সুওয়াল-জাওয়াব : প্রসঙ্গ মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারা খোলা রাখা (৩)
, ১৭ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৬ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) শিক্ষামূলক জিজ্ঞাসা
সুওয়াল:
জাকির নায়েক নামক এক বক্তা তার এক আলোচনায় বলেছে যে, মহিলাদের মুখমন্ডল দেখার অনুমতি আছে অর্থাৎ তার মতে মহিলাদের চেহারা ঢেকে রাখা জরুরী নয়।
তার উক্ত বক্তব্য কি আদৌ শরীয়তসম্মত? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াব (৩য় অংশ):
জাকির নায়েক উরফে কাফির নায়িক ব্যক্তিটির উক্ত বক্তব্য আদৌ শরীয়তসম্মত তো নয়ই বরং তা সম্পূর্ণরূপে কুফরীসম্মত। নাঊযুবিল্লাহ!
কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اَلْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتْ اِسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, নারী হলো গোপনীয় সত্ত্বা অর্থাৎ সে পর্দায় থাকবে। সে যখন ঘর থেকে বের হয় তখন শয়তান তার দিকে উঁকি-ঝুকি দেয় অর্থাৎ বেগানা পুরুষের সামনে তাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে। (তিরমিযী শরীফ)
হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ قَيْسِ بْنِ شَمَّاسٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَالُ لَهَا أُمُّ خَلاَّدٍ وَهِىَ مُنْتَقِبَةٌ تَسْأَلُ عَنِ ابْنِهَا وَهُوَ مَقْتُولٌ فَقَالَ لَهَا بَعْضُ أَصْحَابِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِئْتِ تَسْأَلِينَ عَنْ اِبْنِكِ وَأَنْتِ مُنْتَقِبَةٌ فَقَالَتْ إِنْ أُرْزَإِ ابْنِى فَلَنْ أُرْزَأَ حَيَائِى.
عن حضرت قيس بن شماس عن ابيه عن جده قال جاءت امراة الى النبى صلى الله عليه وسلم يقال لـها ام خلاد وهى منتقبة تسأل عن ابنها وهو مقتول فقال لـها بعض اصحاب النبى صلى الله عليه وسلم جئت تسألين عن ابنك وانت منتقبة فقالت ان ارزأ ابنى فلن ارزأ حيائى
অর্থ: হযরত ক্বায়েস ইবনে শামমাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার পিতা থেকে এবং তিনি উনার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, এক মহিলা ছাহাবী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফ-এ আসলেন। উনাকে উম্মে খল্লাদ বলে ডাকা হতো। উনার মুখমন্ডল বা চেহারা ছিল নেকাবে ঢাকা। তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় উনার শহীদ পুত্র সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট জানতে এসেছিলেন। তখন উনাকে একজন ছাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আপনার পুত্র সম্পর্কে জানতে এসেছেন, আর মুখে নেকাব। তখন হযরত উম্মে খল্লাদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি বললেন, আমি আমার ছেলেকে হারিয়ে এক বিপদে পড়েছি, এখন লজ্জা হারিয়ে অর্থাৎ মুখমন্ডল বা চেহারাসহ সমস্ত শরীর পর্দা না করে কি আরেক বিপদে পড়ব? (আবূ দাউদ শরীফ)
এ হাদীছ শরীফ থেকে প্রতীয়মান হলো যে, মহিলাদের পর্দা করা অর্থাৎ মোটা ও ঢিলা-ঢালা কাপড় দ্বারা চেহারাসহ সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা জরুরী।
হাদীছ শরীফ এ আরো ইরশাদ হয়েছে-
عن ام الـمؤمنين حضرت عائشة الصديقة عليها السلام قالت كان الركبان يـمرون بنا ونحن محرمات مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فاذا حاذوا بنا سدلت احدانا جلبابـها من راسها على وجهها فاذا جاوزونا كشفناه
অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, হজ্জের সফরে আমরা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে কোন কাফেলার মুখোমুখি হলে আমরা আমাদের চেহারার উপর নেকাব ফেলে দিতাম। অতঃপর কাফেলার লোকজন অতিক্রম করে গেলে আবার নেকাব তুলে দিতাম। (আবূ দাউদ শরীফ)
উল্লেখ্য, পর্দার লক্ষ কোটি উদ্দেশ্যের মধ্যে একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীর উন্মুক্ত বদনের সৌন্দর্যে আসক্ত হয়ে কোন পুরুষ যেনো তার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে। অতঃপর তার সাথে স্বীয় কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার অপচেষ্টা যেনো না করে। আর এভাবে যেনো সমাজ কলুষিত না হয়।
একথা সর্বজন বিদিত যে, চেহারাই হচ্ছে নারীর সৌন্দর্যের মূল। চেহারা দেখেই তার প্রতি পুরুষ আকৃষ্ট হয়। এখন সমস্ত শরীর ঢেকে সেই চেহারাই যদি খোলা রাখা হয় তাহলে শরীর আবৃত করার জন্য তো তার পরিধেয় জামা কাপড়ই যথেষ্ট ছিল। আলাদা করে পর্দার বিধান নাযিলের তাহলে কি প্রয়োজন ছিল? পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পর কোন মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্না উনাদের কি একটা ঘটনাও খুঁজে পাওয়া যাবে যে, উনাদের চেহারা মুবারক খোলা ছিল? মোটেও না।
বস্তুত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সামনে নাযিল হয়েছে। উনারা যে ব্যাখ্যা বুঝেছেন এবং আমল করেছেন আমাদেরকে সেটারই অনুসরণ করতে হবে।
আর তাই কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের আমলের অনুসরণ করে পরবর্তীতে অনুসরণীয় হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ফতওয়া দিয়েছেন যে, মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারাসহ সম্পূর্ণ শরীর ঢেখে রাখতে হবে। এটাই হচ্ছে শরয়ী পর্দা।
যেমন এ প্রসঙ্গে হযরত শামসুল আইম্মাহ সারাখসী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন, নারীর মুখমন্ডল বা চেহারা দেখলে বদ-খেয়াল ও কামভাব সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য নারীর কোন অঙ্গের দিকেই দৃষ্টিপাত করা জায়িয নয়। (আল মাবসূত)
হযরত আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন, নারীদের মুখমন্ডল বা চেহারা বেগানা পুরুষের সামনে খোলা নিষিদ্ধ, হারাম। (ফতওয়ায়ে শামী)
চার মাযহাবের সকল ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ঐক্যমতে মহিলাদের জন্য পর্দার কাপড়, বোরকা, বড় চাদর ইত্যাদি দ্বারা মুখমন্ডল বা চেহারাসহ সমস্ত দেহ আবৃত করে রাখা অপরিহার্য। (মা’আরিফুল কুরআন)
মহিলাদের জন্য গইরে মাহরাম পুরুষদের সামনে বা রাস্তা-ঘাটে চলার সময় চেহারা খোলা রাখা নাজায়িয। মহিলাদের বাইরে বের হওয়ার সময় হাত মোজা ও পা মোজা পরিধান করে বের হওয়া জরুরী অর্থাৎ ফরয। (হিদায়া)
উপরে উল্লেখিত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের আলোচনা থেকে প্রতিভাত হলো যে, মহিলাদের পর্দা হচ্ছে তাদের মুখমন্ডল বা চেহারা বা চেহারাসহ সম্পূর্ণ শরীর আবৃত করে রাখা। সুতরাং এর বিপরীত বক্তব্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে শরীয়তের বিরোধিতা করা অর্থাৎ কুফরী করে ঈমান ও ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া। আর এ কাজটিই নির্দ্বিধায় করেছে উরফে কাফির নায়িক ব্যক্তিটি। কাজেই উক্ত ব্যক্তিটির যাবতীয় কুফরী বক্তব্য পরিহার করে চলা সকল মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয তথা ঈমানী দায়িত্ব।
(মাসিক আল বাইয়্যিনাত ২১৬তম সংখ্যা থেকে সংকলিত)
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (৩)
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: বাইয়াতের প্রকারভেদ ও বাইয়াত হওয়ার পন্থা-পদ্ধতি
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ মহিলাদের মুখমন্ডল বা চেহারা খোলা রাখা
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (২)
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ গান-বাজনা হারাম (১)
০৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
০৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায় ও সংশ্লিষ্ট মাসয়ালা-মাসায়িল
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র রোযা সম্পর্কিত জরুরী সুওয়াল-জাওয়াব
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায়ের শরয়ী তারতীব
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ: তারাবীহ নামায আদায়ের শরয়ী তারতীব
১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: ছোয়াচে রোগ
০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রসঙ্গ: ছোয়াচে রোগ
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












