ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৩)
, ১৭ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ৩১ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইলমে তাছাউফ
৩৩। নিজ শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার নিকট কখনো কারামত দেখতে চাইবে না। কারণ কোন মু’মিন কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের নিকট মু’জিযা শরীফ দেখতে চাননি। (মাকতুবাতে ইমামে রব্বানী ২/৩০৬)
যারা হাকীকী মুরীদ তারা কখনো স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার নিকট কারামত দেখতে চায় না। আর শায়েখ উনার পক্ষ থেকে কারামত মুবারক প্রকাশিত হওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করে না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য কারামত বা অলৌকিক ঘটনা নয় বরং তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার সম্মানিত হাবীব ও মাহবূব, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মা’রিফাত-মুহব্বত, রেযামন্দী মুবারক হাছিল করা।
উল্লেখ্য যে, কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকরাই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট ঈমান গ্রহণ তথা সম্মানিত নুবুওওয়াত মুবারকের সত্যতা প্রমাণের জন্য মু’জিযা শরীফকে শর্তারোপ করতো। সেক্ষেত্রে অসংখ্য-অগণিত মু’জিযা শরীফও প্রকাশিত হয়েছিলো কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ঈমান গ্রহণ করেনি। বরং সম্মানিত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি শত্রুতার মাত্রা আরো বহু গুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছিলো। নাঊযুবিল্লাহ!
সেটাই মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَى وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ
অর্থ: “আমি যদি তাদের নিকট ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে পাঠাতাম এবং তাদের সাথে মৃত ব্যক্তিরা কথা-বার্তা বলতো কিংবা সব বস্তুকে তাদের সামনে জীবিত করে দিতাম তারপরও মহান আল্লাহ পাক তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত তারা কখনও বিশ্বাস স্থাপন করবে না; আর তাদের অধিকাংশই মূর্খ।” (সূরা আনয়াম/১১১)
বিশ্বাস স্থাপন তথা সম্মানিত নুবুওওয়াত মুবারকের সত্যতা প্রমাণের জন্য হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের নিকট মু’জিযা আশা করা যেমন মূর্খতা; তেমনি মহান আল্লাহ পাক উনার মা’রিফাত-মুহব্বত মুবারক হাছিলের পথগামীগণের জন্য স্বীয় মুর্শিদ কিবলার কারামত তালাশ করাও জিহালতি বা মূর্খতারই নামান্তর। কেননা ওলীআল্লাহ হওয়ার জন্য কারামত শর্ত নয় বরং কারামত জাহির হওয়ার জন্য ওলীআল্লাহ হওয়া শর্ত। কারণ আউলিয়ায়ে কিরাম উনারা ব্যতীত যাদের দ্বারা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয় তাকে কারামত বলা হয় না। তাকে বলা হয় ইস্তিদরাজ বা ভেল্কিবাজি।
তবে আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের জীবনে কারামত প্রকাশিত হবে না তা নয়। প্রত্যেক আউলিয়ায়ে কিরামগণের জীবনে কম-বেশী অনেক কারামতই প্রকাশ পেয়ে থাকে যা উনাদের মর্যাদা-মর্তবা, বুযূর্গী-সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীগণ সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ করেন না। বরং সর্বদা গোপন রাখাই সমীচীন মনে করেন। বরং একে গাইরুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত বলে অভিহিত করে থাকেন।
যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, খলীফাতুল্লাহ, খলীফাতু রসূলিল্লাহ, মুজাদ্দিদে আ’যম, সাইয়্যিদুনা মামদূহ হযরত মুর্শিদ কিবলা আলাইহিস সালাম তিনি এ ব্যাপারে একবার জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, “রিয়াজত-মাশাক্কাত করেও অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ যারা কাশ্ফ, কারামত হাছিলের দিকে নজর দিয়েছে তারা সফলতা লাভ করতে পারেনি।”
পূর্ববর্তী আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা এরূপ শিক্ষাই দিয়েছেন। কাশ্ফ কারামত ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে শরীয়ত তথা সুন্নত মুবারকের প্রতি গভীর মনোযোগী হওয়াই আবশ্যক।
হযরত আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি চল্লিশ হাজার হাদীছ শরীফ মুখস্ত করেছিলেন। চারশত উস্তাদের নিকট হতে ইলিমের সনদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি ইলমে ফিকাহ শিক্ষা সমাপনান্তে পূর্ণতা হাছিলের জন্য তদানীন্তন সময়ে মহান আল্লাহ পাক উনার মূল লক্ষ্যস্থল সাইয়্যিদুত তায়িফা, হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফে গমন করেন। দীর্ঘ ১০ দিন অবস্থান করলেন। ১০ দিন পর উনার সামানা (আসবাবপত্র) নিয়ে যখন চলে আসতে উদ্যত হলেন তখন সাইয়্যিদুত তায়িফা, হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুবারক দৃষ্টি উনার প্রতি নিবদ্ধ হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার; হে আবু বকর শিবলী! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
জাওয়াবে হযরত আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হুযূর! বেয়াদবী মাফ করবেন। ইলমে তাছাওউফ হাছিলের জন্য আপনার দরবার শরীফে এসেছিলাম। সে লক্ষ্যে ১০ দিন অতিবাহিত হলো; কিন্তু এ ১০ দিনে আপনার একটি কারামতও দৃষ্টিগোচর হলো না। তাই ফিরে যাচ্ছি।”
সাইয়্যিদুত তায়িফা, হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “হে আবূ বকর শিবলী! আপনি এই যুগের প্রসিদ্ধ আলিমে দ্বীন, তাই না? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। লোকে আপনাকে শ্রেষ্ঠ আলিম মনে করে? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। তাহলে বলুনতো এই ১০ দিনে আমাকে সুন্নতের খিলাফ কোন আমল করতে দেখেছেন কী?”
তিনি কিছুক্ষণ নিরব থাকলেন, কিছুক্ষণ চিন্তা-ফিকির করে বললেন, “জ্বি-না, সত্যি আপনাকে ১০ দিনে সুন্নত মুবারকের খিলাফ কোন আমল করতে দেখিনি।” তখন তিনি বললেন, “ইহাই হচ্ছে আমার কারামত।” সুবহানাল্লাহ! (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
انابة (ইনাবত) মাক্বাম হাছিলকারীগণের হালত বা অবস্থা
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ওলী আল্লাহগণ উনাদের ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭২)
১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭১)
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭০)
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৯)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৬)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৮)
১১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৭)
১০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












