ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৯)
, ০১ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৮ আউওয়াল, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৭ জুন, ২০২৬ খ্রি:, ০৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) আইন ও জিহাদ
ঐতিহাসিক খন্দকের জিহাদে খন্দক খননের পরামর্শদানকারী হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণের ওয়াকিয়া:
হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, অতঃপর আমার আব্বা আমাকে ভয় দেখালেন এবং পায়ে বেড়ি পরিয়ে আমাকে বাড়িতেই বন্দী করে রাখলেন। আমি খৃষ্টানদের নিকট সংবাদ পাঠালাম যে, যখন তোমাদের নিকট শামের খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসবে তখন তোমরা আমাকে জানাবে। (কিছুদিন পর) তাদের নিকট শামের এক খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসে। অতঃপর তারা আমাকে সংবাদ প্রদান করে। আমি তাদের বললাম, যখন তারা তাদের প্রয়োজনাদি সেরে ফেলবে এবং দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন আমাকে জানাবে। অতঃপর যখন তারা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করলো তখন আমাকে সংবাদ দিলো। অতঃপর আমি আমার পা থেকে বেড়ি খুলে ফেললাম এবং তাদের সাথে সিরিয়ার পথে রওয়ানা করলাম।
সিরিয়া পৌঁছার পর আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের মধ্যে এ ধর্মের ব্যাপারে সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? তারা বললো, গির্জার পাদ্রী। অতঃপর আমি পাদ্রীর নিকট গেলাম এবং বললাম, ‘আমি এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। অতএব আমি আপনার সাহচর্য লাভ করে গির্জাতেই আপনার খিদমত করতে চাই, আপনার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে ছলাত আদায় করতে চাই।’ অতঃপর তিনি (পাদ্রী) আমাকে গির্জাতে প্রবেশ করতে বললে আমি তার সাথে গির্জায় প্রবেশ করলাম।
সেই পাদ্রী অসৎ লোক ছিলো। মানুষজনকে সে ছদকা দেয়ার জন্য আদেশ করতো এবং খুবই উৎসাহিত করতো। কিন্তু যখন লোকজন তার নিকট (ছদকার) দ্রব্যাদি জমা দিতো, তখন সে মিসকীনদের কিছুই না দিয়ে তা নিজের জন্য জমা করে রাখতো। এভাবে সে স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে সাতটি কলস পূর্ণ করে।
হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি, আমি যখন এরূপ কার্যকলাপ দেখলাম তখন তার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হলাম। (এর কিছুদিন পর) সে মারা গেলো। খৃষ্টানগণ তাকে দাফন করার জন্য সমবেত হলো। আমি তাদের বললাম, এ ব্যক্তিটি অসৎ ছিলো। তোমাদের সে ছদকা করার আদেশ দিতো ও উৎসাহিত করতো বটে, কিন্তু যখন তোমরা তাকে সম্পদ দিতে তখন সে তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখতো এবং মিসকীনদের তা থেকে কিছুই দিতো না।
আমার কথা শুনে খৃষ্টানরা বললো, এ ব্যাপারে তোমার কি জানা আছে? আমি বললাম, আমি তোমাদেরকে তার সম্পদ সম্পর্কে অবহিত করবো। তারা বললো, আমাদের তা জানিয়ে দাও। আমি তাদের ঐ লোকটির (সম্পদ গচ্ছিত রাখার) স্থান দেখালাম। তারা সেখান থেকে স্বর্ণ-রৌপ্যপূর্ণ সাতটি কলস বের করলো। তারা তা দেখে বললো, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! আমরা তাকে কখনও দাফন করবো না। এরপর তারা তাকে শূলে চড়ালো এবং তার উপর পাথর নিক্ষেপ করলো। এরপর এক ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করলো। (মুসনাদে আহমদ শরীফ: হাদীছ শরীফ: ২৩৭৮৮, সিলসিলায়ে ছহীহাহ, হাদীছ শরীফ ৮৯৪)
হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি আরো বলেন, (নতুন পাদ্রী স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর) আমি এমন কোন ব্যক্তি দেখিনি যে পাঁচ ওয়াক্ত ছলাত আদায় করে সে এ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। পৃথিবীর মধ্যে আমি এরূপ দুনিয়াত্যাগী, আখিরাতের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী এবং দিন-রাত ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। ইতিপূর্বে আমি অন্তর থেকে তার চেয়ে বেশী আর কাউকে মুহব্বত করিনি। তার নিকট দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলাম।
এরপর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলো তখন আমি তাকে বললাম, হে অমুক! আমি আপনার সাথে ছিলাম এবং আপনাকে যেভাবে অন্তর থেকে মুহব্বত করেছিলাম ইতিপূর্বে আর কাউকে তেমন মুহব্বত করিনি। আর আপনার নিকট মহান আল্লাহ পাক উনার যে আদেশ মুবারক পৌঁছেছে তা আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এখন কার প্রতি আপনি আমাকে সোপর্দ করছেন এবং আমাকে কি আদেশ করছেন?
সেই পাদ্রী বললো, হে বৎস! মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! এখন আমি আমার পথের উপর কাউকে দেখিনা। মানুষজন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দ্বীন পরিবর্তন করেছে। তারা তাদের অনুসৃত ধর্মাচরণের অধিকাংশই ত্যাগ করেছে। তবে মসুলে (ইরাকের একটি শহর) এক ব্যক্তি আছে। সে অমুক। সে আমার পথে আছে। আপনি তার সাথে মিলিত হোন।
হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, অতঃপর যখন সে মৃত্যুবরণ করলো এবং তাকে দাফন করা হলো, তখন আমি মসুলের ব্যক্তিটির নিকট গেলাম। আমি তাকে বললাম, হে জনাব! অমুক ব্যক্তি আমাকে তার মৃত্যুর সময় অছিয়ত করেছে যে, আমি যেন আপনার সান্নিধ্যে থাকি এবং সে আমাকে বলেছে, আপনি তার পথের উপর আছেন। উত্তরে মসুলের সেই পাদ্রী বললো, ঠিক আছে আপনি আমার নিকট অবস্থান করুন। আমি তার নিকট অবস্থান করতে লাগলাম। আমি তাকে তার বন্ধুর পথে উত্তম মানুষ হিসাবে পেলাম। তবে কিছুদিন পরে সেও মৃত্যুবরণ করলো।
যখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসলো তখন আমি তাকে বললাম, হে শায়েখ! অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকট আসার জন্য অছিয়ত করেছিলো এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের জন্য আদেশ দিয়েছিলো। মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে আপনার উপর যা উপস্থিত হয়েছে তা আপনি দেখেছেন (অর্থাৎ আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে)। এখন আপনি কার নিকট যাওয়ার জন্য আমাকে অছিয়ত করছেন? আর আমাকে কি করার আদেশ দিচ্ছেন? (চলবে)
-আল্লামা মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১৬তম পর্ব)
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৮)
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৭)
০৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৭)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়:(১৫তম পর্ব)
০২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৬)
২৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৬)
২০ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১৪তম পর্ব)
১৯ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৫)
১৮ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৫)
১৩ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১৩তম পর্ব)
১২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৪)
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












