স্থাপত্য-নিদর্শন
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ
, ২৯ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২২ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ০৬ পৌষ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) স্থাপত্য নিদর্শন
মুন্সীগঞ্জ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত ইদ্রাকপুর দুর্গ।
মোঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এটি। যা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস এবং মোঘল আমলের স্থাপত্য কলাকৌশল। দীর্ঘ ৪০০ বছরে ধ্বংস হয়ে গেছে এর অনেক অংশ।
সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মোঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) বাংলার সুবেদার মীর জুমলার সময়ে ১৬৬০ সালে এ দুর্গটি নির্মাণ করা হয়। ঢাকার লালবাগ কেল্লার আদলে দুর্গটি নির্মিত হয়। উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত দুর্গটির দৈর্ঘ্য ৮৬.৮৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫৯.৬০ মিটার।
রক্ষিত দুর্গের প্রধান অংশ বৃত্তাকার উচ্চ বুরুজটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে অতীত ইতিহাসের জানান দিচ্ছে।
জানা গেছে, মোঘলরা বঙ্গদখল নিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা করে। তখন তারা দেখতে পায় বাংলার বারো ভূঁইয়া ও প্রতিকূল নদী বেষ্টিত জনপদ ছাড়াও তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হলো মগরা (আরাকানি)। পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ যারা কিনা বঙ্গোপসাগর দিয়ে মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র নদী হয়ে বঙ্গে লুটতরাজ করে।
নৌপথে আসা শত্রু বা নৌদস্যুদের প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিলো না। মোঘলরা বুঝতে পারে, বঙ্গে সাম্রাজ্য সুদৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নদী বেষ্টিত এ দেশের জনপদকে সুরক্ষা করা। এরই ধারাবাহিকতায় মেঘনা, ইছামতি, শীতলক্ষ্যা নদী তীরে তিনটি দুর্গ নির্মাণ করে। এর একটি ইদ্রাকপুর নৌদুর্গ। অন্য দু’টি হলো নারায়নগঞ্জ জেলার সোনাকান্দায় এবং হাজিগঞ্জে।
ইদ্রাকপুর দুর্গটি শুধুমাত্র নৌদস্যুদের প্রতিহত করার জন্যই নির্মিত হয়নি। মগ, ফিরিঙ্গিদের দমন ছাড়াও ইছামতি, মেঘনা, ধলেশ্বরী নদী দিয়ে যেসব নৌযান মূল্যবান ঢাকাই মসলিনসহ ধাতব ও কৃষি পণ্য বঙ্গোপসাগর ধরে পশ্চিমা দেশসমূহে রপ্তানির জন্য যেতো তাদের রক্ষণাবেক্ষণও দুর্গটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিলো।
এ সময় বঙ্গের সঙ্গে পারস্য আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্জলের দৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো। একইসাথে রাজধানী ঢাকা নগরী ও লালবাগ কেল্লাকে রক্ষা করার জন্য এ দুর্গ নির্মাণ অপরিহার্য ছিলো। পর্তুগিজ ও মগ দস্যুরা শীতলক্ষা নদী দিয়ে ঢাকা আসার পথে বিক্রমপুর ও সোনারগাঁও এলাকায় লুটতরাজ চালাতো।
বাদশাহ আওরঙ্গজেবের সময়কালে (১৬৫৮-১৭০৭) ১৬৬০ সালে শাহ সুজার পতন হলে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলা বাংলায় সুবেদার হয়ে আসেন। এ সময় তিনি অনুভব করেন পূর্ব বঙ্গের বিদ্রোহীদের দমন এবং বাংলার ত্রাসনামে পরিচিত মগ ও ফিরিঙ্গি নৌদস্যুদের প্রতিহতের জন্য ঢাকা-ই উপযুক্ত স্থান। মাত্র তিন বছর (১৬৬০-১৬৬৩) শাসনকালে ইদ্রাকপুর দুর্গটি নির্মাণ করেন।
সামরিক পরিকল্পনায় দুর্গের পাশেই নৌবাহিনীর ২০০ নৌযানের একটি বহর থাকতো। এ গুলোর নাম ছিলো কোষা, জলবা, পারিন্দা, বজরা, তাহেরা, সলব, অলিল, খাটগিরি ও মালগিরি। আর এ কেল্লাটিতে নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন আবুল হোসেন। ঢাকামুখী মগ ও পর্তুগিজ নৌদস্যুদের প্রথমে প্রতিরোধ করতো ইদ্রাকপুর দুর্গের নৌবাহিনী।
চারদিক ঘেরা চতুর্ভুজ আকৃতির ইদ্রাকপুর দুর্গটি ৩টি অংশে বিভক্ত। প্রধান দুর্গ এলাকা, দুই স্তরের প্রাচীর বেষ্টনী এবং পানাধার ও কেন্দ্রীয় বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা বুরুজ। ইদ্রাকপুর দুর্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দুর্গের মাঝখানে বড় গোলাকার বুরুজ অংশ বা কেন্দ্রীয় বুরুজ।
বৃত্তাকার এই বুরুজের উচ্চতা প্রায় ৯.১৪ মিটার এবং ব্যাস ৩২.৯১ মিটার। উপরের দিকে খোলা প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। প্রাচীরের শীর্ষভাগ পদ্ম পাপড়ির মতো। প্রতিটি পাপড়ির মধ্যে একটি প্রধান ছিদ্র রয়েছে। কাছের ও দূরের শত্রু মোকাবেলার জন্য এর ভেতরে আরও ৪টি ছিদ্র রয়েছে। দুর্গের ভেতরে একটি পানাধারও রয়েছে।
পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে দুই স্তরে সিড়ি দুর্গের মাঝে পানাধারে নেমে গেছে। এ পানাধার রাখার উদ্দেশ্যে ছিলো ভেতরের সৈন্যদের পানি সরবরাহ করা, আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করা। দক্ষিণ পাশে কেন্দ্রীয় বুরুজের উপর থেকে একটি গুপ্ত সিড়ি পথ নীচে নেমে গেছে। ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার থেকে এ পথে অস্ত্র আনা হতো। উপর থেকে নীচে নামার সিড়ির সঙ্গে একটি গুপ্ত সিড়ি দেখা যায় যা পরবর্তীতে ঢেকে দেওয়া হয়। ধারণা করা হয়, এ গুপ্ত পথের সঙ্গে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সংযোগ ছিলো।
দুর্গের প্রবেশদ্বার উত্তর দিকে অবস্থিত। এর উচ্চতা ১৩ ফুট এবং প্রস্ত সাড়ে ৭ ফুট। প্রবেশদ্বারের উপরের অংশেও ছিদ্র রয়েছে। প্রবেশদ্বারটি মোঘল স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত।
দুর্গের চারিদিকের দেয়ালের চার কোনায় সাড়ে ৩ ফুট প্রশস্তের ৪টি বুরুজ রয়েছে। বুরুজের পুরু দেয়ালে কামান বসানোর জন্য ছিদ্র রয়েছে। সামরিক কৌশলগত বিবেচনায় শত্রুর গতি ও আক্রমণ থামাতে প্রাথমিক প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে ৩ ফুট উঁচু সীমানা প্রাচীর রয়েছে। এই প্রাচীরের পূর্ব পাশে একটি ছোট বুরুজ রয়েছে।
দুর্গের দেওয়াল নির্মাণে ব্যবহ্নত হয়েছে চুন, সুরকি, ইট, চুনের মিশ্রণ। চতুর্দিকের দেয়ালের উপরে তীর ধনুক ছোড়ার জন্য ছিদ্র রয়েছে। ২০১৫ সালে দুর্গটির সংস্কার করার সময় কেন্দ্রীয় উঁচু বুরুজের মেঝের মাটির নীচে শত শত বিশেষ ধরনের কলস পাওয়া যায়।
ধারণা করা হয়, আদ্রতা প্রতিরোধক হিসেবে নির্মাণের সময় এসব কলস ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুর্গে মীর জুমলার সবচেয়ে সৃজনশীল দিকটি হলো পানিকে প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা। ইদ্রাকপুর দুর্গের চারপাশে কৃত্রিম পরিখা ছিলো, যেখানে নদীর পানি এনে জমা করা হতো। পানি থাকলে শত্রু দেয়ালের কাছে পৌঁছাতে পারতো না।
একসময় ইদ্রাকপুর দুর্গটি মহকুমা প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসকদের বাসভবন ছিলো। ব্রিটিশ শাসনামলে দুর্গের ভেতরে হাজতখানা নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে সংস্কার করে জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯০৯ সালে দুর্গটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটক ইদ্রাকপুর দুর্গ পরিদর্শনে আসেন।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ভারতের জান্নাতবাদে ঐতিহাসিক জাহানীয়া মসজিদ
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সুবা বাংলার ঐতিহাসিক শেখ বাহার উল্লাহ শাহী জামে মসজিদ
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ঢাকায় ৩০০ বছর আগের মুঘল আমলের ঐতিহাসিক মসজিদ
২৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ফুলের মতোই সুন্দর মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় অবস্থিত পুত্রা মসজিদ
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৫ম পর্ব)
০১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান”
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (১ম পর্ব)
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (৩)
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (২)
১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (১)
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












