মন্তব্য কলাম
কৃষিতে ডিজেল সংকট হুমকিতে ইরি-বোরো ও পাট উৎপাদন ডিজেল সংকটে সৌরবিদ্যুতের নলকূপই এখন কৃষকের জন্য খোদায়ী রহমত।
, ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) মন্তব্য কলাম
(১)
দৈনিক আল ইহসান শরীফের খবর জানাচ্ছে, কৃষকেরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না, আর পেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম, জামালপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ দেশের ১২টি জেলার ১৫ জন কৃষক প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ার কথা বলেছেন, গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ডিজেল পেতে কৃষকের ভোগান্তির চিত্র জানা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অবশ্য বলে আসছে, জ্বালানি সরবরাহে কৃষিকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে মাঠের বাস্তবতা সেটা বলছে না। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য বোরো। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে।
ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত বোরো মৌসুমে বৃষ্টি না হলে প্রায় পুরোটাই সেচনির্ভর। বেশির ভাগ সেচপাম্প চলে ডিজেলে আর কিছুটা বিদ্যুতে।
বেশির ভাগ জায়গায় এখন বোরোর ধানে শিষ আসছে। এ সময় নিরবিচ্ছিন্ন ডিজেল না পেয়ে সেচসংকটে ধানের শিষ নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বোরো ধান উৎপাদন কম হলে খাদ্যনিরাপত্তা কীভাবে হুমকির মুখে পড়ে, ২০০৭-০৮ এবং ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা তার বড় দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কারণে বোরো উৎপাদন কম হওয়ায় চালের দাম লাফিয়ে বেড়েছিল।
বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে জমিতে নিয়মিত এক দিন পরপর সেচ দিতে হয়। এলাকাভেদে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের চাষাবাদ হলেও, এই সময়কালই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল সংকট থাকলে সেচ অনিয়মিত হয়, যা সরাসরি ধানের ফলন হ্রাস করতে পারে।
বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য। বিশেষ করে ট্রাক্টর, সেচপাম্প এবং ছোট-বড় কৃষি যন্ত্রপাতি চালানোর ক্ষেত্রে ডিজেলের বিকল্প নেই। বর্তমানে ডিজেলের বাজার মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকেরা তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। ফলে মাঠে যেমন সঠিক সময়ে বীজ বোনা বা সেচ কার্যক্রম করা যাচ্ছে না, তেমনি ফসলের উৎপাদনও প্রভাবিত হচ্ছে।
ডিজেল সংকটের প্রভাব কেবল যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সার, কৃষি রাসায়নিক ও অন্যান্য ইনপুট সামগ্রীর উৎপাদন ও সরবরাহেও তীব্র প্রভাব পড়ছে। কারণ সার উৎপাদন ও পরিবহন প্রক্রিয়ায়ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। যেকোনো প্রান্তিক কৃষক বা ক্ষুদ্র চাষি, যারা সার ও অন্যান্য জিনিসের সঠিক সময়ে কিনে মাঠে প্রয়োগ করে থাকেন, তাদের উৎপাদনশীলতা এই সংকটের কারণে হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংকট দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি ডিজেলের অভাব ও সার সরবরাহের অসঙ্গতি অব্যাহত থাকে, তবে কৃষি উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ ঘটতে পারে। ফলে খাদ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, গরিব ভোক্তাদের জন্য প্রাপ্যতা সীমিত হওয়া এবং দেশের মোট খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেল সংকটের প্রভাবে প্রান্তিক কৃষকেরা দুই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রথমত, উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ডিজেল ও সারসহ অন্যান্য জিনিসের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন সময়সূচি বিঘিœত হচ্ছে। সঠিক সময়ে বীজ বোনা ও সেচ কার্যক্রম না হওয়ায় ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, যা সরাসরি কৃষকের আয়ে প্রভাব ফেলছে।
(২)
অতীতেও আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং তেলের সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যাঘাত দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং সরবরাহ চেইনের সংকটও তৈরি করতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের এটা মনে রাখা জরুরি যে জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে খাদ্য উৎপাদনে যদি ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে, সেটা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। দেশে শস্য কাটা ও মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে মোট ফসলের ১৫ শতাংশ যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়। ডিজেল-সংকটের কারণে ধান কাটা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে যে অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা হাতে নেওয়া। এ মুহূর্তে কৃষি, শিল্প ও পণ্য পরিবহন খাতকে অবশ্যই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গোলাপগঞ্জ সদর উপজেলার রোড়াশী ইউনিয়নের ঘোষগাতি গ্রামের কৃষক এনামুল মোল্লা জানান, ‘ডিজেলের অভাবে আমরা খুব সমস্যায় পড়েছি। ধানক্ষেতে পানি দিতে পারছি না, পাটও বুনতে পারছি না। পাম্প কিংবা দোকান কোথাও ডিজেল পাচ্ছি না।’
পাবনা সদর উপজেলার ইসলামগাঁতি গ্রামের কৃষক জাহিদ বলেন, ‘আমার তিনটি ট্রাক্টর আছে, যেগুলো ফসল চাষের কাজে ব্যবহার করি। প্রতিটির জন্য প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল লাগে। সরবরাহ না থাকায় ঈদের আগেই দুটি ট্রাক্টর বন্ধ করে দিয়েছি। এখন একটি চালানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু এই সংকটের কারণে কাজ করতে পারছি না।’
(৩)
এদিকে নড়াইল সদর উপজেলায় বোরো ধানের ক্ষেতে সেচ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ চালিত নলকূপ। এতে গ্রামের কৃষকদের সেচ খরচ যেমন কমেছে; তেমনই পানির সরবরাহও নিশ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের নেই ডিজেল বা বিদ্যুতের চিন্তা। কম খরচে চাহিদামতো পানি পাওয়ায় খুশি তারা।
চাচড়া গ্রামের কাইদুল বিশ্বাস বলেন, ‘সোলার পাম্পের কারণে আমরা কম খরচে বোরো আবাদে সেচ দিতে পারছি। আমাদের ডিজেলের জন্য পাম্পে গিয়ে লাইন দিতে হচ্ছে না। বোরো মৌসুমে অন্যান্য জায়গায় কৃষকেরা সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। তবে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’
কৃষকেরা জানান, সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে এলাকার অনেকেই সহজে সেচ দিতে পারছেন। ধান ছাড়াও পাট ও শাক-সবজিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। সৌর পাম্পে শ্যালো মেশিনের তুলনায় অনেক গুণ লাভ।
নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক বলেন, ‘জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এ প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত দুটি সোলার পাম্প বর্তমানে কৃষকেরা যৌথভাবে পরিচালনা করছেন।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ২-৩ দিন পরপর প্রায় ৬০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে।
প্রসঙ্গ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এ ধরনের ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং তারা উপকৃত হবেন।’
বোরো আবাদে সৌর পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়ায় কোনো চিন্তা নেই। সূর্যের আলো থেকে সব হচ্ছে। বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। তেলের দরকার নেই। সরকারের প্রতি দাবি, কৃষকদের জন্য এ রকম সৌর পাম্প প্রত্যেক মাঠে স্থাপন করা হোক। বর্তমান সংকট মুহুর্তে সৌরবিদ্যুতের নলকূপ এখন খোদায়ী রহমত ইনশাআল্লাহ।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান আরিফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা কাফিরদের ষড়যন্ত্র
১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিদ্যুৎবাঁচাতে সন্ধ্যা ৬টার সময় দোকানপাট বন্ধ করলে অর্থনীতি আরো দুর্বল হবে
০৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
হুজুগে মাতা বাঙ্গালী তেলের অবৈধ মজুতেই দেশের বিপদ ডেকে আনছে বাংলাদেশেই উৎপাদন হয় পর্যাপ্ত পেট্রোল-অকটেন। তারপরেও আতঙ্ক কেন?
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ: গত পরশু বিজেপি নেতার খুলনা যশোর অঞ্চল দখলের হুমকী এবং বারবার উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ দখলের আস্ফালন
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৭০০ কিলোমিটারের মরণব্যাধি ও আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা : বেগম পাড়ার বিলাসিতা কি সার্বভৌমত্বের কফিনে শেষ পেরেক?
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আমেরিকা থেকে উচ্চমূল্যে বিষাক্ত গম আমদানি বন্ধ করতে হবে
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আইনি লেবাসে সন্ত্রাসী ইহুদিদের পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় হত্যাকা-: ইসরায়েলের বর্বরতা, আন্তর্জাতিক নীরবতা এবং আমাদের করণীয়
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও সার্বভৌমত্বের দুশমনদের অপতৎপরতা-উগ্র হিন্দুত্ববাদী ‘রবীন্দ্র ঘোষ’ ও ‘চিন্ময়’ চক্রের রাষ্ট্রদ্রোহী আঁতাত এবং প্রশাসনের জগৎশেঠদের মুখোশ উম্মোচন
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: একবিংশ শতাব্দীর কৌশলগত অপরিহার্যতা
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












