সুওয়াল-জাওয়াব:
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায়ের শরয়ী তারতীব
, ১লা রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২১ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০৬ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) শিক্ষামূলক জিজ্ঞাসা
সুওয়াল:
পবিত্র রমাদ্বান শরীফ আসলে অধিকাংশ মসজিদগুলোতে খতম তারাবীহ হোক অথবা সূরা তারাবীহ হোক ইমাম ছাহেব এতো দ্রুতগতিতে তিলাওয়াত করেন যা পিছনে ইক্তিদাকারীগণ কিছুই বুঝেন না। আবার রুকু, সিজদাও এতো দ্রুতগতিতে করেন যাতে মুছল্লীগণ কেউ রুকুতে, কেউ সিজদায়, কেউ কওমায় থাকেন।
সুওয়াল হলো- ওয়াক্তিয়া নামাযের যে নিয়ম অর্থাৎ যেভাবে নিয়ত করতে হয়, তাকবীরে তাহরীমা বাঁধতে হয়, ধীর গতিতে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে হয়, ক্বওমা-জলসা ঠিক মতো আদায় করতে হবে, তাশাহহুদ শরীফ, দুরূদ শরীফ ও দোয়ায়ে মা’ছূরা শরীফ পাঠ করতে হয়, তারপর সালাম ফিরানোর মাধ্যমে নামায শেষ করতে হয়- তারাবীহ নামাযেরও সেই একই নিয়ম, না ভিন্ন? যদি একই নিয়ম হয়ে থাকে তাহলে এতো দ্রুতগতিতে নামায পড়লে বা পড়ালে তা শুদ্ধ হবে কিনা?
জাওয়াব: (২য় অংশ)
একইভাবে রুকু ও সিজদা সঠিকভাবে আদায় করার ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে-
عن حضرت ابى مسعود الانصارى رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تجزئى صلوة الرجل حتى يقيم ظهره فى الركوع والسجود.
অর্থ: “হযরত আবু মাসউদ আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, কারো নামায যথাযথভাবে আদায় হয় না, যে পর্যন্ত না সে রুকু এবং সিজদাতে পিঠ স্থায়ীভাবে সোজা করে। (আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসায়ী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, দারিমী শরীফ)
এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার আলোকে হানাফী মাযহাবে নামাযের মধ্যে তা’দীলে আরকান অর্থাৎ নামাযের রুকু-সিজদা ধীর-স্থিরভাবে আদায় করাকে ওয়াজিব বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت شقيق رحمة الله عليه قال ان حذيفة رضى الله تعالى عنه راى رجلا لايتم ركوعه ولا سجوده فلما قضى صلوته دعاه فقال له حذيفة رضى الله تعالى عنه ما صليت قال واحسبه قال ولو مت مت على غير الفطرة التى فطر الله محمدا صلى الله عليه وسلم.
অর্থ: “হযরত শাক্বীক্ব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হযরত হুযায়ফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, তিনি উনার রুকু ও সিজদা পূর্ণ করছেন না। যখন সে ব্যক্তি নামায শেষ করলেন তিনি উনাকে ডেকে বললেন, যদি আপনি এ অবস্থায় ইন্তিকাল করেন তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যে ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন তার বাইরে ইন্তিকাল করবেন।” (বুখারী শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে, হযরত আবু কাতাদাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, চুরির দিক থেকে মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মন্দ ঐ ব্যক্তি যে তার নামাযে চুরি করে। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নামাযে সে কিভাবে চুরি করবে? তিনি বললেন, সে নামাযের রুকু এবং নামাযের সিজদা পূর্ণ করবে না।” (মুসনাদে আহমদ, মিশকাত)
অর্থাৎ কিরায়াতের মতো রুকু ও সিজদা সঠিকভাবে আদায় করে নামায পড়াতে হবে এবং পড়তে হবে।
মোটকথা, নামাযের প্রত্যেকটি ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব যথাযথভাবে পালন করে নামায আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে ফরয নামায আদায়ের ক্ষেত্রে যে হুকুম, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল নামায আদায়ের ক্ষেত্রেও সে একই হুকুম।
উল্লেখ্য, তারাবীহ নামায হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। আর এ নামাযের জামায়াত হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া। এছাড়া তারাবীহ নামায হচ্ছে ফরয ছলাতুল ইশা উনার তাবি’ অর্থাৎ অধীন, অনুসারী ও পরবর্তী নামায।
কাজেই, ছলাতুল ইশা যেভাবে আদায় করতে হবে তারাবীহ নামাযও সেভাবে বা সে নিয়মেই আদায় করতে হবে। কেননা, নামাযের ফরয (আরকান-আহকাম), ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহ সকল নামাযের ক্ষেত্রেই একই হুকুম।
অতএব, ইমাম ছাহেব ওয়াক্তিয়া নামায যেভাবে বা যে নিয়মে পড়ান তারাবীহ নামাযও সেভাবেই পড়ানো ইমাম ছাহেব উনার উপর অপরিহার্য কর্তব্য।
এখন ইমাম ছাহেব যদি উনার দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেন, তাহলে ইমাম-মুক্তাদী সকলের নামাযই বাতিল হয়ে যাবে। এজন্য এরূপ ইমাম নিযুক্ত করা এবং তার পিছনে নামায আদায় করাই জায়িয নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনেকে মনে করে ‘তারাবীহ’ অর্থ তাড়াতাড়ি; এটা ভুল ধারণা। সঠিক হচ্ছে تراويح ‘তারাবীহ’ শব্দটি ترويحة ‘তারবীহাতুন’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ বিশ্রাম নেয়া, আরাম করা। অর্থাৎ চার রাকায়াতের পর বসে দোয়া-দুরূদ, তাসবীহ পাঠের মাধ্যমে বিরতি বা বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে তারাবীহ নামায আদায় করা হয় বলেই এ নামাযকে তারাবীহ নামে নামকরণ করা হয়েছে।
কাজেই, তারাবীহ নামায অন্যান্য ফরয-ওয়াজিব নামাযের মতোই ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে। এটাই হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের হুকুম।
{দলীলসমূহ: তাফসীরে মাযহারী, বুখারী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসায়ী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, দারিমী শরীফ, মুসনাদে আহমদ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ, ফিক্বহুস সুনান ওয়াল আছার, আলমগীরী, শামী, বাহরুর রায়িক ইত্যাদি।} (অসমাপ্ত)
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রসঙ্গ মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারা খোলা রাখা
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (২)
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (১)
০৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
০৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র রোযা সম্পর্কিত জরুরী সুওয়াল-জাওয়াব
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায়ের শরয়ী তারতীব
১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: ছোয়াচে রোগ
০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: ছোয়াচে রোগ
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: পবিত্র মি’রাজ শরীফের তারিখ নিয়ে মতভেদ (৩)
২০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: পবিত্র মি’রাজ শরীফের তারিখ নিয়ে মতভেদ (২)
১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: পবিত্র মি’রাজ শরীফের তারিখ নিয়ে মতভেদ (১)
০৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












