স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৫ম পর্ব)
, ১১ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০১ আশির, ১৩৯৩ শামসী সন , ০১ মার্চ, ২০২৬ খ্রি:, ১৬ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) স্থাপত্য নিদর্শন
১৫৬৬ খৃষ্টাব্দে সুলতান প্রথম সুলাইমানের ইন্তিকালের পর তার পুত্র দ্বিতীয় সেলিম মসনদে বসেন। ফলে মিমার সিনান পাশার সামনে আরেকটি সুযোগ আসে। পিতার মত সুলতান দ্বিতীয় সেলিমও চাইছিলেন আরেকটি স্মরণীয় স্থাপনা নির্মিত হোক। এ কাজের দায়িত্ব অবধারিতভাবে মিমার সিনান পাশার উপর ন্যস্ত হয়। তবে এটি নির্মিত হবে ইস্তাম্বুল থেকে ২০০ কিমি দূরের এডিরনে। মিমার সিনান পাশার বয়স তখন মধ্য সত্তর। এই প্রবীণ বয়সে এসেও তার কর্মস্পৃহা এতটুকু কমেনি। ১৫৬৯ খৃ: উনার প্রবল উৎসাহে ‘সেলিমিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজে হাত দেন এবং মনের মাধুরী মিশিয়ে বিরামহীনভাবে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৫৭৪ খৃ: এর কাজ সমাপ্ত হয়। দুনিয়াবাসী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেন আরেকটি শ্বাসরুদ্ধকর, মনোমুগ্ধকর, নয়ন মনোহর স্থাপনা, যার নাম ‘সেলিমিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স’। এই মসজিদটি নির্মিত হবার পর, অবশেষে মিমার সিনান মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করেন। তিনি দাবি করেন যে, এই কাজটি দিয়ে আয়া সোফিয়াকেও ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন। উনার তার জীবনীগ্রন্থে স্বীকার করেন যে, এটিই উনার ‘মাস্টারপিস’।
সেলিমিয়া মসজিদ কমপ্লেক্সের ৮০ মিটার উঁচু মিনারগুলো ছিলো সে সময়ের সবচেয়ে লম্বা। এর গম্বুজগুলো হাজিয়া সোফিয়ার গম্বুজের চেয়েও উঁচু। সেলিমিয়া মসজিদটি উসমানী সালতানাতের নির্মিত সর্ববৃহৎ স্থাপনা এবং এটিকে মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে চিত্তাকর্ষক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওসমানি সালতানাতের বিখ্যাত নিদর্শন এটি। এটাকে ইসলামি স্থাপত্যে অন্যতম সেরা হিসেবে ধরা হয়। সুন্দর-পরিচ্ছন্ন ডিজাইনের জন্য আজও সমাদৃত হয়ে আছে।
অন্যান্য স্থাপনাসমূহ:
মিমার সিনান পাশার দাপ্তরিক কার্যতালিকা তাজকিয়াত-আল-আবনিয়া অনুযায়ী ৫০ বছরের স্থাপত্য পেশাজীবনে উনার ৪৭৬টি দালান (যার মাঝে ১৯৬টি দালান এখনো বিদ্যমান) নির্মাণ করেন অথবা নির্মাণ তদারকি করেন।
মিমার সিনান পাশার উল্লেখযোগ্য
কিছু স্থাপনা নিম্নরূপ:
সুলায়মানিয়া মসজিদ, সেলিমিয়া মসজিদ, মেহমেদ পাশা সকোলোভিক ব্রিজ, মিহরিমা সুলতান মসজিদ, মিহরিমা মসজিদ, কিলিচ আলী পাশা কমপ্লেক্স, শেহজাদে মসজিদ, হাসেকি হুররেম সুলতানের হাম্মামখানা, হাসেকি সুলতান কমপ্লেক্স, সোকোল্লু মেহমেত পাশা মসজিদ, বানিয়া বাসি মসজিদ, ইত্যাদি।
মিমার সিনান পাশার স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য:
মিমার সিনান পাশার স্থাপত্যের অথবা উসমানীয় স্থাপত্যের একটা বৈশিষ্ট্য বিশালাকৃতির গম্বুজ। যদিও এই গম্বুজ আকৃতির স্থাপত্যের ইতিহাস অনেক পুরনো। জাতীয় গম্বুজ আর্কিটেকচারের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলো কন্সটান্টিনোপলের আয়া সোফিয়া মসজিদ। এই আয়া সোফিয়ার বিখ্যাত গম্বুজকারক মিমার সিনান পাশার জন্য অনুপ্রেরণা এবং বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। মিমার সিনান পাশা স্বার্থকভাবেই বাইজান্টাইন আর্কিটেকচারের সাথে ইসলামি আর্কিটেকচারের এক অসাধারণ ফিউশন করেছেন। তারই এক চমৎকার উদাহরণ সুলায়মানিয়া মসজিদ।
মিমার সিনান পাশার অকল্পনীয় সৃজনশীলতা, অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং শক্তিশালী কল্পনার মেলবন্ধনে একক ব্যক্তি হিসেবে উনার দুনিয়ার বুকে কিছু অবিশ্বাস্য সুন্দর স্থাপনার পরিকল্পনা এবং তা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার নির্মিত ভবনগুলি আভিজাত্য, অভ্যন্তরভাগে সুপরিসর জায়গা এবং বাইরের নকশার মধ্যে অনন্যসাধারণ সরলতার কারণে সুবিখ্যাত; প্রকৃতপক্ষে, তার ভবনগুলো শিল্প ও স্থাপত্যের ইতিহাসে নতুন এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করে।
এই অর্থে, মিমার সিনান ছিলেন একজন অনন্য স্থপতি এবং নির্মাতা, যিনি কাজের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য, আভিজাত্য এবং আড়ম্বড়ের ব্যপারে কোন ছাড় দেননি। এই সমস্ত উপাদানগুলি তার প্রধান প্রধান নির্মাণ কাজের মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বজায় ছিলো।
তাজমহল ও সিনান:
সুলায়মানিয়া মসজিদের সাথে বিখ্যাত মোঘল স্থাপত্য তাজমহলের সাথে এর কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাজমহলের স্থাপত্য সত্যিকার অর্থে পার্সিয়ান স্থাপত্যের সাথে উসমানীয় স্থাপত্য আর ভারতীয় স্থাপত্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন। শাসক শাহজাহানের সাথে উসমানী সালতানাতের সুসম্পর্ক ছিলো। এই সম্পর্কের একটা উল্লেখযোগ্য দিকই ছিলো সাংস্কৃতিক বিনিময়। এই সময় কয়েকজন উসমানীয় আর্কিটেক্ট এসেছিলেন শাহজাহানের দরবারে। এরা ছিলেন বিখ্যাত মিমার সিনান পাশার ছাত্র- যারা কিছুদিন পর তাজমহলের নির্মাণ শুরু করেন!
সম্মাননা:
Mimar Sinan University of Fine Arts নামে তুরুস্কের ইস্তাম্বুলের একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। যেটি ১৮৮২ খৃ: প্রতিষ্ঠিত হয়।
মিমার সিনান পাশার জীবন ও কর্মের উল্লেখ্যযোগ্য বার্ষিকী উপলক্ষ্যে তুরস্ক সরকার বিশেষ মুদ্রা ছাপায়।
শেষ জীবন:
তিনি কেবল একজন কঠোর অধ্যবসায়ী নির্মাতা ও অসামান্য প্রতিভাধর স্থপতি ছিলেন না; উনার ছিলেন একজন দ্বীনি অনুগত সুফী মুসলিম, যিনি তার গোটা জীবনব্যাপী দ্বীনি ইসলামী স্থাপনার গৌরব বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
মিমার সিনান নিরানব্বই বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং ইস্তাম্বুলে সুলায়মানিয়া মসজিদ কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী তার নিজের হাতে তৈরী করা কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হয়। তার অদূরেই শুয়ে আছেন তার দুই অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সুলতান সুলাইমান।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
স্পেনের কুরতুবা বা কর্ডোবা মসজিদ
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক চুনাখোলা মসজিদ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সিলেটে ৯০০ বছরের প্রাচীন ‘গায়েবি মসজিদ’
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অলৌকিক ঘটনা ও ঐতিহ্যের স্মারক বিবিচিনি মসজিদ
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরামিডের রহস্যভেদ নিয়ে নতুন তথ্য!
০৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
উসমানীয় স্থাপত্যের কালজয়ী প্রতীক নীল মসজিদ
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামী দুর্গ স্পেনে কী দেখেছিলেন ইবনে বতুতা?
৩০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
কালকিনির মসজিদ বাইতুর রাইয়ান, যার সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (৫)
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারতের মালদহর ঐতিহাসিক তাঁতীপাড়া মসজিদ
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম অবদানের এক জীবন্ত দলিল
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাজ-উল-মসজিদ ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












