মন্তব্য কলাম
“বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে ১৪০টির বেশি দেশে”- গত পরশু (৮ই জুন) এই বিবৃতি দেয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী ভেবে দেখবেন মার্কিনীদের সাথে করা গোলামী চুক্তিতে তার এই উচ্ছাস পুরোটাই গভীর এবং চরম-পরম উৎকণ্ঠায় পর্যবসিত হয়েছে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্যও মহা ধ্বংস প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ৫১ কোটি নাগরিকের নিরাপত্তা নির্মূলীকরণ প্রক্রিয়া। মহা আত্মঘাতী, সর্বনাশী, দেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রিকারী এ চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে (১ম পর্ব)
, ২৪ যিলহজ্জ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১২ আউওয়াল, ১৩৯৪ শামসী সন , ১১ জুন, ২০২৬ খ্রি:, ২৮ জৈষ্ঠ্য, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মন্তব্য কলাম
গত পরশু (৮ই জুন) সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের ওষুধ ১৪০টিরও বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গত দুই দশকে দেশের অন্যতম সফল শিল্প খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই খাতটি এখন দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির নানা শর্ত দেশের বিকাশমান এই শিল্পের জন্য ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে, মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights) সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আরোপের বিষয়টি শিল্পটির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্কিন চুক্তির মেধাস্বত্ব আইন-সংক্রান্ত ২.৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড অ্যা রোবাস্ট স্ট্যান্ডার্ড অব প্রটেকশন ফর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড ইফেকটিভ সিস্টেমস ফর সিভিল, ক্রিমিনাল অ্যান্ড বর্ডার এনফোর্সমেন্ট অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস অ্যান্ড শ্যাল এনশিওর দ্যাট সাচ সিস্টেমস কমব্যাট অ্যান্ড ডেটার দ্য ইনফ্রিংমেন্ট অর মিসঅ্যাপ্রোপ্রিয়েশন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টিৃ’Ñ এই ধারাটির বার্তা হলো বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ব বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট’ (আইপি) আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে, পেটেন্ট আইনকে শক্তভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকÑ এই নীতির প্রয়োগে কার্যত বাংলাদেশের জন্য আদৌ সুখকর কি? নাকি পুরোটাই ভয়াবহ কাহিনী?
আমাদের ওষুধশিল্পের সঙ্গে মেধাস্বত্ব আইনের একটা জটিল সম্পর্ক আছে। দেশে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ ‘জেনেরিক’ ওষুধের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে (বেশির ভাগেরই পেটেন্ট নেই)। এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের (ইনগ্রেডিয়েন্ট) মধ্যে কোনটির আইপি লাইসেন্স আছে, কোনটির নেই, কোনটির ‘পেটেন্ট’ লঙ্ঘিত হয়েছে, কোনটির হয়নি, এটা কীভাবে নির্ণয় করা সম্ভব? কে করবে, কীভাবে করবে? এটা কার কাজ? এটা আর যাই হোক কোনোভাবেই বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কাস্টমসের কাজ নয়। তা হলে এই কাজটি করবে কে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চমকে উঠতে হয়।
কাঁচামাল বা পণ্য আমদানিতে বিদেশি কোম্পানির ‘আইপি রাইট’ লঙ্ঘিত হলে বাংলাদেশের কাস্টমস যেন সেটা ‘পাকড়াও’ করতে পারে, এই উদ্দেশ্যে অনেক দিন আগে থেকেই বন্দর কাস্টমসের সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকানরা আমাদের কাস্টমসের সব ডিজিটাল তথ্যের অধিকার চাইছে, আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ চাইছে। অর্থাৎ তারা আমাদের বন্দর ও কাস্টমসের সব ডেটা হাতে নিয়ে বসে থাকবে এবং উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি জাপানিদের, সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের, স্বার্থ বহুজাতিক কোম্পানির, কিন্তু বাংলাদেশ কাস্টমস বিদেশিদের এজেন্ট হয়ে নিজের দেশের উৎপাদকদের ধরপাকড়ের কাজটি করবে!
কাঁচামালের পেটেন্ট নির্ণয় আন্তর্জাতিকভাবেই ঝামেলাপূর্ণ বিষয়। হাজারো মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। সেই হিসাবে এটি একটি জুডিশিয়াল বা বিচারিক ইস্যুও। আফ্রিকায় এইডস বা টিবির ওষুধের অভাবে অজস্র রোগীর মৃত্যুর পরে ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে আফ্রিকা জুড়েই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
এই মাত্রার একটি স্পর্শকাতর এবং তুমুল বিতর্কের বিষয়কে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লেন্স থেকে দেখা জরুরি, দেশে দেশে পেটেন্ট-সম্পর্কিত আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসগুলোও ঘেঁটে দেখা প্রয়োজন।
চুক্তিতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার মেধাস্বত্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জরুরি আলাপগুলোকে বিচার্য-বহির্ভূত করে এটাকে শুধু একটি পুলিশি ইস্যুতে নামিয়ে এনেছে। ব্যাপারটা এ রকম যে জাপান থেকে ট্র্যাক করবে, সচিবালয় থেকে ঢালাও নির্দেশ দেওয়া থাকবে-সবাইরে ধরো, আর কাস্টমস গ্রেপ্তার করবে। অথচ প্রতিটি পেটেন্ট ইস্যু গভীর পর্যবেক্ষণ করার দাবি রাখে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিসের টেকনিক্যাল এবং আইনগত (লিগ্যাল) দক্ষতার ঘাটতি আছে। একেকটি নতুন আবিষ্কারের পেটেন্ট অধিকার কে, পাবে কে পাবে না-এটা নির্ধারণের জন্য যে অর্থনৈতিক-সামাজিক-বিচারিক বিচক্ষণতা, আইনি প্রশিক্ষণ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং জনস্বার্থের বোঝাপড়া প্রয়োজন, সেটা আসলেও নেই। আবার এ-সংক্রান্ত মামলাগুলো মোকাবিলা করার মতো দক্ষ আইনজীবীরও অভাব আছে। এটা যে শুধু টেকনিক্যাল বিষয় নয়, বরং একটা ‘জনস্বার্থ বনাম ব্যবসায়িক মুনাফা’ ইস্যু (পাবলিক ইন্টারেস্ট বনাম প্রফিট), সেটা বোঝার সক্ষমতায় ঘাটতি আছে এখানে।
এ রকম অপ্রস্তুত অবস্থায় আমরা আমাদের নিজেদের ওষুধ কোম্পানিগুলোর আইপি-রাইট লঙ্ঘনকে খপ করে ধরে ফেলার আমেরিকান/জাপানি প্রশিক্ষণ পাওয়াকে ‘প্রযুক্তির হস্তান্তর’ হিসেবে প্রচার করছি? বিশ্বজুড়ে পেটেন্ট বা ট্রেডমার্ক ইস্যুগুলোর মীমাংসা করতে দীর্ঘ কোর্ট লড়াইয়ের প্রয়োজন পড়ছে, অথচ মার্কিন চুক্তির মাধ্যমে আমরা আমাদের কোর্টের সার্বভৌমত্বকে তুলে দিচ্ছি আমেরিকার হাতে?
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান আরিফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার প্রধান কারণ ‘মাফিয়া তান্ত্রিক’ সিন্ডিকেট ব্যবস্থা।
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারত বাংলাদেশ চুক্তিকে তারা গোলামীর চুক্তি বলে কঠিন আওয়াজ তুলেছিলো! আজ আমেরিকার প্রকাশ্য গোলামী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তারা নীরব কেনো? দেশ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধীরাও নিস্ক্রিয় থেকে কঠিন বৈষম্য করছে।
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ২য় অংশ)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আম রফতানীর বাধা দূর এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় গুরুত্ব দিন
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ১ম অংশ)
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বর্তমানে সন্ত্রাসী দখলদার ইহুদীদের দ্বারা ফিলিস্তীনীদের উপরে চরম যুদ্ধাপরাধ করার পরও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করার পরও কী এদেশের মুসলমানরা আর্জেন্টিনা উন্মাদনায় উন্মত্ত থাকবে? গ্যালারীতে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা, মুসলমান বলে মিশরীয় সমর্থকদের উপর মদ ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করেছে।
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নারিকেল দ্বীপ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অস্তিত্বের সংকট
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
রেলে যাত্রীসেবার সাথে সাথে পণ্য পরিবহণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা দিতে হবে।
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কৌশলগত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
যা কিছু ‘কালো’ তার সাথে ‘প্রথম কালো’ প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












