজন্য দরকার ছহীহ সমঝ ও সঠিক ইলিম। তাদের জেনে রাখা উচিত যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেও কুরাইশরা সাবী ধর্মত্যাগী বলত। আর কুরাইশদের সাবী হওয়ার কারণে শাস্তি দেয়া আর খৃস্টানদের কারণে ব্লাসফেমীর আওতায় শাস্তি দেয়ায় কোন পার্থক্য নেই। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে, “সমস্ত কাফিরের ধর্ম এক।
পরিশেষে আরেকটি পবিত্র হাদীছ শরীফ উদ্ধৃত করে শেষ করছি। আখিরী যামানা সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “আখেরী যামানায় অনুপযুক্ত অযোগ্য লোক সমাজের নেতা হয়ে বসবে। ” এর রেশ টেনে বলা যায়- আজ যারা ব্লাসফেমী আইনের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা ততোধিক অনুপযুক্ত অযোগ্য অবাঞ্ছনীয়, অস্পৃষ্ট? যতটা না ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে ঘৃণ্য এই খৃস্টানী ব্লাসফেমী আইন।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
আমেরিকা থেকে উচ্চমূল্যে বিষাক্ত গম আমদানি বন্ধ করতে হবে
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আইনি লেবাসে সন্ত্রাসী ইহুদিদের পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় হত্যাকা-: ইসরায়েলের বর্বরতা, আন্তর্জাতিক নীরবতা এবং আমাদের করণীয়
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও সার্বভৌমত্বের দুশমনদের অপতৎপরতা-উগ্র হিন্দুত্ববাদী ‘রবীন্দ্র ঘোষ’ ও ‘চিন্ময়’ চক্রের রাষ্ট্রদ্রোহী আঁতাত এবং প্রশাসনের জগৎশেঠদের মুখোশ উম্মোচন
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: একবিংশ শতাব্দীর কৌশলগত অপরিহার্যতা
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ইরান-সন্ত্রাসী আমেরিকা সন্ত্রাসী ইসরাইল যুদ্ধ: রহস্যময় ড্রোন, ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ও যুদ্ধ অর্থনীতির বাস্তবতা
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
জুলাই সনদের ওপর গণভোট আদৌ সংবিধান সম্মততো নয়ই; শুধু এতটুকুই নয় বরং তা আদৌ বাস্তবসম্মতও নয়। অভিজ্ঞমহল বলেন, নির্বাচন কমিশন জাতির সঙ্গে তামাশা করছে। এত জটিল হিসাব-নিকাশে কি গণভোট হয়?
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা: ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচার একমাত্র পথ
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জ্বালানি সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভরতায় জোর দেয়ার বিকল্প নেই
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে গ্যাস সংকট : টেকসই সমাধান দেশের গ্যাস কূপগুলো খনন করা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সার্বভৌমত্বের হিফাযতে বাংলাদেশের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি ও সরকারের জন্য ফরয
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












