ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১৩)
, ১০ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৯ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ১৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) আইন ও জিহাদ
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি খন্দকের জিহাদ থেকে পবিত্র মদীনা শরীফে ফিরে গিয়ে তখনও যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্র খুলেননি, এমতাবস্থায় হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে উপস্থিত হন। উনার মাথায় ছিলো রেশমী পাগড়ী। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন? নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন: হ্যাঁ। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, কিন্তু ফেরেশতাগণ এখনও অস্ত্র রাখেননি। আমি এইমাত্র শত্রুদের ধাওয়া করে আসলাম। খালিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে বনু কুরাইজার উপর জিহাদ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তাদের কাঁপিয়ে দিতে যাচ্ছি।
অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশ মুবারকে ঘোষক এইরূপ ঘোষণা করলো- “তোমরা যারা বাধ্য, অনুগত, তারা বনু কুরাইজার বসতিতে গিয়েই আছরের নামায আদায় করবে।” নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনাকে পতাকা নিয়ে সবার আগেই পাঠিয়ে দেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী সৈন্যগণ যখন বনু কুরাইজার দুর্গের নিকটে উপস্থিত হন, তখন তারা প্রকাশ্যেই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে গালমন্দ করতে শুরু করে। অতঃপর তাদেরকে অবরোধ করা হয়। (সীরাতুন্নবী, ইবনে হিশাম)
দীর্ঘ ২৫ দিন অবরোধের পর তারা আবেদন জানায় যে, হযরত সা’দ বিন মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে ফায়সালা করবেন, তাই তারা মেনে নিবে। (সীরাতুন্নবী, ইবনে হিশাম) হযরত সা’দ বিন মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও উনার বংশ বনু কুরাইজার মিত্র ছিলেন। তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত ছিলো। আরবদের মধ্যে এই সম্পর্ক বংশসূত্রের সম্পর্ক থেকেও বড় বিবেচিত হতো। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের আবেদন মঞ্জুর করলেন। হযরত সা’দ ইবনে মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এ ব্যাপারে রায় দেন যে, বনু কুরাইজার যুদ্ধক্ষম ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হোক। মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করে রাখা হোক এবং তাদের মাল-সামানা গণিমত হিসাবে নিয়ে নেয়া হোক। এ রায় ছিলো তাওরাত শরীফ উনার নির্দেশ অনুযায়ী। সুবহানাল্লাহ!
বহু হাদীছ শরীফে উল্লেখ হয়েছে, হযরত সা’দ বিন মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন এ রায় দেন, তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আপনি তো আসমানী ফায়সালাই করেছেন। ইহুদীদেরকে এ রায় শুনানোর পর তাদের মুখ থেকে যেসব কথা বেরিয়েছিলো, তা থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় যে, তারা এ রায়কে মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমের অনুরূপই মনে করেছিলো।
ইহুদী বনু কুরাইজা গোত্রের প্রতি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অনেক ইহসান করেন। তাদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেন। তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। তাদের জান-মালের নিরাপত্তার অঙ্গীকার প্রদান করেন। বনু কুরাইজা সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে বনু নাদ্বীর অপেক্ষা নীচে ছিলো। যেমন, বনু নাদ্বীর গোত্রের কোন লোক যদি বনু কুরাইজার কোন লোককে হত্যা করতো, তবে তাকে অর্ধেক রক্তপণ দিতে হতো। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদের উপর এ ইহসান করেন যে, রক্তপণ আদায়ের ক্ষেত্রে বনু কুরাইজাকে সমমর্যাদা প্রদান করা হয়। ফলে বনু নাদ্বীরকে পরিপূর্ণ রক্তপণ আদায়ে বাধ্য করেন। এ সবের পরেও বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করে খন্দকের জিহাদে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। খন্দকের জিহাদের সময় হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম ও অন্যান্য মুসলিম মহিলাকে যে দুর্গে রাখা হয়েছিলো, দুর্বৃত্ত বনু কুরাইজা সে দুর্গ আক্রমনে উদ্যত হয়েছিলো। নাউযুবিল্লাহ!
হুয়াই বিন আখতাবকে বিদ্রোহ করার দরুণ দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। সে সমস্ত আরব গোত্রকে মুসলমানদের বিরদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলো এবং তারই প্রত্যক্ষ কারসাজিতে খন্দকের জিহাদ সংগঠিত হয়েছিলো। বনু কুরাইজা তাকে সাথে নিয়ে এসেছিলো। সুতরাং এসব অবস্থার প্রেক্ষিতে বনু কুরাইজার সাথে কঠোর ফায়সালা ছাড়া আর অন্য কিছুই সম্ভব ছিলো না।
অনেক মুনাফিক অপপ্রচার করে যে, হযরত সা’দ বিন মুয়ায রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিহাদে আহত হয়েছিলেন, সেজন্য তিনি বনু কুরাইজার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে এরূপ কঠোর ফায়সালা দিয়েছিলেন। ইহা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ তিনি খন্দকের জিহাদে আহত হয়েছিলেন, বনু কুরাইজার কেউ উনাকে আহত করেনি। বনু কুরাইজা ছিলো উনার মিত্র গোত্র। কাজেই তিনি পবিত্র তাওরাত শরীফ অনুযায়ী চুক্তিভঙ্গের শাস্তির রায় ন্যায়-সঙ্গতভাবেই দিয়েছিলেন, কোনরূপ শত্রুতার বশবর্তী হয়ে রায় দেননি।
নিহতদের সংখ্যা ঐতিহাসিকগণ ৬ শত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনাদের বর্ণনায় জানা যায় যে, এরা ছিলো চারশত জন। এদের মধ্যে একজন ছিলো মহিলা। তাকে কেছাছের জন্য হত্যা করা হয়েছিলো। সে দুর্গের উপর থেকে পাথর নিক্ষেপে একজন মুসলমানকে হত্যা করেছিলো। এই ছিলো বনু কুরাইজা গোত্রের যুদ্ধক্ষম ব্যক্তিদের নিহত হওয়া, তাদের নারী ও শিশুদের বন্দী হওয়া এবং তাদের পরিত্যক্ত সম্পদ গণিমত হিসাবে মুসলমানদের অধিকারে আসার প্রেক্ষাপট। সুবহানাল্লাহ! (সীরাতুন নবী, শিবলী নুমানী) (চলবে)
-আল্লামা মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১২)
২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১২)
২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১২)
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়:
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১১)
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (১০ম পর্ব)
১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১০)
১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১১)
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৯ম পর্ব)
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৯)
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১০)
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
খরচ করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক উনার ফায়সালা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












