মন্তব্য কলাম
যাকাতের নামে আলাদা নিম্নমানের কাপড় তৈরী ও সরবরাহ বন্ধ এবং লোকদেখানো যাকাত দেয়ার প্রবণতা প্রতিহত করতে হবে। যাকাতের কাপড় নিতে গত ৩৫ বছরে নিহত ২৫৪ জন। পবিত্র যাকাতের কাপড়ের নামে সিন্ডিকেট এবং নাম কামানো পবিত্র যাকাতকে অবমাননা করার শামিল। নাউযুবিল্লাহ!
, ১৫ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১৭ আশির, ১৩৯২ শামসী সন , ১৬ মার্চ, ২০২৫ খ্রি:, ২৯ ফালগুন, ১৪৩১ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) মন্তব্য কলাম
প্রতি পবিত্র রমাদ্বান শরীফের শুরুতেই কাপড়ের দোকানের সামনে একটা অভিনব ব্যানার লক্ষ্য করা যায়, যেখানে লেখা থাকে- ‘এখানে যাকাতের কাপড় পাওয়া যায়। ’ এভাবে আলাদা করে লেখার কারণ জানতে চাইলে দোকানি বলে, ‘যাকাতদাতাদের অধিকাংশই যাকাতের কাপড় কম দামে এবং সংখ্যায় বেশি চায়। ’
‘গরিব-অসহায় মানুষ পবিত্র ঈদ উনার আগে নতুন কাপড় পেলে খুবই খুশি হয়। তাই যাকাতদাতারা বেশি মানুষকে খুশি করার জন্য বেশি বেশি কাপড় কিনে। যাকাতদাতারা এখন মূলত নাম কামাইয়ের জন্য যাকাত দেয়। এতে করে যাকাত গ্রহীতারা কত নিম্নমানের কাপড় পেল অথবা এ নিম্নমানের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে কতজন মারা গেল সেদিকে তাদের আদৌ ভ্রƒক্ষেপ নেই। নাঊযুবিল্লাহ!
যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মানুষ মরার ট্র্যাজেডি এ দেশে নতুন নয়। প্রতিবছরই যাকাতের কাপড় দেয়ার নামে গরীব মারার উৎসব পালন করে কথিত সম্পদশালীরা। চলমান এই যাকাতের কাপড় দেওয়ার পদ্ধতি রীতিমতো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
যাকাতের কাপড়ের কথা বলতে গেলেই চিরচেনা দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রোযার ঈদ এগিয়ে আসলেই দেখতাম গ্রামের গরিব মহিলাগুলো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দামের একটি শাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করছে। কারো ভাগ্যে জুটত, কারো জুটত না। শাড়িটি পরে রাস্তায় বের হলেই যে কেউ বলে দিতে পারতো- এটা যাকাতের কাপড়। ওই মহিলার দিকে তাকিয়ে সবাই এক ধরনের উপহাসের ইঙ্গিত করতো। যাকাতের নাম করে ২০০ টাকার একটি কাপড় দিয়ে সারাজীবনের জন্য একজন মায়ের শরীরে এঁকে দেয়া হতো বিদ্রূপের চিহ্ন। সারাদিন রোযা রেখে ৫০ টাকার একটি নোটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি। এক রঙের শাড়ি, ৫০-১০০ টাকার নোট দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে বিদায় করা। এ কোন ইসলাম? সম্মানিত দ্বীন ইসলামের কোথায় লেখা আছে এই যাকাত পদ্ধতির কথা? সম্মানিত দ্বীন ইসলাম তো বলে, ডানে হাতে দান করলে বাম হাত যেন না জানে।
যাকাত নিয়ে তো গরিবের দরজায় হাজির হবে ধনী। ধনীর দুয়ারে গরিব কেন? আমাদের সমাজের উচ্চবিত্তদের ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নিজেকে জাহির করা উন্মাদ এক খেলার নাম এখন যাকাত। কারো কারো তো নির্বাচনী প্রচারণাও বটে।
সবচেয়ে অবাক লাগে, যখন দেখি কোনো শপিং মলের শোরুমে লেখা থাকে এখানে ‘যাকাতের কাপড় পাওয়া যায়’। একজন সম্পদশালীর যে পরিমাণ যাকাত আসে, তা পুরোপুরি অনেকেই দেয় না। আবার যতটুটু দেয়া হয়, তা সঠিকভাবে দেয়া হয় না।
বিভিন্ন জরিপে প্রকাশ, যাকাত নিতে গত ৩৫ বছরে নিহত হয়েছে ২৫৪ জন। আহতের সংখ্যা অসংখ্য। সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হয়েছে ২০০২ সালে গাইবান্ধায়। এতে ৪২ জন নিহত হয়। ২০০৩ সালে ভিড়ের চাপে নারী ও শিশুসহ ৯ জন মারা যায়। ২০০৬ সালে ৩ জন, ২০১১ সালে ৭ জন, ২০১২ সালে ৩ জন, ২০১৪ সালে ২ জন মারা যায়। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে পদদলিত হয়ে ১০ জন লোকের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় যাকাতের কাপড় ও ইফতারসামগ্রী নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নয়জন নিহত হয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এক সিরাজগঞ্জেই মারা গেছে ৪ জন। ২০২৪ সালে ৮ই এপ্রিল অর্থাৎ গত রমাদ্বান শরীফেও হেডিং হয়েছে- “রাজবাড়ীতে যাকাতের কাপড় আনতে পদদলিত হয়ে বৃদ্ধা নিহত”। উল্লেখ্য এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া দুই একটি খবর মাত্র। প্রায় প্রতি বছর এরকম যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে মৃত্যুর খবর হচ্ছে আরো অনেক। কিন্তু এর অবসানে সরকারের কোনো তৎপরতা এযাবত লক্ষ করা যাচ্ছে না।
নিম্নমানের সুতা ও দুর্বল রং আর অদক্ষ কারিগরের তৈরি এসব কাপড়ের মান এতটাই খারাপ যে, এক ধোয়ার পর আর পরা যায় না তথা পরার উপযুক্ত থাকে না এসব কাপড়। জালের মতো ফাঁকা হয়ে যায় সুতাগুলো। রঙিন কাপড় থেকে রং আর মাড় উঠে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। দেখলে মনে হয় ঘর মোছার ন্যাকড়া। মূলত, পবিত্র যাকাত নিয়েও মুনাফাখোররা অতি মুনাফাখোরী করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বছর একটি অসৎ চক্র শুধু পবিত্র যাকাত উনার নামে অতি নিম্নমানের কাপড় বিক্রি করে কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
পোশাক খাত রমযান শরীফ মাস আসলেই একটি বিশেষ সিষ্টেমের মধ্যে বন্দি হয়ে যায়। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো উন্নত ও দামী কাপড়গুলো বিদেশে রফতানি করে কিংবা বড় বড় শপিং মলগুলোতে সরবরাহ করে। আর অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় হাজারের উপরে একটি কাপড় ব্যবসায়ী মহল রয়েছে যারা এসব কারখানায় উৎপাদিত ওয়েস্ট কিংবা রফতানি বাছাইয়ে বাদ পড়েছে এমন নিম্নমানের কাপড়গুলো কিনে নেয় চুক্তির ভিত্তিতে। আর সেই কাপড়গুলোই পবিত্র রমযান শরীফ মাসে যাকাতের কাপড় হিসেবে বাজারে সরবরাহ করে থাকে। অর্থাৎ এখানে একটি সিন্ডিকেট মহলই এই যাকাতের কাপড়ের প্রচলন ঘটিয়েছে।
মনে রাখা উচিত- পবিত্র যাকাত মানে কাউকে অনুগ্রহ- দান করা বুঝায় না। বরং পবিত্র যাকাত গ্রহণ করার মাধ্যমে গ্রহীতা সম্পদের অধিকারী মানুষটিকে অনুগ্রহ করে। এজন্য যার পবিত্র যাকাত পাওয়ার হক্ব আছে তাকে পবিত্র যাকাত উনার টাকার হক্বটা পৌঁছিয়ে দেয়াই মুসলমানদের কর্তব্য। কিন্তু পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আলোকে সঠিক যাকাতব্যবস্থা আমাদের দেশে-সমাজে সরকারিভাবে প্রচলিত না থাকায়- এ সম্পর্কে রয়েছে নানা ভুল ধারণা। আমাদের দেশের এক শ্রেণীর মানুষ পবিত্র যাকাত প্রদানের নামে লোক-দেখানো কিছু কাজ করে গরিব মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। আর এতে করে পবিত্র যাকাত সম্পর্কেই তৈরি হয়েছে ভুল ধারণা। এছাড়াও পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার সম্পর্কে জানার প্রতি উদাসীনতাও এজন্য দায়ী।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- “তাদের (বিত্তবানদের) সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের রয়েছে অধিকার। ” (পবিত্র সূরা যারিয়াত শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৯)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র বা উৎকৃষ্ট ব্যতীত কোনো কিছুই কবুল করেন না। (বুখারী শরীফ)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সম্মানিত রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, শরীয়ত তথা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের ফতওয়া হলো- যেটা সবচেয়ে ভালো, পছন্দনীয় ও মূল্যবান সেটাই দান করতে হবে। আর যেটা খারাপ, নিম্নমানের ও নিম্নমূল্যের সেটা দান করা যাবে না। অর্থাৎ পবিত্র যাকাত তথা দান-ছদকার বস্তু যেমন হালাল হওয়া শর্ত, তেমনি তা উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে মূল্যবান হওয়াও শর্ত। অন্যথায় তা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আদৌ কবুলযোগ্য নয়।
কাজেই যাকাত-ফিতরা, দান-ছদক্বা, সবকিছু করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে। গাইরুল্লাহর জন্য কোনো আমল করা যাবে না। মানুষ দানশীল বলবে, দানবীর বলবে, দাতা বলবে, মানুষ জানবে, চিনবে, সমাজে নামধাম হবে, প্রচার-প্রসার ঘটবে, পরিচিতি হবে, যশ-খ্যাতি অর্জিত হবে, সমাজের অধিপতি হওয়া যাবে, নেতা-নেত্রী হওয়া যাবে, মসজিদের সেক্রেটারী, সভাপতি হওয়া যাবে, এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, মন্ত্রী-মিনিস্টার হওয়া যাবে ইত্যাদি সবই হলো গাইরুল্লাহ। এই গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্য থাকার কারণে দেখা যায়, বেশি লোককে পবিত্র যাকাত দেয়ার জন্য তারা কম দামের খদ্দরের পাতলা লুঙ্গি ও পাতলা শাড়ি দিয়ে থাকে যা সাধারণভাবে পড়ার উপযুক্ত নয়। কারণ সে লুঙ্গি ও শাড়ি পবিত্র যাকাত দানকারী ও দানকারিণী পরিধান করতে কখনোই রাজি হবে না বা পছন্দ করবে না।
যদি তাই হয়, যেটা পবিত্র যাকাত দানকারী ও দানকারিণী নিজেরা গ্রহণ করতে রাজি নয়; সেটা মহান আল্লাহ পাক তিনি কী করে গ্রহণ করবেন? মূলত সে দান আদৌ মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কবুলযোগ্য হবে না।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ভারত বাংলাদেশ চুক্তিকে তারা গোলামীর চুক্তি বলে কঠিন আওয়াজ তুলেছিলো! আজ আমেরিকার প্রকাশ্য গোলামী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তারা নীরব কেনো? দেশ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধীরাও নিস্ক্রিয় থেকে কঠিন বৈষম্য করছে।
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ২য় অংশ)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আম রফতানীর বাধা দূর এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় গুরুত্ব দিন
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ১ম অংশ)
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বর্তমানে সন্ত্রাসী দখলদার ইহুদীদের দ্বারা ফিলিস্তীনীদের উপরে চরম যুদ্ধাপরাধ করার পরও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করার পরও কী এদেশের মুসলমানরা আর্জেন্টিনা উন্মাদনায় উন্মত্ত থাকবে? গ্যালারীতে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা, মুসলমান বলে মিশরীয় সমর্থকদের উপর মদ ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করেছে।
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নারিকেল দ্বীপ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অস্তিত্বের সংকট
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
রেলে যাত্রীসেবার সাথে সাথে পণ্য পরিবহণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা দিতে হবে।
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কৌশলগত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
যা কিছু ‘কালো’ তার সাথে ‘প্রথম কালো’ প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুসলিম যোদ্ধাদের মস্তক ছিন্ন করে বাক্স বন্দী করে "যুদ্ধের ট্রফি" হিসেবে নিয়ে যেতো প্যারিসে (৩)
০৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












