ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮১)
, ০১ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৪ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ২৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইলমে তাছাউফ
৩৬। কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা কোন বিষয়ে তলব করলে তৎক্ষনাৎ উনার ডাকে সাড়া দিবে।
“ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন” কিতাবে উল্লেখ আছে, “হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, নফল নামায ত্যাগ করে মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দেয়া কল্যাণকর এবং তার ছওয়াব অনেক বেশী।
কেননা একবার আমি নফল নামাযে রত থাকাকালীন আমার মুর্শিদ কিবলা, সুলতানুল হিন্দ, হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ হাবীবুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে নামায ছেড়ে দিয়ে উনার ডাকে সাড়া দিলাম। তিনি বললেন, আসুন! আমি উনার খিদমতে হাযির হলাম। তিনি ইরশাদ করলেন,“কী করছিলেন?” আমি বললাম, “নফল নামাযে লিপ্ত ছিলাম, আপনি ডাকলেন তাই খিদমত মুবারকে হাযির হলাম।” তিনি সব শুনে বললেন, “খুবই ভাল করেছেন। নিজের মুর্শিদ কিবলা উনার আদেশ পালন করা নফল নামায হতে উত্তম।” সুবহানাল্লাহ!
হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মুবারক জীবনে এরূপ অসংখ্য, অগণিত ঘটনা সন্নিবেশিত আছে যে, উনারা দুনিয়া ও আখিরাতে সকল কাজে স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার আদেশ-নিষেধকে প্রাধান্য দিতেন তথা মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দিতেন।
যথাসময়ে মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দেয়া মুরীদের জন্য ফরয-ওয়াজিবের অর্ন্তভুক্ত। কথিত আছে যে-
اَلشَّيْخُ يُحْيِى وَيُمِيتُ
অর্থাৎ- “কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা জীবিত করেন আবার মৃত্যুও দান করেন।”
তার ব্যাখ্যায় হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “জীবিত করা এবং মৃত্যু দেয়া উভয়ই মুর্শিদ কিবলা উনার মাকামের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। يُحْيِى শব্দের অর্থ হলো, রূহানী জীবন দান করা এবং يُمِيتُ এর অর্থ হলো- রূহানী মৃত্যুদান। শারীরিক জীবন কিংবা মৃত্যু নয়। এ স্থানে হায়াত ও মউতের অর্থ বিশেষভাবে ফানা ও বাকা। যা মুরীদকে বেলায়েত ও কামালতের মাকামে পৌঁছিয়ে দেয়। শায়েখে মুকতাদা বা পথ প্রদর্শক কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশে এ দুই বিষয়েরই জামীন।” (মাকতুবাত শরীফ, হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া-২/১১১)
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি আরো বলেন, “মুরীদের বাতেনী নাজাসাত বা নাপাকী দূর করার মূলই হচ্ছেন কামিল শায়েখ। যিনি স্বয়ং বাতেনী ফয়েজের ঝাড়ু দ্বারা তার বাতেনী নাজাসাত (নাপাকী) পরিস্কার করেন এবং বাতেনী ছেদন যন্ত্রের সাহায্যে মুরীদের আভ্যন্তরীণ ময়লা দূর করে তাকে পবিত্র করেন। যতদিন পর্যন্ত মুরীদের বাতেনী নাপাক বা ময়লা বিদ্যমান থাকে ততদিন মুর্শিদ কিবলা উনার উসীলায়ই তাকে মহান আল্লাহ পাক নৈকট্যের দিকে টেনে নিয়ে যান।
যা দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ ও সুখ-শান্তি হতে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম। কামিল শায়েখই একমাত্র উসীলা যা মুরীদের নফসে আম্মারাকে নফসে মুতমাইন্নাহ-এ পরিণত করেন। জাবালী বা আত্মগর্বী কুফর হতে হাকীকী ইসলামে পরিবর্তন করেন।” (হালাতে মাশায়েখ নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া-২/১১৩)
মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার মহাসম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুগত হও। আর তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর রয়েছেন তাদেরও অনুগত হও, অনুসরণ-অনুকরণ করো।” (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ/৫৯)
অতএব, দ্বীনি সকল কাজের মধ্যে মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দেয়া সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি কাজ। কারণ, উনার প্রতিটি আদেশ-নিষেধই মুরীদের জন্য বাতেনী জীবন দানকারী ও বাতেনী জীবন হরণকারী। পবিত্র কুরআন শরীফে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ.
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! মহান আল্লাহ পাক ও উনার মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা তোমাদেরকে যখন আহবান করেন এমন বিষয়ের প্রতি যা তোমাদের জীবন দান করবে। তখন তোমরা সে আহবানে সাড়া দাও।” (পবিত্র সূরা আনফাল শরীফ/২৪)
স্মর্তব্য যে, উল্লিখিত আয়াত শরীফ এবং অনুরূপ অন্যান্য আয়াত শরীফসমূহ যদিও আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে নাযিল হয়েছে তথাপিও ঐ সমস্ত আয়াত শরীফসমূহ হক্কানী-রব্বানী আলিম তথা মাশায়েখগণ অর্থাৎ উলিল আমরগণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ হক্কানী-রব্বানী আউলিয়ায়ে কিরামগণ হচ্ছেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি উনার নায়িব বা ওয়ারিছ।
উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানে ইরশাদ মুবারক করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللهِ وَرَسُولِهِ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা কোন ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার সম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অগ্রগামী হয়ো না।” (পবিত্র সূরা হুযূরাত শরীফ/১) (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮০)
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাওয়াক্কুল তথা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ভরসা করার ফযীলত
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৫)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৪)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৩)
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
انابة (ইনাবত) মাক্বাম হাছিলকারীগণের হালত বা অবস্থা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ওলী আল্লাহগণ উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












