স্থাপত্য-নিদর্শন
বয়নশিল্প নিদর্শনে মুসলমানগণ (৪)
, ২০ রবিউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৪ খমীছ, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৩ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রি:, ২৯ আশ্বিন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) স্থাপত্য নিদর্শন
ইরানে সাফাবী যুগের বয়নশিল্প:
সাফাবী শাসনের সাথে সাথে ইরানীয় বয়নশিল্পে স্বর্ণযুগের সূত্রপাত ঘটে। সাফাবী সিল্কবস্ত্রকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায় সাদামাটা সিল্কবুনন, বুটিদারসিল্ক ও মখমলসিল্ক। এসব তন্ত্রবস্ত্র রাজ্যের বিশেষ কাজে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়াও গৃহের সাজসজ্জাকরণের জন্য কাজে লাগানো হতো। আবার সাফাবী সুলতানগণের পক্ষ হতে সম্মানসূচক উপহার হিসেবে কোনো বিশেষ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রপ্রধানকে এই জাতীয় রেশমীবস্ত্র ও মখমল প্রদান করা হতো। এই জাতীয় রেশমীবস্ত্রের অলঙ্করণে থাকতো বিভিন্ন পুষ্পগুল্মের মটিফ। প্রাসঙ্গিকভাবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীর কয়েকটি পারসিক রেশমীবস্ত্রের উদাহরণ পেশ করা হলো। বহুমাত্রিক রংয়ের একটি রেশমীবস্ত্রের অলঙ্করণে প্রত্যক্ষ করা যায় সাইপ্রেস (মোচাকার বৃক্ষবিশেষ), চেরিবৃক্ষ ও বিহঙ্গকুল পরিবেষ্টিত পাহাড়ি দৃশ্যে। আর একটি মখমলসিল্ক অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর যা ১৬৮৩ খৃ: ভিয়েনা দ্বিতীয়বার অবরোধকালে কারা মোস্তফা পাশার তাঁবুর অন্তস্থ অলঙ্করণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিলো।
রূপালী ডোরাসহ স্বর্ণ রংয়ের পটভূমিতে শরাব-লাল, হালকা-সবুজ, গাঢ় নীল প্রভৃতি রং ব্যবহার করা হয়েছে এই মখমল সিল্কখ-ে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীর পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার নানারকম বিষয়াবলি। আমেরিকার মেট্টোপলিটান মিউজিয়ামে এমন একটি অনন্য বুটিদার রেশমীবস্ত্র সংরক্ষিত আছে যার প্রস্তুতকাল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্দেশ করা যায়। টাউয়েল জাতীয় এই বুটিদার রেশমীবস্ত্রে এরাবেক্স অলঙ্করণের প্রতিটি বিভাজিত খিলানাকৃতি পরিসরে পরিলক্ষিত হয় কালো শুভ্র রংয়ের প্রস্ফুটিত পুষ্পস্ক্রোল, প্রাকৃতিক তরুলতা ও বৈশ্বিক প্যামেট এবং এটি জলপাই-সবুজ পটভূমির ওপর অঙ্কিত। তৈমুরীয় অলঙ্করণের সাথে এটির ডিজাইন ও রং প্রয়োগের যথেষ্ট মিল আছে।
সব কিসিমের শিল্পকলার উদার পৃষ্ঠপোষক শাহ আব্বাসের কালপর্বে ব্যয়বহুল তন্ত্রবস্ত্র, বুটিদার রেশমী কাপড় ও মখমলসিল্কের প্রস্তুতকরণ অত্যন্ত যতœসহ অব্যাহত ছিলো। কাশান-এর পূর্ব প্রতিষ্ঠিত তাঁত কারখানা ছাড়াও শাহ আব্বাস আরো অনেক তাঁতকল স্থাপন করেছিলেন যেগুলোর মধ্যে ইস্পাহান তাঁত কারখানা অন্যতম। আর এই তাঁতকল হতে অত্যন্ত সৌখিন বস্ত্রাদি ও নিত্যব্যবহার্য কাপড়ও তৈরী করা হতো। শাহ আব্বাসের সময় এবং ষষ্ঠদশ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে যেসব খ্যাতিমান বয়নশিল্পীর নাম জানা যায় তারা হলেন- হুসাইন, গিয়াস, আবদুল্লাহ, ইবনে মুহম্মদ, মুইযউদ্দীন বিন গিয়াস ও সাইফ ইবনে আব্বাস।
এই সময়ের প্রাপ্ত রেশমী ও মখমলের টুকরা খ-বস্ত্রে অত্যন্ত মার্জিত রং ও বাস্তববাদী প্রতিকৃতি উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। আর তা শাহ তাহযাপ-এর আমলের বস্ত্রাদি হতে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। শাহ আব্বাসের সময়পর্বের মখমল ও স্বর্ণ কিংবা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। আমেরিকার মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শেষের ও সপ্তদশ শতাব্দীর অত্যন্ত উঁচুমানের সাফাবী বয়নশিল্পের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। শাহ আব্বাসের আমলের পারসিক তন্ত্রবস্ত্রের এক উন্নত মুখপাত্রের নিদর্শন হলো এক বিরাট বুটিদার রেশমীভেলভেট কার্পেট যা মেট্টোপলিটান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
এটির ডিজাইন অন্তর্ভুক্ত করে অষ্টবিন্দুযুক্ত দু’টি বিশাল অলঙ্কৃত পরিসর ও ক্ষুদ্রাংশগুলোও অনুরূপ বিন্দুতে পূরণকৃত। আর অত্যন্ত জাঁকালো স্বর্ণ পটভূমির ওপর লাল-সবুজ রং এ মধ্যস্থিত ক্ষেত্র ও পরিসরদ্বয় তরুপুষ্প ও কা- মটিফে নন্দনগ্রাহ্য করে অলঙ্কৃত এবং সেটির প্রান্ত রূপালী পটভূমির বিপরীতে রঙিন খড়িচিত্রের আলোছায়ায় উপস্থাপিত। এই অতি মনোরম ভেলভেট কার্পেটটি ইস্পাহানে তৈরি এবং সেটির প্রস্তুতকাল ১৬০০ খৃ: হতে পারে ধারণা করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর আর একটি অভিনব ভেলভেটের চিত্রে পাথর থেকে উদ্ভিদ উদ্গমের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায় এবং সেটির স্বর্ণ পটভূমিতে অত্যন্ত হালকা রঙে মেঘমালা লক্ষ করা যায়। এটিও আমেরিকার মেট্টোপলিটান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে তন্ত্রবস্ত্রে নতুন স্টাইলে প্রাকৃতিক পুষ্পগুলা মটিফের উপস্থাপন জনপ্রিয়তা লাভ করে। মনোরম বুটিদার সৌকার্যে একটি কোটের বিদ্যমান খ-াংশ রং ও ডিজাইনের দিক থেকে এই নব স্টাইলের মুখপাত্র বলে মনে হয়। এটির অলঙ্করণ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং তা স্বর্ণ পটভূমির সাথে সুন্দরভাবে সমন্বয় করে চোখ জুড়ানো লাল ও স্নিগ্ধ পুষ্প রংয়ে বস্ত্রের বুননকে মোহনীয় করে তুলেছে।
শাহ আব্বাস ও পরবর্তী যুগের পারসিক পোশাকের প্রয়োজনীয় অংশ ছিল সাশ (ংধংয) বা উত্তরীয় যার ব্যবহার পারস্য থেকে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। পূর্ণ ও খ- সাশের নমুনা মেট্টোপলিটানে মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। চলবে....
-মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান”
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (১ম পর্ব)
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (৩)
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (২)
১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (১)
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খেজুরের পাতায় লিখা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ
২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ
২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল সাক্ষী সাতৈর শাহী মসজিদ (১)
০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণে মুসলমানদের অবদান
২৩ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মালয়েশিয়ার ঐতিহাসিক মসজিদ “মসজিদ নেগারা”
১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












