স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
, ১৯ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১০ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ২৫ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) স্থাপত্য নিদর্শন
মিমার সিনান পাশার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন:
সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহ ঐতিহাসিক কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের পর এর নামকরণ করা হয় ‘ইসলামবুল’ (পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার শহর)। যদিও এখন ইস্তাম্বুল নামেই শহরটি পরিচিত। তারপরে উসমানীয়রা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর কিছু স্থাপত্য নির্মাণ করে এই প্রাচীন শহরটির আকাশমন্ডলীকে নতুনভাবে সজ্জিত করার পরিকল্পনা করে। আর এর পুরোভাগে ছিলেন মিমার সিনান।
মিমার সিনান পাশার বর্ণিল স্থাপত্য জীবনকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা, শিক্ষানবিশ কাল, যোগ্যতার স্তর এবং মাস্টারস্টেজ।
শিক্ষানবিশ কাল:
প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, তিনজন ভিন্ন উসমানীয় শাসক যথা, সুলতান সেলিম, প্রথম সুলেইমান, দ্বিতীয় সেলিমের আমলে পূর্ণ সময়ের জন্য কাজ করেন মিমার সিনান এবং এই সময়ের মধ্যে উসমানীয় সাম্রাজ্য জুড়ে বহু পবিত্র মসজিদ, প্রাসাদ, পবিত্র মাজার শরীফ, কবরস্থান, গ্রন্থাগার, বিদ্যালয় ও সেতু নির্মাণ করেন। মিমার সিনান পাশার হাতেখড়ি হয় ছোটখাটো স্থাপনা, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণ করে। এই স্তরের প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ‘হাজিয়া সোফিয়া’র (আয়া সোফিয়া নামে আমরা যে স্থাপনাকে জানি) পুনঃসংস্কার। ইস্তাম্বুলের প্রাচীনতম ভবনগুলির একটি হিসাবে ‘হাজিয়া সোফিয়া’ (আয়া সোফিয়া) পুনরুদ্ধার করেছিলো উসমানীয় সুলতানগণ। আর এই বিশাল কাজটি আর কেউ নন, মিমার সিনানই করেছিলেন। উনার পুরো ভবনকে নতুন করে সাজান এবং উসমানীয় বিজয়ের প্রতীক হিসাবে পুরাতন ভবনের সাথে নতুন করে বেশ কিছু মিনার যোগ করেন।
১৫৪৭ খৃ: সিরিয়ার আলেপ্পোতে খসরুয়েভিয (কযঁংৎঁরিুধয) মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে সেই শহরের একটি ল্যান্ডমার্কে পরিণত হয়েছে। উনার বাগদাদে ইমামে আ’যম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামে মসজিদ এবং কনিয়ায় জালালউদ্দীন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি মসজিদ সংস্কার করেন। এ সমস্ত প্রকল্পগুলি মিমার সিনানকে স্থাপত্য ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তিভূমি প্রদান করে।
শেহজাদে মসজিদ কমপ্লেক্সে:
ইস্তাম্বুলের ‘শেহজাদে মসজিদ কমপ্লেক্সে’ই মিমার সিনান পাশার প্রথম বড় কাজ ছিলো। এই মসজিদটি সুলতান সুলাইমানের আদেশে তার পুত্র মুহম্মদ, যিনি ২২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, তার স্মরণে নির্মিত হয়। মসজিদের সাথে একটি মাদরাসা, লজিং হাউজ, এবং আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল যারা তাদের জন্য রান্নাঘরও নির্মাণ করেন। জানা যায়, এই স্থাপনাটি মিমার সিনান পাশাকে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এটিকে উনার এক আনাড়ী কাজ বলে গণ্য করতেন। যদিও এটি অত্যান্ত আকর্ষণীয় ছিলো। কিন্তু মিমার সিনান নিজেকে এমনভাবে তৈরী করেছিলেন যে, অল্পতে কখনোই সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। উনার সর্বদা নিজেকে তো বটেই এমনকি সুলতানের প্রত্যশাকেও ছাড়িয়ে যেতে চাইতেন। তিনি ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ উদ্যমী নির্মাতা, উনার প্রতিটি কাজে জড়িয়ে থাকতো অনেক আবেগ, ও পরিকল্পনা। যা তাকে পরবর্তীতে আরো অসাধারণ কিছু কাজ করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। হাজিয়া সোফিয়া ছিলো মিমার সিনান পাশার কাজের অন্যতম উৎস এবং প্রেরণা।
মিমার সিনান পাশার যোগ্যতার স্তর:
এ সময় মিমার সিনান পাশা কাজে আরও সুদক্ষ হয়ে ওঠেন। এই স্তরে তার অন্যতম সেরা কাজ ছিল ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক ‘সুলাইমানিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স’ নির্মাণ। অপরূপ সুন্দর ও বিশ্ববিখ্যাত এই মসজিদটি নির্মাণের জন্য সুলতান সুলাইমান নিজেই স্থান বাছাই করেন। ইস্তাম্বুলের বায়জিদ অঞ্চলের অনিন্দ্যসুন্দর ‘বসফরাস’ প্রণালির কোলঘেঁষা একটি ছোট্ট টিলার ওপর গড়ে উঠেছে মসজিদটির অবকাঠামো। ইতিহাসগ্রন্থে রয়েছে, নির্মাণকাজ আরম্ভ করার আগে মিমার সিনান পাশার সুলতানের কাছে মসজিদের যাবতীয় নকশা-রেখাচিত্র, ভাবনা ও পরিকল্পনার চিত্ররূপ পেশ করেন। চিত্রে শিল্পী মিমার সিনান পাশার দক্ষতা, মুনশিয়ানা ও চিন্তা-পরিকল্পনার সৌকর্য দেখে সুলতান খুবই আপ্লুত হন এবং তার পরিকল্পনার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ধনভা-ার থেকে নির্মাণকাজের সব খরচ অবাধে পূরণ করার আদেশ দেন। সুলতান সুলাইমান চেয়েছিলেন এই মসজিদ ইস্তাম্বুলের আকাশমন্ডলিকে সমৃদ্ধ করুক। ১৫৫০ খৃ: মিমার সিনান পাশা সুলতানের উপস্থিতিতে এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সুলতান এই প্রকল্প নির্মাণকালে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। মিমার সিনানও এই সুযোগ হাতছাড়া করতে একদম নারাজ ছিলেন। উনার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নির্মাণ করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
অযত্নে ভঙ্গুর মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন খানবাড়ি মসজিদ
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
৫০০ বছরের ঐতিহ্য স্থাপত্যর এক অনন্য নিদর্শন রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ
০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুন্সীগঞ্জের দরগাহবাড়ি: সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে বাবা আদম মসজিদ
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শ্যামপুর দায়রা শরীফ : ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের নিদর্শন
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সউদীতে ১৩শ’ বছর পুরোনো মসজিদ
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদ
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
স্পেনের কুরতুবা বা কর্ডোবা মসজিদ
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সিলেটে ৯০০ বছরের প্রাচীন ‘গায়েবি মসজিদ’
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অলৌকিক ঘটনা ও ঐতিহ্যের স্মারক বিবিচিনি মসজিদ
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরামিডের রহস্যভেদ নিয়ে নতুন তথ্য!
০৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
উসমানীয় স্থাপত্যের কালজয়ী প্রতীক নীল মসজিদ
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












