মন্তব্য কলাম
বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: একবিংশ শতাব্দীর কৌশলগত অপরিহার্যতা
, ১৪ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৩ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ২০ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) মন্তব্য কলাম
৫১ কোটিরও বেশি মানুষের একটি দেশ হিসেবে, বিশে^র অন্যতম ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান করেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক সদিচ্ছা, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ছোট রাষ্ট্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার আশার উপর নির্ভর করে এসেছে। কিন্তু পুনরুজ্জীবিত মহাশক্তির প্রতিযোগিতা, ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক বিস্তার এবং দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর এই যুগে- সেই আশায় জাতি টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট ভিত্তি নয়। এখন সময় এসেছে বাংলাদেশে পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে একটি সৎ, নির্ভীক জাতীয় আলোচনার- উসকানি হিসেবে নয় বরং এমন এক বিশে^ যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া হিসেবে, যেখানে শক্তিকে পুরস্কৃত করা হয় এবং দুর্বলতাকে শাস্তি দেওয়া হয়।
তীক্ষè প্রান্তে দাঁড়ানো এক প্রতিবেশ :
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম পারমাণবিকীকৃত অঞ্চলে অবস্থিত। ভারত ও পাকিস্তান- দুটি রাষ্ট্র যাদের মধ্যে খোলা যুদ্ধের ইতিহাস, অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ এবং নিয়মিত সংকট রয়েছে- উভয়ের কাছেই উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার রয়েছে। এদিকে চীন, এশিয়ার প্রভাবশালী শক্তি, মিয়ানমারে তার কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগরে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে; পাশাপাশি সে নিজেও একটি ঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, যা তার সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়ন করছে। এমনকি বাংলাদেশের পূর্ব প্রতিবেশী মিয়ানমারও বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে, যার দ্বৈত-ব্যবহারের সম্ভাবনা উপেক্ষা করা যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে, উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা ও আয়তনের দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যার নিজস্ব কোনো পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা নেই এবং এমন কোনো নির্ভরযোগ্য জোট-নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও নেই যা তাকে সুরক্ষা দিতে পারে। ভারতকে প্রচলিত অর্থে প্রতিপক্ষ বলা না গেলেও, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অসমতা এমন পর্যায়ে যে তা যেকোনো কৌশলবিদের জন্য চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত। ফারাক্কা ব্যারাজ ইস্যু, তিস্তা পানি বণ্টনের অচলাবস্থা, সীমান্তে অভিবাসী ঠেলে দেওয়ার ঘটনা এবং ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাব নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ- এসব কোনো কল্পিত অভিযোগ নয়; বরং এটি বাস্তবসম্মত।
প্রচলিত বিকল্পের সীমাবদ্ধতা :
বর্তমান অবস্থার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে বাংলাদেশকে প্রচলিত সামরিক শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জাতিসংঘ ও সার্কের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থার সাথে সম্পর্ক গভীর করা এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার উপর নির্ভর করাই উচিত। কিন্তু এই যুক্তিগুলো গভীর বিশ্লেষণে টেকে না।
প্রচলিত সামরিক সমতা একটি মরীচিকা। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ভারতের তুলনায় অনেক কম এবং চীনের তুলনায় নগণ্য। কোনো বাস্তবসম্মত বিনিয়োগই এই ব্যবধান পূরণ করতে পারবে না। ইতিহাস দেখায়, যেসব রাষ্ট্র প্রচলিত সামরিক দুর্বলতায় ভুগেছে- যেমন ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান, ১৯৯০-এর দশকে উত্তর কোরিয়া- তারা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকেছে, কারণ এটিই একমাত্র প্রযুক্তি যা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। একটি ছোট পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার প্রতিপক্ষের প্রচলিত শক্তির সমান হতে হয় না; কারণ পারমাণবিক শক্তিই যথেষ্ট।
বহুপাক্ষিক নিশ্চয়তা প্রায়ই ফাঁপা প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারক, যেখানে ইউক্রেন তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেয়েছিল, আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। সেই নিশ্চয়তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০১৪ ও ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের সময় প্রতিশ্রুত নিরাপত্তা কেউ দিতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি স্পষ্ট শিক্ষা- কোনো চুক্তি, কোনো স্মারক বা কোনো জাতিসংঘ প্রস্তাব কখনোই নির্ভরযোগ্যভাবে একটি অ-পারমাণবিক রাষ্ট্রকে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিপক্ষ থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা আগ্রাসন প্রতিরোধ করে না। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশে^ ধারণা ছিল, বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা কমাবে। বাস্তবে তা বহুবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বরং ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নির্ভরতা ও চাপের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
ন্যূনতম বিশ^াসযোগ্য প্রতিরোধের কৌশলগত যুক্তি :
বাংলাদেশের জন্য বৃহৎ পারমাণবিক অস্ত্রভা-ারের প্রয়োজন নেই। “ন্যূনতম বিশ^াসযোগ্য প্রতিরোধ”নীতিই যথেষ্ট-অর্থাৎ এমন একটি সীমিত সংখ্যক অস্ত্র, যা প্রতিশোধমূলক আঘাতে শত্রুর জন্য অসহনীয় ক্ষতি নিশ্চিত করতে পারে। এই নীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা এবং সিদ্ধান্তের অধিকার:
এখানে একটি গভীরতর প্রশ্ন রয়েছে- সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) মূলত বড় শক্তিগুলোর পারমাণবিক একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখার একটি কাঠামো তৈরি করেছে। নিরস্ত্রীকরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি। বরং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্ত্রভা-ার আধুনিকায়ন করছে।
ফলে বর্তমান ব্যবস্থাটি কার্যত একটি দ্বিস্তরবিশিষ্ট বিশ^ব্যবস্থা তৈরি করেছে-যেখানে কিছু রাষ্ট্র পারমাণবিক প্রতিরোধের অধিকার রাখে, আর অন্যদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এটা কখনো ইনসাফ নয়। বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টা ফিকির করতে হবে।
বিশ^ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে নয়, বরং বিপরীত দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে তার আকার, জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
-মুহম্মদ শামসিত তাবরিজ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ইরান-সন্ত্রাসী আমেরিকা সন্ত্রাসী ইসরাইল যুদ্ধ: রহস্যময় ড্রোন, ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ও যুদ্ধ অর্থনীতির বাস্তবতা
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
জুলাই সনদের ওপর গণভোট আদৌ সংবিধান সম্মততো নয়ই; শুধু এতটুকুই নয় বরং তা আদৌ বাস্তবসম্মতও নয়। অভিজ্ঞমহল বলেন, নির্বাচন কমিশন জাতির সঙ্গে তামাশা করছে। এত জটিল হিসাব-নিকাশে কি গণভোট হয়?
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা: ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচার একমাত্র পথ
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জ্বালানি সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভরতায় জোর দেয়ার বিকল্প নেই
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে গ্যাস সংকট : টেকসই সমাধান দেশের গ্যাস কূপগুলো খনন করা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সার্বভৌমত্বের হিফাযতে বাংলাদেশের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি ও সরকারের জন্য ফরয
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঈমান ও ইজ্জত হরণে হিন্দুত্ববাদী নীল নকশা ‘ভগওয়া লাভ ট্র্যাপ’-সরকার ও জনতাকে সতর্ক হওয়া এখন সময়ের দাবি ও ফরয
৩০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাংলাদেশের বন্দর বিদেশিদের হাতে নয়, জাতির হাতেই থাক
৩০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ; একটি দেশ ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশে বাঙ্গালীদের বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য চালু হয়েছে কোটাপ্রথা, উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে সশস্ত্রবাহিনীও বিচারের আওতায়, পশ্চিমা অমানবিকতাকে প্রাধান্য।
২৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি
২৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খনিজ সম্পদে ভরপুর সোনার বাংলা। অথচ অনুসন্ধানের অভাবে অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে বেশীরভাগ খনিজ সম্পদ। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের অনাবিষ্কৃত তেল গ্যাসই দেশের চাহিদা মিটিয়ে দিতে পারে।
২৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












