ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১২)
, ০৪ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৩ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ১০ বৈশাখ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) আইন ও জিহাদ
বনু কুরায়জা গোত্র বিশ্বাসঘাতকতা করলে, অন্যান্যদের ন্যায় সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন, হযরত উম্মুল মু’মিনীন আত তাসিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার আহাল, আল-হাকামও অভিযুক্ত হয়ে নিহত হয় এবং তিনি যুদ্ধ বন্দিনী হয়ে পড়েন। পরে তিনি স্বেচ্ছায় দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আত তাসিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র নিসবাতুল আযীমাহ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। সুবহানাল্লাহ! ইহা হচ্ছে জমহুর সীরত গ্রন্থকারদের বর্ণনা।
বনু কুরায়জা ইহুদী গোত্রের বিশ^াসঘাতকতার কারণে সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আত তাসিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার আহাল ও অন্যান্য যারা নিহত হয়েছিলো তার প্রেক্ষাপট এই যে, পবিত্র মদীনা শরীফে তিনটি ইহুদী গোত্র বাস করতো। তন্মধ্যে তাদের বৃহত্তম গোত্র ছিলো বনু কুরায়জা। এই গোত্র ছিলো চরম বদ ও দুর্মুখো। আর এ কারণে খালিক, মালিক, রব, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে শায়েস্তাও করেন কঠোরভাবে। ঐ সময় ইহুদীরা মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইহুদীদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। তাতে তাদের জান-মাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু ক্রমে তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদের সাথে নতুন চুক্তি সম্পাদনে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু বনু নাদ্বীর তাতে অস্বীকৃতি জানালে তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পক্ষান্তরে বনু কুরায়জা নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় তাদেরকে দেশে থাকার নিরাপত্তা দেয়া হয়, মুসলিম শরীফে তাদের ঘটনা সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলতেন, বনু নাদ্বীর ও বনু কুরায়জার ইহুদীগণ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যুদ্ধ করে। তিনি বনু নাদ্বীরকে দেশ থেকে বের করে দেন। আর বনু কুরায়জাকে দেশে থাকার অনুমতি বহাল রাখেন। এক্ষেত্রে বনু কুরায়জার চুক্তি নবায়নে একটি কূট উদ্দেশ্যও ছিলো। তা হলো- পবিত্র মদীনা শরীফ থেকে সুযোগ বুঝে মুসলমানদেরকে আক্রমণ করা। খন্দকের জিহাদে তারা এই সুযোগ প্রয়োগ করেছিলো।
মোট কথা বনু নাদ্বীর দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তাদের প্রধান নেতা হুয়াই বিন আখত্বাব, আবু রাফে’, সালাম ইবনে আবিল হুকায়ক প্রমূখ খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবং তথাকার নেতৃত্ব লাভ করে। খন্দকের জিহাদ ছিলো তাদের চেষ্টার ফল। তারা কুরাইশ, বনু সুলায়ম, গাতফান, বনু আসাদ, আশজা’, ফাযারা, বনু মুররা প্রভৃতি আরবের সকল গোত্রগুলিতে যাতায়াত করে তাদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলে এবং একযোগে পবিত্র মদীনা শরীফ আক্রমণে উদ্ধুদ্ধ করে। ফলে বিভিন্ন গোত্রের ১০ হাজার আরব মুসলমানদের উপর একযোগে আক্রমণ পরিচালনা করে।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পবিত্র মদীনা শরীফে বসে আত্মরক্ষা করা সম্ভব হবে না। সুতরাং পবিত্র মদীনা শরীফে নারী ও শিশুদেরকে রেখে সকল পুরুষ সামনে অগ্রসর হয়ে সালা’ পর্বতের নিকট সমবেত হন। সালা’ পর্বত পশ্চাতে রেখে সম্মুখ দিকে খন্দক/পরীখা খনন করা হয় এবং এই পরীখার ঘেরাওয়ের মধ্যে সকলে অবস্থান গ্রহণ করেন। কাফির বাহিনী এসে খন্দক/পরীখা ঘেরাও করে।
বনু কুরায়জা তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলো। ঠিক সে সময় সংবাদ পাওয়া গেলো যে, বনু কুরায়জা প্রকাশ্যে চুক্তি ভঙ্গ করেছে। হুয়াই বিন আখত্বাবের প্ররোচনায় তারা বিদ্রোহ করেছে। সে তাদেরকে আশ্বাস দিয়েছে যে, যদি কুরাইশরা পিছু হটে যায়, তাহলে আমি তোমাদের সাথে বসতি স্থাপন করবো। এ সংবাদে মুসলমানগণ পবিত্র মদীনা শরীফ হিফাজতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের চিন্তা করেন। কারণ পবিত্র মদীনা শরীফে নারীকূল, শিশু ও সব মালামাল ছিলো এবং হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে সেখানে খলীফা করে সেখানে রেখে আসা হয়েছে। তাদেরকে রক্ষা করার কোন উপায় ছিলো না। পুরুষগণ খন্দক/পরীখার মধ্যে আবদ্ধ, আর বনু কুরায়জার আবাসভূমি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার অদূরেই ছিলো। যে কোন মূহূর্তে তাদের পক্ষ থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সর্বপ্রথম সংবাদ যাচাইয়ের জন্য হযরত সা’দ ইবনে মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হাওয়াত বিন যুবায়র রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমূখ কতিপয় ছাহাবীকে প্রেরণ করেন। উনারা এসে সংবাদ সত্য বলে অবহিত করেন।
তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু হারিছার কতিপয় সাহসী নওজোয়ানকে পবিত্র মদীনা শরীফে প্রেরণ করেন, এরপরেও মুসলমানগণ আরো বিশেষ ব্যবস্থার গ্রহণ করেন। দীর্ঘ এক মাস পর্যন্ত কাফিররা মুসলমানদের অবরোধ করে রাখে। অবশেষে খালিক, মালিক, রব, মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে গায়েবী মদদ এসে যায়। এক শীতের রাত্রে প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়া এসে কাফিরদের তাঁবু উড়িয়ে নেয়। তাদের হাড়ি, পাতিল, আগুন আর কিছুই স্থির থাকলো না, সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। অতঃপর হযরত আবু সুফিয়ান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (তখন পর্যন্ত তিনি ঈমান প্রকাশ করেননি) উনার নির্দেশে কাফিরগণ তৎক্ষণাৎ খন্দকের জিহাদের স্থান পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সকাল বেলা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মুসলমানদেরকে নিয়ে খন্দক প্রান্তর ত্যাগ করেন এবং পবিত্র মদীনা শরীফে এসে পৌঁছেন। (সীরতে ইবনে হিশাম) (চলবে)
-আল্লামা মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৭)
০৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৭)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়:(১৫তম পর্ব)
০২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৬)
২৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৬)
২০ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১৪তম পর্ব)
১৯ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৫)
১৮ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৫)
১৩ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১৩তম পর্ব)
১২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৪)
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১২তম পর্ব)
০৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৩)
২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












