স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলমানদের শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন ইসলামী মৃৎপাত্র (৪)
, ২২ মুহররমুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৯ ছানী, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রি:, ০৩ শ্রাবণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) স্থাপত্য নিদর্শন
নিশাপুরের অনেক ধরনের রঞ্জিত মৃৎপাত্র সমরকন্দেও প্রচলিত আছে। লিপিমালাসহ সাদা-কালো রঙে চিত্রিত মৃৎপাত্র এই দুই প্রদেশে তৈরি করা হয়ে থাকে যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নিশাপুর ও সমরকন্দে এমন এক জাতীয় মৃৎপাত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে যার অলঙ্করণ প্রক্রিয়ায় শুভ্র পটভূমির ওপর পিঙ্গল বর্ণের, জলপাই-সবুজ এবং ইট-লাল রঙের ব্যবহার করে পাত্রের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নিশাপুর ও সমরকন্দে প্রাপ্ত মৃন্ময়পাত্রের অলঙ্করণের ক্ষেত্রে আর একটি অভিনবত্ব হলো যে, বিভিন্ন রঙের যেমন হলদে, পীত অথবা ইট-লাল রঙের পটভূমিতে সরু রঞ্জিত সলাকায় অলঙ্করণ সুশোভিত করে তোলা। এই জাতীয় অলঙ্কৃত মৃন্ময়পাত্রের উদাহরণ মেট্টোপলিটান মিউজিয়াম এবং তেহরান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এসব মৃন্ময়পাত্রের অলঙ্করণ প্যাটার্নের মধ্যে গোলাপসদৃশ অনুকৃতি এককভাবে, আবার কোনো সময় লিলি ফুলসদৃশ প্যামেটের সাথে যুক্ত হয়ে উপস্থাপিত করা উল্লেখযোগ্য।
এরূপ অলঙ্করণের দু’টি ক্ষুদ্র বাটি মেট্টোপলিটান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর পটভূমি হচ্ছে বেগুনে রঙের যার ওপর সাদা, হলদে ও ইট-লাল রঙের সরু সলাকায় অলঙ্করণ সজ্জা সম্পন্ন করা হয়েছে। আবার অন্যান্য মৃৎপাত্রে বিমূর্ত স্ক্রোলকর্ম, প্যামেট অথবা বিন্দুগুচ্ছ অলঙ্করণ প্যাটার্ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
সবচেয়ে নান্দনিক সৌন্দর্য শোভিত মৃৎপাত্রের মধ্যে লিপিমালা খচিত বাটি অন্যতম। এই জাতীয় একটি অনন্য সৌন্দর্যের বাটি মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এটিতে কালো-পীত বর্ণের সরু সিøপের ওপর অত্যন্ত মনোরম কুফিক লিখনশৈলীতে শুভ্র রঙে ‘আল-বারাকা’ শব্দটি উপস্থাপিত হয়েছে। এটির তৈরি-সময়কাল নবম শতাব্দীর শেষে অথবা দশম শতাব্দীর প্রথমে গণ্য করা যায়।
ঙ. অতি উজ্জ্বল রঙে অলঙ্কৃত মৃৎপাত্র: এই জাতীয় আব্বাসীয় মৃৎপাত্র মেসোপটেমীয় অঞ্চলের সামাররা ও টেসিফোনে, ইরানের সুসা ও রাইয়ে এবং ফুসতাতে পরিলক্ষিত হয়। অতি উজ্জ্বল রঙে অলঙ্কৃত আব্বাসীয় মৃৎপাত্র মুসলিম মৃৎপাত্র শিল্পের অতি উন্নতমানের শিল্প নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায়। মৃৎপাত্রের ক্ষেত্রে ঔজ্জ্বল্য কৌশল অষ্টম অথবা নবম শতাব্দীর মুসলমান মৃৎশিল্পীদের একটি অভিনব আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃত।
যদিও প্রাক-ইসলামী যুগের মিশরে ঔজ্জ্বল্য মৃন্ময়পাত্রের অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই জাতীয় মৃন্ময়পাত্রের তৈরির প্রক্রিয়া হলো উত্তমরূপে মথিত হলদে কাদার ওপর অস্বচ্ছ টিন ধাতবের মিনা আস্তরণ দিয়ে প্রথমবার আগুনে পোড়ানোর পর অমøজান জড়িত ধাবত দ্বারা অলঙ্করণ ক্ষেত্রে রং চড়াতে হবে। তারপর এই বস্তুকে দ্বিতীয়বার ৫০০ থেকে ৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ধীর ও মৃদুভাবে তাপ দিতে হবে। এর ফলে ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে অমøজান জড়িত ধাতব অত্যন্ত সুক্ষ্ম ধাতব কণায় পরিণত হয়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়াবে।
এই উজ্জ্বলতার রং সোনালী অথবা পিঙ্গল ও লাল বর্ণের যে কোনো শেডে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। নবম শতাব্দীতে এসে মৃৎশিল্পীগণ এরূপ ঔজ্জ্বল্য মৃন্ময়পাত্রের তৈরির ক্ষেত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। আর এরূপ মৃৎপাত্র তৈরি পারস্য ও মধ্যএশীয় দেশসমূহের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ইরানে পরিদৃষ্ট ঔজ্জ্বল্য মৃৎপাত্র দু’টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যেতে পারে-একটি ইরানের বিশেষ স্টাইল হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অপরটি ইরান ও মেসোপটেমিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বৈশিষ্ট্যের মৃৎপাত্র হিসেবে দেখা যায়। ইরানি গ্রুপে ঐসব পাত্র অন্তর্ভুক্ত যেগুলোয় সোনালী লাস্টার বা ঔজ্জ্বল্যে রঞ্জিত অলঙ্করণে কুফিক লিপিমালার সাথে এরাবেক্স নকশা উপস্থাপিত হয়েছে।
ইরানি ঔজ্জ্বল্য মৃৎপাত্রের অপর আর একটি অলঙ্করণ মটিফে এরাবেক্স স্ক্রোলের সাথে প্যামেট ও কুফিক লিপিমালা উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। ঔজ্জ্বল্য মৃন্ময়পাত্রের প্রস্তুত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাই ও সুসা হতে প্রধানত এই জাতীয় পাত্রাদির সন্ধান মিলে।
আব্বাসীয় আমলের মেসোপটেমীয় ঔজ্জ্বল্য মৃৎপাত্র সাধারণত সামাররার উৎখনন হতে পাওয়া গিয়েছে যদিও বাগদাদের নিকটবর্তী টেসিফোনেও সেসবের উৎকৃষ্ট উদাহরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। ৮৩৬ থেকে ৮৮৩ সালের মধ্যে আব্বাসীয় শাসকদের ব্যবহারের জন্য সামাররায় প্রস্তুত ঔজ্জ্বল্য মৃৎপাত্রাদি নান্দনিক সৌন্দর্য ও রঙের চাকচিক্যের জন্য এমন চিত্তাকর্ষক যা পরবর্তীতে তৈরি মৃৎপাত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করা যায় না। (অসমাপ্ত)
চিত্র: ইরানের মেট্টোপলিটান মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা একটি মৃৎপাত্র।
চিত্র: অতি উজ্জ্বল রংয়ের আব্বাসীয় শাসনামলের একটি মৃৎপাত্র।
-মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান”
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (১ম পর্ব)
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (৩)
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (২)
১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (১)
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খেজুরের পাতায় লিখা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ
২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ
২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল সাক্ষী সাতৈর শাহী মসজিদ (১)
০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণে মুসলমানদের অবদান
২৩ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মালয়েশিয়ার ঐতিহাসিক মসজিদ “মসজিদ নেগারা”
১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












