স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
, ২৬ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৭ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০২ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) স্থাপত্য নিদর্শন
প্রখ্যাত উসমানীয় ইতিহাসবিদ মুস্তাফা আলী’র মতে, ‘সুলতান সুলাইমান শুধুমাত্র একজন বিখ্যাত শাসকই ছিলেন না, সমভাবে উনার ছিলেন একজন প্রখ্যাত নির্মাতা, যিনি মুসলিম বিশ্বের কিছু চিত্তাকর্ষক, শ্বাসরুদ্ধকর ও অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার ইতিহাসে নিজের দীপ্ত চিহ্ন রাখতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন’। তাই সুলতান ‘সুলাইমানিয়াহ মসজিদ কমপ্লেক্স’কে বিশ্বের সবচেয়ে নয়নমনোহর, অভিজাত ও মার্জিত ভবনগুলির মধ্যে একটি বানাতে চেয়েছিলেন। উনার এই মহান কর্মের শুরু থেকে শেষ অবধি কাজের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে গভীর যতœশীল ছিলেন। সুলতানের মত মিমার সিনান পাশাও এই উসমানীয় সালতানাতকে গৌরবান্বিত করা এবং পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার বিজয় চিহ্ন তুলে ধরার জন্য এই স্থাপনাকে সবদিক দিয়ে নিখুঁত করার ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। যাইহোক, ১৫৫৭ খৃ: নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। স্বয়ং সুলতান মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেন এবং এর ফলে ইস্তাম্বুলের আকাশমন্ডলী চিরতরের জন্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। মসজিদটির বিরাট গম্বুজ এবং দীর্ঘ মিনারগুলো ইস্তাম্বুল শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে দেখা যায়। এটি শেষ হবার পরে মিমার সিনান এতই খুশি হয়েছিলেন যে, তার এই স্থাপনাটিকে জীবনের শ্রেষ্ঠতম কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন। এটি উসমানী সালতানাতের শক্তি, ক্ষমতা এবং গরিমার প্রতিনিধিত্ত্ব করে।
সুলাইমানিয়া মসজিদের অবকাঠামো:
মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬৯ ও প্রস্থ ৬৩ মিটার। মূল গম্বুজের কাছে অবস্থিত লম্বা মিনারগুলো ৭৬ মিটার উঁচু, আর ছোট মিনারগুলো ৫৬ মিটার উঁচু। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অনায়াসে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে এতে। মসজিদের উন্মুক্ত আঙিনার চার কোণে সুউচ্চ ও সুরম্য চারটি মিনার মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে। ঐতিহাসিকভাবে মসজিদে মাত্র একটি মিনার থাকতো, যেখান থেকে মুয়াজ্জিনেরা আজান দিতেন। সুলায়মানিয়া মসজিদে প্রথমবারের মত চারটি মিনার ব্যবহার করা হয়। আর ১০টি ব্যালকনি নির্মাণ করা হয়।
মসজিদের মেহরাবের অভ্যন্তর পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার ঐতিহ্যের স্মারক ও বিভিন্ন কারুকার্যের উপাদানে পরিপুষ্ট। চোখ ধাঁধানো বৈচিত্র ও বহুবিধ রংতুলিতে আঁকা লতাগুল্ম এবং সবুজ শ্যামলিমার হরেক রকম দৃশ্য আর পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার আয়াত শরীফ উনার অঙ্কিত ফলকগুলো চোখে পড়লে বিস্ময় জাগানিয়া অন্য রকম এক আবহ কাজ করে দর্শকদের ভাবনাজুড়ে। চিত্তাকর্ষক মেহরাবটির পাশেই রয়েছে সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি সুসংহত মিম্বর। বিভিন্ন রঙের কাচের জানালাগুলো দিয়ে যখন সূর্যের আলোকরশ্মি খেলা করে, তখন মনে হয়, মসজিদটি যেন সহগ্র রঙে সাজানো হয়েছে।
মসজিদের আঙিনার চারপাশ ঘিরে রয়েছে সবুজাবৃত সজীব একটি উদ্যান। সে এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য! অতি জাঁকজমকপূর্ণ নকশা ও অসম্ভব সুন্দর চিত্রাঙ্কন ছাড়া সুলাইমানিয়া মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশালত্ব ও সুপরিব্যাপ্তি। মসৃণ ও ঝকঝকে টালি বসানো মেঝে দেখতে অসাধারণ। মসজিদের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এর দেয়ালগুলো। সাতটি রং দিয়ে বার্নিশ করে বর্ণালি দৃশ্য আঁকা হয়েছে এতে। দৃশ্যগুলো সোনালি ও কালো সুতায় বেগুনি-লাল, গাঢ় নীল এবং অন্যান্য রঙের মিশেলে চিত্রায়িত। টিউলিপ ফুল, ভায়োলেট ফুল, লবঙ্গগাছ, ডেইজি ফুল, আঙুরপাতা ও আপেলগাছের ছবি ফুটে আছে ভেতরের প্রতিটি দেয়ালে।
শ্যামল নিসর্গের আবহ ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সুলাইমানিয়া মসজিদ সমধিক পরিচিত। তাই তুরস্কের ভ্রমণকারী মুসলিম পর্যটকদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বিখ্যাত সুলাইমানিয়া মসজিদ।
মাস্টার স্টেজ:
মিমার সিনান ছিলেন একজন সত্যকারের ‘পারফেকশনিস্ট’। সুলাইমানিয়া মসজিদের মত অবিস্মরণীয় একটি কাজ সমাধার পরেও উনার মনের ক্ষুধা মেটেনি। তাই আরও সুন্দর, পরিপূর্ণ, মহিমাময় ও মহত্তম স্থাপত্য নির্মাণের প্রবল ইচ্ছা উনার মনে রয়েই যায়।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সীতাকু-ের পৌঁনে পাঁচশো বছরের ঐতিহাসিক হাম্মাদিয়া মসজিদ
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সাগরে ৪৭০০ বছরের পুরোনো জাহাজের সন্ধান
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
তুরস্কে ‘হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার নৌকা’র খোঁজে পাহাড় খনন
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
অযত্নে ভঙ্গুর মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন খানবাড়ি মসজিদ
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
৫০০ বছরের ঐতিহ্য স্থাপত্যর এক অনন্য নিদর্শন রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ
০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুন্সীগঞ্জের দরগাহবাড়ি: সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে বাবা আদম মসজিদ
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শ্যামপুর দায়রা শরীফ : ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের নিদর্শন
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সউদীতে ১৩শ’ বছর পুরোনো মসজিদ
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদ
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
স্পেনের কুরতুবা বা কর্ডোবা মসজিদ
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সিলেটে ৯০০ বছরের প্রাচীন ‘গায়েবি মসজিদ’
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












