স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন: স্পেনের কুরতুবা বা কর্ডোবা মসজিদ
, ১৫ই রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১৯ ছামিন, ১৩৯২ শামসী সন , ১৬ জানুয়ারী, ২০২৫ খ্রি:, ০২ মাঘ, ১৪৩১ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) স্থাপত্য নিদর্শন
বিজয় এবং আত্মগৌরব লুকিয়ে আছে স্পেনের ইতিহাসে। দেশটিতে ইসলামি স্থাপনার নিদর্শন রয়েছে। এর অন্যতম কুরতুবা মসজিদ যা কর্ডোবা মসজিদ বা কর্ডোবা ক্যাথিড্রাল মসজিদ নামেও পরিচিত। স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি ‘দ্যা গ্রেট মেজিকিতা অব কর্ডোভা’ নামে অধিক পরিচিত। মসজিদকে স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় মেজিকিতা।
খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় ১৯৮৪ সাল থেকে তারা মসজিদটিতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক প্রত্মতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে নাউযুবিল্লাহ!
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের মতে, বিস্ময়কর নির্মাণশৈলী এবং ব্যতিক্রমী কারুকার্যের কারণে মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য কীর্তি। অথচ এই মসজিদে এখন নামাজ আদায় করাও নিষেধ করে রেখেছে স্পেনের বিধর্মী সরকার। মসজিদটি বর্তমানে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, উমাইয়া খেলাফতের অন্যতম যুবরাজ প্রথম আব্দুর রহমান আল আন্দুলাসে প্রথম কর্ডোবা আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে আব্দুর রহমান তার খিলাফতের কেন্দ্র হিসেবে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে আব্দুর রহমান মারা যান। তখন মসজিদের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে ছিলো।
আব্দুর রহমানের মৃতুর পর তার ছেলে হিশাম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আব্দুর রহমান আদ দাখিলের প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্য তার মৃত্যুর পর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যে বহুমুখী সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে হিশাম এই মসজিদ নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শেষ করেন এবং এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৬০০ ফুট এবং প্রস্থ ৩৫০ ফুট। সকল উমাইয়া শাসক এই মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিলেন।
তারই ধারাবাহিকতায় দশম শতাব্দীতে শাসক ৩য় আব্দুর রহমান মসজিদের সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ শেষ করেন। মসজিদের সম্পূর্ণ আয়তন দাঁড়ায় এক লাখ দশ হাজার চারশো পনেরো ফুট। ১২৯৩টি স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো এই মসজিদে রয়েছে ৫০টি দরজা। এর পিলারের সংখ্যা ৮৫৬টি। এ ছাড়াও মসজিদ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে দামী মার্বেল পাথর, জেসপার এবং অনিক্স পাথর। মসজিদের নকশা করেছিলেন একজন সিরিয়ান স্থপতি।
পবিত্র মক্কা শরীফ উনার মসজিদুল হারাম শরীফের পরেই এটিকে বলা হতো দশম শতাব্দীর ২য় বৃহত্তম মসজিদ। এই মসজিদের সৌন্দর্য ও নকশা দেখে সে সময় বিশ্বে নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিলো। বিশেষ করে মসজিদের অন্যতম সৌন্দর্য ছিলো এর মিহরাব। ৩৬ হাজার কাঠের খ- এবং হাতির দাঁত দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো।
অমূল্য পাথরে নির্মিত মসজিদের মিম্বর তৈরিতে সময় লেগেছিলো ৭ বছর। এর পাশেই রয়েছে ১০৮ ফুট মিনার যেখানে যাওয়ার জন্য ছিলো ১০৭টি সিঁড়ি। মসজিদের মধ্যে ছোট বড় ১০ হাজার ঝারবাতি ছিলো। এর মধ্যে তিনটি ছিলো রুপার। প্রতিটি ঝারবাতিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৪৮০টি বাতি। রুপার ঝারবাতি ব্যবহার করতে তেল লাগতো ৩৬ লিটার। মসজিদ তদারকি করতেন ৩০০ জন খাদেম।
কুরতুবা মসজিদ ছিলো সে সময়ের মুসলমানদের শরীয়া আইন ও বিচারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই মসজিদে অনেকেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চা করতেন। বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তি ও তলিবে ইলিম তথা ছাত্ররা এখানে পবিত্র হাদীছ শরীফ ও কুরআন শরীফ শিখতেন। আল্লামা কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এখানে বসেই তাফসিরে কুরতুবী পাঠ করাতেন। শাইখুল আকবর সুফী ইমাম ইবনে আরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইলমে তাছাওউফের পাঠ দিতেন। হযরত ইবনে হাজাম জাহেরী ইলমে ফিক্বাহ’র মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা করতেন।
এভাবে প্রায় ৮০০ বছর মুসলমানরা ক্ষমতায় থাকার পর মুসলমানদের রাজত্ব হস্তচ্যুত হয়ে পড়ে। ১৪৯২ সালে খ্রিস্টানদের চক্রান্তে ক্ষমতা চলে যায় তাদের কাছে। এ সময় স্পেনের দক্ষিণে গ্রানাডা ছিলো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। তৎকালীন অত্যাচারী শাসক ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা এই অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালায়। তারা কুরতুবা মসজিদ দেখে বিস্মিত হয়। অনেকে মসজিদটি ভেঙে ফেলার পরামর্শ দিলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি। কারণ এমন স্থাপনা বিশ্বে খুব বেশি ছিলো না। তখন দখলদার খ্রিস্টানরা মসজিদে গির্জা স্থাপন করে। ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদের কেন্দ্র ভেঙে একটি গীর্জা বানানো শুরু করে তারা।
এরপর মসজিদে যেন কেউ নামাজ আদায় করতে না পারে এ জন্য বিশেষ বাহিনী নিয়োজিত রাখা হয়। তবে নামাজ আদায় করা নিষেধ হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দখলদারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। উপমহাদেশের অন্যতম ব্যক্তি আল্লামা ইকবাল তাদের অন্যতম।
১৯৩৩ সালে স্পেন সফরে এসে এই মসজিদ পরিদর্শন করেন আল্লামা ইকবাল। তিনি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন এবং উচ্চস্বরে আযান দেন এবং দুই রাকায়াত নামাজ আদায় করেন। বলা হয়ে থাকে প্রায় ৫০০ বছর পর এই মসজিদে আযান দেন তিনি। নামাজ পড়া অবস্থায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং জ্ঞান ফেরার পর দোয়া করতে থাকেন।
দুই হাজার সালের পর মুসলমানরা বারবার আন্দোলন করলেও এই মসজিদে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটির মালিকানা নির্ধারণ করার জন্য ২০১৫ সালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। যদিও তারা কোনো রায় দেয়নি। ২০১৯ সালে কর্ডোবার মেয়র এই মসজিদের মালিকানা নির্ধারণ কমিটির কাজ বন্ধ করে দেয় এবং ভবিষ্যতে এটি হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানায়।
-সংকলনে মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ফুলের মতোই সুন্দর মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় অবস্থিত পুত্রা মসজিদ
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৫ম পর্ব)
০১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান”
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (১ম পর্ব)
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (৩)
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (২)
১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (১)
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খেজুরের পাতায় লিখা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ
২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ
২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল সাক্ষী সাতৈর শাহী মসজিদ (১)
০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












