ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
, ২৮ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১১ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১০ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ২৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
৩৫। কাছরাতুস্ সুওয়াল বা অধিক জানতে চাওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে।
কতক লোক এমন আছে যে, যারা মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম-আহকাম সম্পর্কে অনাবশ্যক চূ-চেরা, ঘাঁটা-ঘাঁটি করতে আগ্রহী এবং যেসব বিষয়ে হুকুম দেয়া হয়নি সেগুলো নিয়ে বিনা প্রয়োজনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলতে থাকে। হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মায়ের নাম কী ছিলো? ইত্যকার নানা রকমের প্রশ্ন বানিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দেয়। অথচ এসব প্রশ্ন মানুষের দ্বীনি কর্মকান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আর এরূপ প্রশ্নকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি মাসয়ালা-মাসায়েল সম্পর্কে যে অজ্ঞ থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
সুতরাং এ জাতীয় প্রশ্ন করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি এরূপ আচরণ হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন যে, “তারা যেন এরূপ প্রশ্ন না করে। যার ফলশ্রুতিতে তারা কষ্টে পতিত হবে কিংবা গোপন রহস্য ফাঁস হওয়ার কারণে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।” মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِنْ تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না, যা প্রকাশ হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।” (সূরা মায়িদা/১০১)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত আছে-
عَنْ حضرت اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ تعالى عَنْهُ، أَنَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَخْطُبُ ذَاتَ يَوْمٍ غَضْبَانَ مِنْ كَثْرَةِ مَا يَسْأَلُونَ عَنْهُ مِمَّا لَا يَعْنِيهِمْ، فَقَالَ لَا أُسْأَلُ عَنْ شَيْءٍ إِلَّا أَجَبْتُ. فَقَالَ رَجُلٌ: أَيْنَ أَبِي؟ فَقَالَ: فِي النَّارِ. وَقَالَ آخَرُ: مَنْ أَبِي؟ فَقَالَ: حُذَافَةُ.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, একবার আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খুতবা মুবারক দিচ্ছিলেন। উনাদের (হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অধিক প্রশ্নের কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, আমি এমন কোনো বিষয়ে যেন জিজ্ঞাসিত না হই যার জাওয়াব দিতে বাধ্য হবো। তারপরও এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার আব্বা কোথায়?’ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা জাহান্নামে।’ অপর এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার পিতা কে?।’ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা হুজাফাহ।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান/২-৪৪৯)
অধিক প্রশ্ন এবং অকারণে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের দ্বারা বহুমূখী সমস্যার উদ্ভব হয়। তার দ্বারা কাঠিন্যতার সৃষ্টি হয়। ফলে আমল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এতে ইখতিলাফ বা মত-বিরোধ দেখা দেয়। তাই ধ্বংস অনিবার্য হয়। সাথে সাথে অনর্থক কাজে অযথা সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আর ইলমে তাছাউফের মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে, অপছন্দনীয়, নিন্দনীয় এবং অনর্থক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা। পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
অর্থ: “ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে- মুসলমান ব্যক্তি অনর্থক বিষয়াদি পরিত্যাগ করে।” (মিশকাত শরীফ/৪১৩)
আর বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রভাব যে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের সহায়ক তা জ্ঞানী মাত্রই অবগত।
সুলতানুল মুফাসসিরীন, রঈসুল মুহাদ্দিছীন, হুসাইন ইবনে মুহম্মদ ত্বীবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব “শরহুত্ ত্বীবী আল মিশকাতিল মাসাবিহ”-এর ১ম খন্ডের ৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-
حُسْنُ الْأَدَبِ فِي الظَّاهِرِ عُنْوَانُ حُسْنِ الْأَدَبِ فِي الْبَاطِنِ
অর্থ: “বাহ্যিক উত্তম শিষ্টাচার, আভ্যন্তরীণ উত্তম শিষ্টাচারের শিরোনাম স্বরূপ।”
প্রসঙ্গ; অধিক কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে। তবে কোন বিষয়ে নিতান্ত জরুরী হলে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করবে।
উল্লেখ্য যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ছিলেন জাহির ও বাতিন সবদিক থেকে উত্তম শিষ্টাচারের ধারক ও বাহক। উনারা অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক এবং অধিক প্রশ্ন করা থেকে বিরত ছিলেন। উনারা ইলিম হাছিলের উপর এবং অর্জিত ইলিম অনুযায়ী আমলকেই বেশী গুরুত্ব দিতেন। মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মা’রিফাত-মুহব্বত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দী হাছিলের পথে যখন প্রতিবন্ধকতা কিংবা কোন সমস্যার সম্মুখীন হতেন কেবল তখনই তা নিরসন কল্পে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সুওয়াল করতেন।
মোটকথা, উনাদের আমলের ভিত্তিই ছিলো সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করা। আর ইলমে তাছাউফের শিক্ষাও হচ্ছে সেটাই। অর্থাৎ স্বীয় কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ। আর অনুসরণ-অনুকরণের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা করার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাওয়াক্কুল তথা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ভরসা করার ফযীলত
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৫)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৪)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৩)
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
انابة (ইনাবত) মাক্বাম হাছিলকারীগণের হালত বা অবস্থা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ওলী আল্লাহগণ উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












