ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইলমে তাছাউফ
৩৪। কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার কোন কথা কাজ কিংবা অন্য কোন বিষয়ের আমানত নষ্ট করবেনা।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আবু লুবাবা ইবনে মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বনূ কুরাইজা সম্প্রদায়ের কাছে পাঠালেন। উনাকে দেখামাত্র পুরুষরা উনাকে অভিবাদন জানাতে ছুটে আসলো, আর নারী ও শিশুরা উনার সামনে গিয়ে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ জানালো। তাদের সে বুক ফাটা কান্না দেখে উনার অন্তর বিগলিত হলো। তারা বললো, “হে আবু লুবাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি কী বলেন, আমরা কী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশমত দুর্গ হতে নেমে আসবো?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ” সেই সাথে গলদেশের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “তোমাদেরকে জবাই করা হবে।”
পরবর্তীতে হযরত আবূ লুবাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! সে স্থান হতে আমি এক কদমও উঠাইনি, এর মধ্যেই আমার উপলব্ধি হলো যে, আমি মহান আল্লাহ পাক ও উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।
কাজেই তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে সাক্ষাত না করেই সোজা মসজিদে নববী শরীফে চলে গেলেন এবং মসজিদের খুঁটির সাথে নিজেকে শক্ত করে বাঁধলেন। এবং তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে ক্ষমা না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ স্থান ত্যাগ করবো না।’ তিনি আরো প্রতিজ্ঞা করলেন যে, জীবনে কোনদিন বনু কুরাইজার মাটি মাড়াবো না এবং যে মাটিতে মহান আল্লাহ পাক এবং উনার মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, সেখানে কখনও নিজের মুখ দেখাবো না। এভাবে ছয় দিন অতিবাহিত হওয়ার পর মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার তওবা কবুল করে খোশ খবরী দিয়ে আয়াত শরীফ নাযিল করেন-
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থ: “আর কোন কোন লোক এমন রয়েছেন, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন, তারা একটি সৎ কর্মের সাথে অপর একটি অসৎ কর্ম মিশ্রিত করেছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। আর মহান আল্লাহ পাক তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত করুণাময়।” (সূরা তওবা শরীফ/১০২)
পরে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজ নূরুল মাগফিরাত মুবারক (হাত মুবারকে) উনার বাঁধন খুলে উনাকে মুক্ত করে দেন। সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে জালালাইন, সীরাতে ইবনে হিশাম)
উল্লেখ্য যে, মহাসম্মানিত হাবীব ও মাহবূব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার সম্মানিত দীদার মুবারকে তাশরীফ মুবারক নেয়ার পর সম্মানিত দ্বীনের যাবতীয় কাজের সুষ্ঠু আঞ্জাম দেন হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ। সুতরাং উনাদের এ মহান দায়িত্ব পালনের পথে মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত অনেক গোপন নিয়ামত পেয়ে থাকেন। যা গোপন রাখাই জরুরী। সেক্ষেত্রে উনাদের একান্ত লোক তথা মুরীদগণের কিছু অবগত হওয়া বিচিত্র নয়। কাজেই তাদের একান্ত দায়িত্ব বা আদব হচ্ছে- স্বীয় কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার দুনিয়াবী ও উখরুবী সকল কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা কিংবা অন্যান্য সকল বিষয়ের আমানত সংরক্ষণ করা।
৩৫। কাছরাতুস্ সুওয়াল বা অধিক জানতে চাওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে। আর কোন বিষয়ে নিতান্ত জরুরী হলে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করবে।
সাধারণত, কোন বিষয়ে জানার প্রয়োজন হলে একাগ্রতার সাথে নিজ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার সম্মুখে বসলে তা সমাধান হয়ে যায়। তবুও জিজ্ঞাসার একান্ত দরকার হলে সুওয়াল করবে। তবে অপ্রয়োজনীয় কিংবা অধিক সুওয়াল হতে বিরত থাকবে।
কেননা, হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে-
فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “তোমাদের পূর্ববর্তীগণ এমনিভাবে অধিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং মহাসম্মানিত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণের সাথে মত-বিরোধের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান/২-৪৪৯)
একবার এক ব্যক্তি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে “লুকতা” তথা হারানো বস্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করলো। তিনি উত্তরে বললেন, “তুমি তার গিলাফ বা বাঁধন এবং পাত্র চিনে রাখবে। অর্থাৎ এগুলো তার মালিককে দিয়ে দিবে।”
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! “হারানো উটের কী হুকুম?” এবারে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূরুর রহমাহ মুবারক (চেহারা মুবারক) লাল হয়ে গেলো। জালালী শান মুবারকে তিনি বললেন, “তা দ্বারা তুমি কী করবে? সে উটের সাথে তার মশক ও ক্ষুর আছে। সে পানির ঘাটে গিয়ে পানি পান করে আর গাছের পাতা খায়।” (বুখারী শরীফ)
অর্থাৎ এটা অনর্থক প্রশ্ন ব্যতীত আর কিছুই নয়। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাওয়াক্কুল তথা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ভরসা করার ফযীলত
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৫)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৪)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৩)
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
انابة (ইনাবত) মাক্বাম হাছিলকারীগণের হালত বা অবস্থা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ওলী আল্লাহগণ উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭২)
১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












