ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৩)
, ০৫ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৮ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ০১ কার্তিক, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
৩৬। কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা কোন বিষয়ে তলব করলে তৎক্ষনাৎ উনার ডাকে সাড়া দিবে।
কেউ কেউ বলেন যে, আলোচ্য হাদীছ শরীফের হুকুম আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য খাছ। অর্থাৎ তিনি কোন বিষয়ে আহবান করলে নামায ভঙ্গ করে উনার ডাকে সাড়া দেয়া ফরজে আইন।
তবে বিশুদ্ধ মতে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দেয়া তো অবশ্যই ফরজ; সাথে সাথে উনার নায়েব, হক্কানী-রব্বানী আলিম তথা হক্কানী শায়েখ উনাদের ডাকেও সাড়া দেয়া আবশ্যক। কেননা, কামিল শায়েখ উনার আদেশ-নিষেধ পালন করা মুরীদের জন্য ফরজ এবং জীবন দানকারী।”
উল্লেখ্য যে, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার ইচ্ছা বা মর্জির নিকট নিজেকে ফানা বা বিলীন করে দেয়া তরীকতের পথে সালিকের সর্বপ্রথম ও প্রধান কাজ। উনার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা অতীব জরুরী। সেক্ষেত্রে মুর্শিদ কিবলা যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে মুরীদকে তলব করেন কিন্তু মুরীদ তা গুরুত্ব না দেয়ার কারণে সে কাজ ব্যহত হয় সেক্ষেত্রে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা অসন্তুষ্ট হন। যার ফলশ্রুতিতে মুরীদের আত্মার অপমৃত্যু ঘটে। রূহানী সম্পর্কের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আকীদা-আমলের মধ্যে সৃষ্টি হয় মহাবিপর্যয়। যা হালাকী বা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাহবুবে সুবহানী, ইমামে রব্বানী, আফদ্বালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদিদ্দে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব “মাকতুবাত শরীফে” উল্লেখ করেছেন, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার সন্তুষ্টির মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি নিহিত। মুরীদ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার মর্জির নিকট নিজেকে ফানা করে দিতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক উনার মর্জির দরজায় পৌঁছতে পারবে না। কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার মর্জির খিলাফ কাজ করে উনাকে কষ্ট দেয়া মুরীদের উন্নতির পথে কন্টকস্বরূপ।
এ পথের প্রতিটি পদস্খলন বা ভুল-ত্রুটির সংশোধন করা সম্ভব কিন্তু কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার মনে কষ্ট দেয়া কোনক্রমেই সংশোধন হতে পারে না। কামিল শায়েখ উনাকে তাকলীফ বা কষ্ট দেয়াই মুরীদের বদ্ বখতির মূল কারণ।
কেননা, শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনাকে কষ্ট দেয়ার ফলে মুরীদের আকীদাসমূহের মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং শরীয়তের হুকুম-আহকাম পালনে গাফলতি দেখা দেয়। ওজ্দ (ইশকের স্পন্দন) এবং বাতেনী হালসমূহ এর ফলে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কারণ এই সমস্ত বিষয় মুরীদের বাতেনী হালের সাথে জড়িত। সুতরাং কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনাকে কষ্ট দেয়া এবং উনার অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও যদি মুরীদের হাল (বাতেনী অবস্থা) ভালো থাকে বলে মনে হয় তাহলে এটাকে “ইস্তেদরাজ” মনে করবে। যা পরে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং যার পরিণতি ক্ষতি ছাড়া আর কিছু নয়।” (হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া ২/১১৩)
কাজেই স্বীয় মুর্শিদ কিবলা যেন কোন অবস্থাতেই কষ্ট না পান এবং অসন্তুষ্ট না হন সেদিকে মুরীদের গভীর লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়। আর মুর্শিদ কিবলা আহবান করার সাথে সাথে উনার ডাকে সাড়া দিলে কোন ক্ষতি নেই বরং তা নিয়ামত ও রেজামন্দি লাভের পথকে সুগম করে।
৩৭। শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার মজলিসে যেখানে জায়গা খালি পাবে সেখানেই বসে পড়বে। কেননা, আগতদের জন্য শুন্যস্থানই নির্দিষ্ট থাকে। (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
উল্লেখ্য যে, তাছাউফ তথা মহান আল্লাহ পাক ও উনার মহাসম্মানিত হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মা’রিফাত ও মুহব্বত মুবারক হাছিলের পথে দুটি বিশেষ অবলম্বন রয়েছে। প্রথমতঃ নিয়মিত শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার দরবার শরীফে হাজিরা দেয়া তথা ছোহবত ইখতিয়ার করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, মুর্শিদ কিবলা উনার নির্দেশিত যিকির-ফিকির করা। এ দু’টির সম্পর্ক একান্ত নিবিড়। পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি ব্যতীত অন্যটি অঙ্গহানী সদৃশ্য। এ দু’টি হতে যে যত দূরে থাকে সে তত বেশি শয়তানের নিকটবর্তী হয়। ইবলিসের গভীর ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে মুর্শিদ কিবলা উনার ছোহবত ও উনার মজলিসের গুরুত্ব কত অর্থবহ তা সহজেই অনুমেয়।
মনে রাখা উচিত যে, মুরীদের জন্য নিয়মিত ছোহবত ইখতিয়ার করা বা শায়েখ উনার সাহচর্য মুবারক লাভ করা অমূল্য সম্পদ। সাহচর্য মুবারক স্বভাবের উপর প্রতিক্রিয়াশীল। বাজপাখি সংসর্গে থেকেই জ্ঞান সঞ্চয় করে। তোতা পাখি কথা বলে। ঘোড়া পশুত্ব পরিত্যাগ করে মানুষের স্বভাব অর্জন করে তথা মানুষের অনুগত হয়, এটা সাহচর্যের ফল। (মাকতুবাতে সাদী)
হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন-
هركه خواهد همنشيند باخدا كونشيند درحضور اولياء
অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক উনার ছোহবত মুবারক লাভ করতে চায় সে যেন ওলীআল্লাহগণের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করে।”
সুতরাং আউলিয়ায়ে কিরামগণের মজলিসের ফাযায়িল-ফযীলত কত বেশী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮২)
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র যিকির উনার গুরুত্ব ও ফযীলত (১)
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮১)
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮০)
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাওয়াক্কুল তথা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ভরসা করার ফযীলত
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৫)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৪)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












