ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৬)
, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
৩৮। মুর্শিদ কিবলা উনার জাহিরী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি লক্ষ্য করবে না। বরং উনার বাতিনী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি সর্বদা মুতাওয়াজ্জেহ বা রুজু থাকবে।
(এ কথার অর্থ এটা নয় যে, মুর্শিদ কিবলা জাহিরীভাবে শরীয়তের খিলাফ কাজ করবেন। আর বাতিনীভাবে ওলীআল্লাহ থাকবেন। বরং যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হবেন তিনি জাহিরী ও বাতিনী উভয় অবস্থায়ই শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ হবেন। যে ব্যক্তি জাহিরী ও বাতিনী উভয় দিক থেকে শরীয়তের পাবন্দ নয় সে কখনো ওলীআল্লাহ নয়, বরং তার বিপরীত হবে। মূলতঃ একথার দ্বারা ঐ কথার প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, কাফিররা মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জাহিরী অবস্থা (যমীনে চলাচল) লক্ষ্য করে বলতো, “তিনি কেমন রসূল! খাদ্য খান, বাজারে যান।” অর্থাৎ কাফিররা মহান আল্লাহ পাক উনার মহাসম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জাহিরী অবস্থা লক্ষ্য করেছে কিন্তু বাতিনী বা হাকীকী অবস্থা লক্ষ্য করেনি। তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে এ আলোচনা।)
যেমন, এ প্রসঙ্গে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে-
گر بصورت ادمى انساں بودے
احمد بو جهل هم ايكسا بودے
ايں كه مى بينى غلاف ادمند
نيستند ادمى خلاف ادمند
অর্থ: “আকৃতির দ্বারাই যদি মানুষ মনুষ্যত্ব লাভ করতো তাহলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ও আবূ জেহেলের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকতো না। এটা (বাহ্যিক) যা দেখ তা মনুষ্যত্বের খিলাফ, মনুষ্যত্ব নয় বরং মনুষ্যত্বের খিলাফ।”
হযরত শায়েখ আহমদ ফারূকী সেরহিন্দী, মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা হযরত খিযির আলাইহিস সালাম উনার আবে হায়াতের মত। যে ব্যক্তি এ বারিধারার এক কাতরা পান করেন, তিনি হায়াতে আবাদী (অমর জীবন) লাভ করেন। আর উনাদের জাহিরী হাল (বাহ্যিক অবস্থা) সাম্মে কাতিল বা হত্যাকারী বিষতুল্য।
সুতরাং যে ব্যক্তি উনাদের জাহিরী অবস্থা দেখবে সে মউতে আবাদী অর্থাৎ চির মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এই সমস্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গের বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা দর্শন রহমত এবং জাহির (বাহ্যিক) অবস্থা দর্শন জহমতস্বরূপ। উনাদের বাতিনীর প্রতি খেয়ালকারীগণ আউলিয়ায়ে কিরাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে জাহিরী অবস্থা অবলোকনকারীরা হতভাগা। কারণ আউলিয়ায়ে কিরামগণের জাহিরী ছূরত যবের ন্যায় এবং বাতিনী ছূরত গমের মত। জাহিরী ছূরতে উনারা সাধারণ মানুষ; কিন্তু বাতিনী পর্যায়ে ফেরেশতাগণের পর্যায়ভুক্ত।
জাহিরী ছূরতে উনারা যমীনে পদ সঞ্চালনকারী অপরদিকে বাতিনী ছূরতে আসমানে বিচরণকারী। উনাদের ছোহবত মুবারক লাভ করে যারা ধন্য হন উনারা বদবখতি হতে নেক বখ্তিতে রূপান্তরিত হয়ে থাকেন। কারণ উনাদের মাহবূব (মুর্শিদ কিবলা) সৌভাগ্যের পরশ পাথর দ্বারা বিজড়িত। এ সকল ব্যক্তিই অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার আউলিয়া অর্থাৎ ওলীআল্লাহর দলভুক্ত।
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক বলেন-
أُولٰئِكَ حِزْبُ اللهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থ: “উনারা হচ্ছেন মহান আল্লাহ পাক উনার দলভুক্ত। জেনে রাখো, মহান আল্লাহ পাক উনার দলভুক্তরাই সফলকাম তথা মুক্তিপ্রাপ্ত।”(সূরা মুজাদালাহ্ শরীফ/২২)
সুতরাং ওই ব্যক্তি ভাগ্যবান, যিনি হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমও আহলুল্লাহগণের জাহিরী অবস্থা ও ছিফতের প্রতি লক্ষ্য না করে উনাদের বাতিনী হালের প্রতি মুতাওয়াজ্জেহ হন এবং বাতিনী ছিফতের প্রতি নিজের দিল ও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন। (মাবদা ওয়া মাআদ/৭৭, হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া-২/১১৭)
উল্লেখ্য যে, শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা এবং ছিফতের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নিজের আমল-আখলাক, ছিরত-ছূরত গঠন করা বিশেষত; বাতিনী ছিফতের রঙ্গে রঞ্জিত হওয়ার কোশেশ করা আবশ্যক।
কেননা হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের সিনা মুবারক থেকে ধারাবাহিকভাবে আগত মহান নিয়ামত যারা লাভ করেছেন উনারা সকলেই ছিলেন বাতিনী অবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধকারী। পরবর্তী পর্যায়ে হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের সিনা মুবারকে যা স্থাপিত আছে, সেই পরম প্রত্যাশিত নিয়ামত মুবারক লাভ করতে হলে বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখাই উচিত। অন্যথায় তা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
ছালিক বা “খোদা প্রাপ্তির” পথ গমনকারীগণের সকলের জন্য বিশেষভাবে যারা মধ্যপথে অবস্থানকারী তাদের জন্য এ বিষয়টি অতীব জরুরী যে, স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার বাতিনী কামালত এবং বাতিনী ছিফত বা গুণাবলী তথা কামালত ও বিলায়েতের প্রতি লক্ষ্য রাখা। কেননা এটা ছালিকের পদঙ্খলনের একটি মাকাম বা স্থান। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৫)
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে অনুসরণ করার আদব
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৪)
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮৩)
১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮২)
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র যিকির উনার গুরুত্ব ও ফযীলত (১)
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮১)
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৮০)
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৯)
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৮)
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র ইলমে ফিক্বাহ ও পবিত্র ইলমে তাছাউফ অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭৭)
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












