সুওয়াল-জাওয়াব:
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (১)
, ১৬ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৬ আশির, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রি:, ২১ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) শিক্ষামূলক জিজ্ঞাসা
সুওয়াল:
গান-বাজনা করা কি? কেউ কেউ বলে থাকে, “ইসলামী গান”যেমন- নবীতত্ত্ব, মুর্শীদি, জারী ইত্যাদি জায়িয। কারণ হিসেবে তারা বলে, হযরত সুলত্বানুল হিন্দ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নাকি গান-বাজনা করেছেন। তারা আরো বলে থাকে যে, বুখারী শরীফ- এর ২য় খ-ের ২২৫ পৃষ্ঠায় এবং ৫ম খ-ের ৫৫৫ পৃষ্ঠায় নাকি “গান-বাজনা”জায়িয বলে লেখা আছে।
এখন আমার সুওয়াল হচ্ছে- “গান-বাজনা”সম্পর্কে সম্মানিত শরীয়ত উনার ফায়সালা কি? সত্যিই কি হযরত সুলত্বানুল হিন্দ খাজা ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “গান-বাজনা”করেছেন? আর বুখারী শরীফ কিতাবের মধ্যে “গান-বাজনা”জায়িয লেখা আছে কি? পবিত্র কুরআন শরীফ এবং সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াব (১ম অংশ):
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে গান-বাজনা করা হারাম ও কবীরা গুণাহের অন্তর্ভুক্ত। তা যে কোন গানই হোক না কেন। যেমন নবী তত্ত্ব, মুর্শীদি, জারী, কাওয়ালী, পল্লীগীতি, ভাওয়ালী, ভক্তিমূলক ইত্যাদি সর্বপ্রকার গানই হারাম ও নাজায়িয। তবে বাজনা বা বাদ্য-যন্ত্র ব্যতীত হাম্দ্, না’ত, কাছীদা, গজল ইত্যাদি পাঠ করা ও শোনা জায়িয রয়েছে। কিতাবে উল্লেখ আছে, ইলিম দু’ প্রকার। (১) ইলমে আরূজী অর্থাৎ ছন্দ প্রকরণ যেমন- “বালাগাল উলা বিকামালিহী ......... পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মধ্যে পাঠকৃত কাছীদাসমূহ, যা গানের সূরে পাঠ করা হয় না। (২) “ইলমে মুসীক্বী অর্থাৎ রাগ-রাগিণী বা গানের সূর।
স্মরণীয় যে, বাদ্য বা বাজনা সম্মানিত শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয। সাথে সাথে বাদ্যবিহীন ইলমে মুসীক্বীও নাজায়িয।
মূলতঃ গান-বাজনা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের অকাট্য বা ক্বেত্যয়ী দলীলের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে হারাম সাব্যস্ত হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালাম পাক উনার মধ্যে অসংখ্য স্থানে গান-বাজনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। যেমন পবিত্র সূরা লুক্বমান শরীফ উনার ৬নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّشْتَرِيْ لَـهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَـتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولٰٓئِكَ لَـهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ
অর্থ:“মানুষের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা ‘লাহ্ওয়াল হাদীছ’ খরীদ করে থাকে যেনো বিনা ইলিমে মানুষদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার পথ থেকে বিভ্রান্ত করে এবং হাসি-ঠাট্টারূপে ব্যবহার করে। তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি রয়েছে।”
অনুসরণীয় হযরত মুফাস্সিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত لَـهْوَ الْـحَدِيْثِ ‘লাহ্ওয়াল হাদীছ’ দ্বারা গান-বাজনাকে সাব্যস্ত করেছেন।
যেমন বিখ্যাত মুফাস্সির আল্লামা ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার “তাফসীরে ইবনে কাছীরের”৮ম খ-, ৩, ৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-
قَالَ اِبْنُ مَسْعُوْدٍ فِىْ قَـوَلِهٖ تَـعَالٰى وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّشْتَرِىْ لَـهْوَ الْـحَدِيْثِ ....... قَالَ هُوَ وَاللهِ اَلْغِنَاءُ ....... وَكَذَا قَالَ اِبْنُ عَبَّاسٍ وَجَابِرٌ وَعِكْرَمَةُ وَسَعِيْدُ بْنُ جُبَـيْرٍ وَمُـجَاهِدٌ وَ مَكْحُوْلٌ وَعُمَرُ بْنُ شُعَيْبٍ وَعَلِىُّ بْنُ بُذَيْمَةَ وَقَالَ حَسَنُ الْبَصْرِىُّ نَـزَلَتْ هٰذِهِ الْاٰيةُ فِى الْغِنَاءِ وَالْمَزَامِيْرِ
অর্থ: বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি لَـهْوَ الْـحَدِيْثِ ‘লাহ্ওয়াল হাদীছ’ উনার ব্যাখ্যায় বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! لَـهْوَ الْـحَدِيْثِ হচ্ছে গান-বাজনা বা সঙ্গিত। ...... হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইকরামাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত সাঈদ বিন জুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাকহুল রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত আমর ইবনে শুয়াইব রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত আলী ইবনে বুযাইমা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা সকলেই উক্ত ব্যাখ্যাই করেছেন। আর বিশিষ্ট তাবিয়ী হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে।
এছাড়াও তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে দুররে মানছূর, তাফসীরে রূহুল মায়ানী, তাফসীরে মাদারিক, তাফসীরে কাশ্শাফ, তাফসীরে মায়ালিম, তাফসীরে ছায়লাবী এবং হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার “আদাবুল মুফরাদ”কিতাবে لَـهْوَ الْـحَدِيْثِ ‘লাহ্ওয়াল হাদীছ’ অর্থ গান-বাজনা, বাদ্য-যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। অনুরূপ পবিত্র সূরা নজম শরীফ ও পবিত্র সূরা বানী ইসরায়ীল শরীফ উনাদের মধ্যেও গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র আয়াত শরীফ ইরশাদ মুবারক হয়েছে।
অতএব, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফ যা ক্বেত্যয়ী দলীল উনার দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, গান-বাজনা, বাদ্য-যন্ত্র ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপেই হারাম ও আযাবের কারণ।
(মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ থেকে সংকলিত)
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রসঙ্গ: মশহুর দুইখানা হাদীছ শরীফ নিয়ে আপত্তির খন্ডন
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: ইছলাহ অর্জন করতে হলে ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ পূর্বশর্ত
১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: বাইয়াতের প্রকারভেদ ও বাইয়াত হওয়ার পন্থা-পদ্ধতি
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সুওয়াল-জাওয়াব : প্রসঙ্গ মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারা খোলা রাখা (৩)
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (৩)
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: বাইয়াতের প্রকারভেদ ও বাইয়াত হওয়ার পন্থা-পদ্ধতি
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারা খোলা রাখা
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (২)
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
০৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র রোযা সম্পর্কিত জরুরী সুওয়াল-জাওয়াব
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায়ের শরয়ী তারতীব
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












