ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮০)
, ৩০ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৩ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) ইলমে তাছাউফ
৩৫। কাছরাতুস্ সুওয়াল বা অধিক জানতে চাওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে।
রঈসুল মুফাসসিরীন, হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি আরো বলেন, “হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা কেবল সেই সব সুওয়াল করতেন যা ছিলো উনাদের জন্য উপকারী।” অর্থাৎ একান্ত জরুরী এবং যা উপকারী সে সকল জরুরী মাসয়ালা-মাসায়েল জিজ্ঞাসা করা উচিত। তার দ্বারা যেমন নিজে উপকৃত হবে তদ্রুপ অন্যান্যরাও ফায়দা হাছিল করবে। আর এটা নিন্দনীয় নয় বরং প্রশংসনীয়।
কেননা, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: “তোমরা যারা জানো না তারা আহলে যিকির বা আল্লাহওয়ালা উনাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও।” (সূরা আম্বিয়া/৭)
“হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সেই সংক্রান্ত সুওয়াল করেছেন। এছাড়া পরবর্তী উম্মতের বোঝার সুবিধার্থে উনারা অনেক সুওয়াল করেছেন। যা, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জাওয়াব মুবারক দিয়েছেন। পরবর্তীতে যারা আসবে তাদের তা’লীম দানের লক্ষ্যে।
পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে-
اَلعِلْمُ خَزَائِنُ، مَفَاتِيحُهَا السُّؤَالُ، أَلَا فَاسْأَلُوا، فَإِنَّهُ يُؤْجَرُ أَرْبَعَةٌ: اَلسَّائِلُ، وَالْعَالِمُ، وَالْمُسْتَمِعُ، وَالْمُحِبُّ لَهُمْ.
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, ইলিম খনিস্বরূপ; আর সুওয়াল হচ্ছে তার চাবি। সুতরাং তোমরা প্রশ্ন করো- কেননা, প্রশ্নের দ্বারা চার ব্যক্তি উপকৃত হয়- ১. প্রশ্নকারী ২. আলিম তথা জাওয়াব দানকারী ৩. শ্রবণকারী এবং ৪. তাদেরকে মহব্বতকারী।” (ইহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন)
তবে প্রশ্ন করার পূর্বে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার সময় ও সুযোগের প্রতি লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। শুধু ইলিম অর্জনের জন্য প্রশ্ন করা উচিত অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। নিজের বুযূর্গী জাহির করা কিংবা কামিল শায়েখ উনার ইলিম যাচাই করার জন্য কোন প্রশ্ন করা চরম মূর্খতা-জিহালতির পরিচায়ক। সুতরাং অসময়ে এবং এরূপ মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন করা অবশ্যই বর্জনীয়। কেননা তা ক্ষতিকারক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, একবার হযরত খাজা আবূ ইউসুফ হামদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বাগদাদ শরীফের মাদরাসায় নিজামিয়ায় ওয়াজ করছিলেন। সে সময় ইবনে সাক্কা নামে এক ফকীহ (ফিকাহ শাস্ত্র বিশারদ) উনাকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। হযরত খাজা আবূ ইউসুফ হামদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার প্রশ্ন শুনে বললেন, “তোমার উক্তি হতে কুফরীর গন্ধ আসছে। তুমি বেদ্বীন হয়ে মারা যাবে।”
এ ঘটনার কিছুদিন পরে রোম হতে জনৈক খৃষ্টান বাগদাদের খলীফার নিকট কোন এক কাজে এসেছিলো। ইবনে সাক্কা তার সাথে চলা-ফেরা শুরু করলো। একদিন ইবনে সাক্কা তাকে বললো, “আমি দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করার ইচ্ছা করেছি।” ইহা শুনে সেই খৃষ্টান খুশি হয়ে তাকে রোম দেশে নিয়ে খৃষ্টান শাসকের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলো। ইবনে সাক্কা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো এবং সে অবস্থাতেই তার মৃত্যু হলো।” নাউযুবিল্লাহ! (হালাতে মাশায়েখে নকশবন্দীয়া মুজাদ্দিদীয়া, ১ম খন্ড, ১৭৬ পৃষ্ঠা)
কোন ওলীআল্লাহকে আদব রক্ষা না করে প্রশ্ন করা বা অযথা প্রশ্ন করে উনাদেরকে কষ্ট দেয়ার কারণে যদি এমন ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় তবে নিজ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার ক্ষেত্রে কিরূপ অবস্থা হতে পারে তা চিন্তা ও ফিকিরের বিষয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে অনর্থক প্রশ্ন করা হতে হিফাযত করুন। আমীন।
৩৬। কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা কোন বিষয়ে তলব করলে তৎক্ষনাৎ উনার ডাকে সাড়া দিবে।
কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা তিনি আহবান করার সাথে সাথে সালিক (মুরীদ) দুনিয়াবী যত গুরুত্বপূর্ণ কাজে লিপ্ত থাকুক না কেন, তা হতে বিরত হয়ে উনার ডাকে সাড়া দিবে। এমনকি যদি কোন ইবাদতে লিপ্ত থাকে তবুও তা হতে বিরত হয়ে মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দেয়া শরাফত, ভদ্রতা, আদব ও শিষ্টতার অন্তর্ভুক্ত।
যে সকল মহান ব্যক্তিত্ব মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি, রেযামন্দি মুবারক হাছিল করেছেন, কামিয়াবীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, উনাদের জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বর্ণিত আদবের যথার্থ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মুর্শিদ কিবলা উনার ডাক শুনতে পেলে উনারা উৎকন্ঠিত হয়ে যেতেন। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজেই লিপ্ত থাকতেন না কেন তা হতে বিরত হয়ে নিজ মুর্শিদ কিবলা উনার ডাকে সাড়া দিতেন।
“জুবদাতুল মাকামাত” কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত হুসামুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, একবার নক্শবন্দিয়া তরীকার বিশিষ্ট বুযূর্গ, হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমামে রব্বানী, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে তলব করলেন। আমি গিয়ে উনাকে সংবাদ দেয়ার সাথে সাথে উনার চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে যায় এবং ভয়ে উনার শরীর মুবারক থর থর করে কাঁপতে থাকে। তখন আমি মনে করলাম, এতদিন শুনে আসছিলাম, প্রিয়জনের কথা শুনা মাত্রই উনারা হয়রান-পেরেশান হয়ে পড়েন। আজ স্ব-চক্ষে তা দেখতে পেলাম।” (হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া, ২/২০) (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৬)
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাওয়াক্কুল তথা মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি ভরসা করার ফযীলত
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৫)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৪)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৩)
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
انابة (ইনাবত) মাক্বাম হাছিলকারীগণের হালত বা অবস্থা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ওলী আল্লাহগণ উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












