ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৪)
, ০৯ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২২ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ০৫ কার্তিক, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইলমে তাছাউফ
৩৭। শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার মজলিসে যেখানে জায়গা খালি পাবে সেখানেই বসে পড়বে। কেননা, আগতদের জন্য শুন্যস্থানই নির্দিষ্ট থাকে। (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
কোন ব্যক্তি যদি শয়তানের প্ররোচনা, নফসের ধোঁকা ইত্যাদি নানা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে কামিল শায়েখ উনার দরবারে গমন করে উনার মজলিসে সামান্যতম ঠাঁই পায় সেটাই তার জন্য গণিমতস্বরূপ। তার জন্য শুকুর আদায় করা কর্তব্য।
উল্লেখ্য, এ ক্ষেত্রে মজলিসের শেষেও যদি কেউ স্থান পায় তবে সেখানেই বসা শুকুরগুজারির লক্ষণ। কিন্তু কেউ যদি তা ভঙ্গ করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে তবে তা হবে মজলিসের আদবের খেলাফ এবং নাশুকরির লক্ষণ।
সেক্ষেত্রে মুরীদ যদি তাকে গুরুত্ব না দেয়, অনীহা প্রদর্শন করে তা বদ্ বখতির লক্ষণ ছাড়া কিছু নয়।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, হযরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন যে, হযরত আবূ লাইছ সমরখন্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার “তাম্বীহুল গাফিলীন” কিতাবে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি মজলিস পাবে অথচ বসবে না সে অভিশপ্ত (মালউন)।” (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
হযরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “আমি একবার আজমীর শরীফে মাওলানা সালাহুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। আমার মুর্শিদ কিবলা তিনিও উক্ত মজলিসে ছিলেন। বালা-মুছিবত সম্বন্ধে আলোচনা চলছিলো। হযরত মাওলানা সালাহুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “একবার সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোথাও গিয়েছিলেন। সেখানে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাকে বেষ্টন করে বসেছিলেন। পরে আরো তিনজন লোক আসলো।
তাদের মধ্য হতে একজন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বেষ্টনীর মাঝে স্থান পেলেন। অপর দু’জনের বসার মত জায়গা ঐ বেষ্টনীতে ছিলো না। তাদের মধ্যে দ্বিতীয়জন বেষ্টনীর বাইরে বসলেন, তৃতীয়জন চলে গেলো।
তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উপস্থিত হয়ে বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! “যারা এই বেষ্টনীর মধ্যে বসা আছেন উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্ষমা করেছেন এবং যে ব্যক্তি বেষ্টনীর বাইরে বসে আছে উনাকেও মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার করুণা ও দয়া দ্বারা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি চলে গেছে সে দূর্ভাগা। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনিও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।” (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
উল্লেখ্য যে, যিনি যত মর্যাদা সম্পন্ন উনার মজলিসও তত ফযীলতপূর্ণ ও বরকতময়। আর মুরীদের জন্য স্বীয় কামিল শায়েখ তিনিই হচ্ছেন দুনিয়ার যমীনে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। কাজেই উনার মজলিসের শ্রেষ্ঠত্ব ও বরকতের প্রতি লক্ষ্য রেখে যতটুকু জায়গা পাবে তাতেই বসে পড়বে। আশা করা যায় তাতে তার মকছুদ পূর্ণ হবে। আর মজলিসে উপবেশনকারীদেরও উচিত আগত ব্যক্তির বসার জন্য স্থান করে দেয়া।
কেননা, মহান মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন-
أَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللهُ إِلَيْكَ
অর্থ: “ইহসান (দয়া) করো যেমনভাবে মহান আল্লাহ পাক তোমার প্রতি ইহসান করেছেন।” (সূরা ক্বছাছ/৭৭)
পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
أَلْخَلْقُ عِيَالُ اللهِ، فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلَى عِيَالِهٖ
অর্থ: “আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সমস্ত মাখলুক মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবার। সুতরাং মাখলুকাতের মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট সেই সর্বাপেক্ষা প্রিয়, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার করে।” (শুয়াবুল ঈমান, মিশকাত/৪২৫)
জেনে রাখা উচিত, মহান আল্লাহ পাক উনার পরিবারের প্রতি সদাচরণ করলে যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি খুশি হন, একইভাবে খুশি হন উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও। আবার ঠিক একইভাবে মুরীদের প্রতি সদাচরণ করলে, সহানুভূতি প্রদর্শন করলে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা তিনিও খুশি হন।
সর্বোপরি মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের নির্দেশ মুবারক হচ্ছে- আগত ব্যক্তিদের জন্য জায়গা করে দেয়া।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللهُ لَكُمْ ۖ وَإِذَا قِيلَ انْشُزُوا فَانْشُزُوا يَرْفَعِ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয় যে, মজলিসের স্থান প্রশস্ত করে দাও। তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদের প্রশস্ততা দান করবেন। আর যখন বলা হবে, উঠে যাও তখন উঠে যেও। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদের মর্যাদা উঁচু করে দিবেন।” (সূরা মুজাদালা শরীফ/১১)
এ প্রশস্ততা পরকালে তো প্রকাশ হবেই এমনকি ইহকালে সাংসারিক জীবনেও প্রশস্ততা বা প্রাচুর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৫)
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে অনুসরণ করার আদব
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৩)
১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮২)
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র যিকির উনার গুরুত্ব ও ফযীলত (১)
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮১)
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮০)
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












