ব্যথা না পাওয়ার বিরল রোগ ‘সিপা’
, ২৬ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১১ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১০ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) চিকিৎসা
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানালেন, শিশুটির গোড়ালির হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি লিগামেন্টও। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা হাড়ের ওপর চাপ পড়তে থাকায় সেখানে রক্ত সঞ্চালনও ব্যাহত হয়েছে। ফলে হাড়ের একটি অংশ স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করেছে।
ব্যাথা অনুভূতি না থাকায় এত বড় ক্ষত নিয়েও ইফফাতের আচরণে নেই কোনো অস্বস্তি বা যন্ত্রণার ছাপ। সে স্বাভাবিকভাবেই হেসে-খেলে বেড়ায়। কেন ব্যথা পেয়েও কাঁদে না ইফফাত- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয় শিশুটির পরিবার।
পরে তারা জানতে পারে তাদের মেয়ে জন্মগতভাবে এক বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার নাম কনজেনিটাল ইনসেনসিটিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহাইড্রোসিস । এই রোগে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা ‘ব্যথা’ অনুপস্থিত থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘সিপা’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি রোগ।
এই রোগে আক্রান্তদের শরীরে কোনো ব্যথার অনুভূতি হয় না বা খুব কম অনুভব করেন। আর সে কারণেই একটি সাধারণ আঘাতও অজান্তেই ভয়াবহ ও স্থায়ী জটিলতায় রূপ নিতে পারে। তবে ব্যথা অনুভব করতে না পারাই এই রোগের একমাত্র লক্ষণ নয়। এই রোগে আক্রান্তদের শরীরের ঘামও হয় না।
এই রোগ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সামছুন নাহার সুমি।
ডা. সামছুন নাহার সুমি জানান, ২০২৪ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি জেনেটিকস সেন্টারের মাধ্যমে তিনি তখন ইফফাতের রক্তের নমুনা ভারতের বেঙ্গালুরুরের মেডজিনোম ল্যাবে পাঠান। হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিংয়ের (জিনের প্রোটিন তৈরির অংশের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ) পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির ঘঞজক১ জিনে একটি পরিবর্তনের সন্ধান মেলে। এই জিনের ত্রুটি সিপা রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি জানান, চিকিৎসক জীবনে সিপার লক্ষণযুক্ত দুই শিশুর দেখা পেয়েছেন তিনি। তাদের মধ্যে একজন ইফফাত। অন্য শিশুর ক্ষেত্রেও লক্ষণগুলো সিপার সঙ্গে মিল থাকলেও পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সিপা শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় জিনগত পরীক্ষা সহজলভ্য নয়। তাই রোগীদের ডাব্লিউইএস পরীক্ষা বিদেশ থেকে করিয়ে আনা হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল।
ইফফাতের ঘটনা বাংলাদেশে সিপা রোগের প্রথম নজির নয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশি দুই চিকিৎসকের জার্নাল অফ কারেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভান্স মেডিকেল রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি কেস রিপোর্টে দেশের প্রথম প্রকাশিত সিপা রোগীর তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই রোগীর সঙ্গেও ইফফাতের উপসর্গের বেশ কিছু মিল রয়েছে। পুরোনো ওই রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ ও নার্ভ কনডাকশন স্টাডির ভিত্তিতে রোগটি শনাক্ত করা হয়েছিলো।
কেস রিপোর্টে চার বছর বয়সী এক ছেলে শিশুর কথা বলা হয়। জন্ম থেকেই সে ব্যথা অনুভব করতো না। নিজের ঠোঁট ও জিহ্বা কামড়ে ক্ষত তৈরি করতো, ধীরে ধীরে হাত-পায়ের কয়েকটি আঙুলও ক্ষয়ে যায়। গরমের মধ্যেও তার ঘাম হতো না এবং বারবার অকারণে জ্বর আসতো। পরীক্ষায় দেখা যায়, স্পর্শ অনুভব করতে পারলেও ব্যথা ও তাপমাত্রা অনুভবের ক্ষমতা ছিলো না। এক্সরে-তে হাড়ের গুরুতর ক্ষতিও ধরা পড়ে।
সেই গবেষণায় বলা হয়েছে, হেরেডিটারি সেন্সরি অ্যান্ড অটোনমিক নিউরোপ্যাথি এর পাঁচ ধরনের মধ্যে টাইপ-ওঠ-ই সিপা নামে পরিচিত। এটি একটি অটোসোমাল রিসেসিভ জিনগত রোগ। অর্থাৎ বাবা ও মা-উভয়ের কাছ থেকেই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে এলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ঘঞজক১ (এনটিআরকে ওয়ান) জিনে মিউটেশনের কারণে এই রোগটি হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, হেরেডিটারি সেন্সরি অ্যান্ড অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলো এক ধরনের বিরল বংশগত স্নায়ুরোগের গ্রুপ, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যথা অনুভব করতে পারে না এবং শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না।
এর ফলে ঘাম হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম-১-এর ১য়২১-২২ অঞ্চলে অবস্থিত ঘঞজক১ জিনে ৩৭টিরও বেশি ধরনের মিউটেশন শনাক্ত করা হয়েছে।
এই জিনটি নার্ভ গ্রোথ ফ্যাক্টর (এনজিএফ)-এর হাই অ্যাফিনিটি রিসেপ্টর রিসেপ্টর তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এনজিএফ ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুর স্বাভাবিক বিকাশ ও কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঘঞজক১ জিনে ত্রুটি হলে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুগুলো ঠিকভাবে বিকশিত হয় না। এর ফলেই আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যথা অনুভব করেন না এবং ঘামসহ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয়।
রোগটি শনাক্তের বিষয়ে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রবীণ লেখক আবদুল্লাহ ইউসুফ বলেন, এ ধরনের রোগ এতটাই বিরল যে শুরুতে অন্য রোগের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। রোগটি প্রথমে ডায়াবেটিস বা কুষ্ঠরোগ বলে সন্দেহ করা হয়েছিলো। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেসব সম্ভাবনা বাদ পড়ে। পরে শিশুটির উপসর্গ ও নার্ভ কনডাকশন স্টাডির ভিত্তিতে সিপা নিশ্চিত করা হয়।
চিকিৎসা নেই, আঘাত ঠেকানোই ভরসা:
চিকিৎসকদের মতে, এখন পর্যন্ত সিপার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই মূল লক্ষ্য হলো, রোগীকে আঘাত থেকে রক্ষা করা, অতিরিক্ত জ্বর নিয়ন্ত্রণ, হাড় ও জয়েন্টের জটিলতা প্রতিরোধ এবং পরিবারের সদস্যদের রোগ সম্পর্কে সচেতন করা। অর্থোপেডিক, শিশু, দন্ত ও চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকের সমন্বিত তত্ত্বাবধান এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং এ রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী সন্তানের ঝুঁকি কত?
ঢাকার জেনেটিক কাউন্সেলিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (জিসিআরসি) চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমান বলেন, সিপা একটি অটোসোমাল রিসেসিভ বংশগত রোগ। অর্থাৎ বাবা ও মা-উভয়েই যদি ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হন, তাহলে প্রতিটি সন্তানধারণে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ এবং জিনের বাহক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। আর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ থাকে।
সিপা রোগীর কেন প্রয়োজন জেনেটিক কাউন্সেলিং?
অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমানের মতে, বাবা-মা দুইজনেই বাহক কিনা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। গর্ভকালীন জিনগত রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় শিশুটি সিপা নিয়ে জন্মাবে কি না তা জানা সম্ভব। একই সঙ্গে আইভিএফ -এর সঙ্গে পিজিটি (ভ্রুণ প্রতিস্থাপনের আগে জিনগত পরীক্ষা) ব্যবহার করে সুস্থ ভ্রুণ নির্বাচন করাও সম্ভব। এছাড়া কীভাবে এই বিশেষ শিশুর যত্ন নিতে হবে (পড়াশোনা, আঘাত থেকে রক্ষা করা, ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা) সে বিষয়ে মানসিক ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
সচেতনতার অভাবে অনেক চিকিৎসকই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করতে পারেন না। যদিও দেশে এখন আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি (এনজিএস) বা জিনোম বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবু এসব পরীক্ষা এখনো সীমিত এবং ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, অনেক পরিবার রোগটির নিরাময় নেই জেনে জেনেটিক পরীক্ষা বা কাউন্সেলিং করাতে আগ্রহী হন না। ফলে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা ও বিস্তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখেও রোগ চিনতে অনেক সময় লেগে যায়।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
একটি নয়, মানুষের মস্তিষ্ক আসলে দুটি আলাদা অঙ্গ!
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আলঝেইমার রোগ
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
হার্ট অ্যাটাক-স্ট্রোকের লক্ষণ ফুটতে পারে চোখ-মুখেই : গবেষণা
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রমাণিত- ডায়াবেটিস চিকিৎসায় কালোজিরা কার্যকর
২৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ডেঙ্গু নাকি সাধারণ জ্বর বুঝবেন কীভাবে?
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
চুম্বকের সাহায্যে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম রক্তনালি
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আঁকাবাঁকা দাঁতের চিকিৎসা কী?
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
লিভারের নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস ডি, অবহেলা করবেন না
২০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইস্তেঞ্জায় ফেনা : অবহেলা করবেন না
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
নবজাতকের ওজন, স্বাভাবিক বৃদ্ধি-হ্রাস এবং গড় ওজন)
২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
শীতে ত্বক ও চুলের যতেœ খাবার
২৬ নভেম্বর, ২০২৪ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
শিশু পালন-পরিচর্যা : জন্মের প্রথম মাস
১০ নভেম্বর, ২০২৪ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












