ইতিহাস
রোয়াইলবাড়ি দুর্গ পূর্ণাঙ্গ খননে উন্মোচিত হতে পারে বাংলার অজানা ইতিহাস (১)
, ০৩ রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৫ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ০৯ পৌষ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন রোয়াইলবাড়ি দুর্গ পূর্ণাঙ্গ খননে উন্মোচিত হতে পারে বাংলার অজানা ইতিহাস। রোয়াইলবাড়ি দুর্গটি একটি প্রাচীন দুর্গ ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বলে মনে করা হয়। বাংলার প্রাচীন শাসনকর্তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এ স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসেন এখানে।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এটি সুলতানি আমলের স্থাপনা। আবার কেউ কেউ এটিকে কোনো মোঘল সেনাপতির তৈরি স্থাপনা বলেও মনে করেন।
‘ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁ নাসিরুজিয়াল পরগনা ও রোয়াইল বাড়ি জয় করেছিলেন এবং এ আবাসভূমিটি ছিলো দেয়ালঘেরা। মুসলিম যুগের শুরুতে রোয়াইলবাড়ি দুর্গটি সৈন্যবাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর আউটপোস্ট বা সীমান্ত চৌকি ছিলো বলে ধারণা করা হয়।
আশির দশকে রোয়াইলবাড়ি দুর্গের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর একে সংরক্ষিত প্রতœতত্ত্বস্থল হিসেবে নথিভুক্ত করে। নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়ায় অবস্থিত এটি একটি প্রাচীন দুর্গ ও বাংলাদেশের অন্যতম প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি ‘কোটবাড়ি দুর্গ’ নামেও পরিচিত। এটি বেতাই নদীর তীরে কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রোয়াইলবাড়ি নামক স্থানে অবস্থিত।
দুর্গটিকে কেন্দ্র করে প্রথম উল্লেখযোগ্য সরকারি কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে, এ বছর স্থানটি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সংরক্ষিত ঘোষণার পর ১৯৯১-১৯৯২, ১৯৯২-১৯৯৩, ১৯৯৩-১৯৯৪ এবং ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দুর্গের বুরুজ ঢিবি ও দক্ষিণ সীমানা প্রাচীরে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন কাজ পরিচালনা করে ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এবং একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষসহ দুটি ঢিবি উন্মোচন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্-এর পুত্র নসরত শাহ্ এ অঞ্চলে বসবাসের সময় দুর্গটি তৈরি করেন। পরবর্তীতে ঈশা খাঁ ও তার পরবর্তী শাসকের আমলেও দুর্গে ব্যাপক সম্প্রসারণের কাজ করা হয়।
৪৬ একর জমির উপর অবস্থিত পুরো দুর্গটি পূর্ব-পশ্চিম দিকে লম্বা ও প্রাচীর দ্বারা বিভক্ত। দুর্গটি উত্তর দক্ষিণে ৫৩৩.২৩ মিটার ও পূর্ব পশ্চিমে ৩২৭.৫৭ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। দুর্গের প্রাচীর নির্মাণে ইট ব্যবহার করা হয়েছে।
এছাড়াও দুর্গে রয়েছে একটি পুকুর, দুটি ঢিবি, একটি কবরস্থানসহ বেশকিছু প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। খননকাজ পরিচালনাকালে এখানে ইটের ভগ্নাংশ, পাথরের খ-, মৃৎপাত্রসহ বেশ কিছু প্রতœবস্তু পাওয়া গেছে।
এই দুর্গের ডেঙ্গু মিয়া ও নিয়ামত বিবির মাজার (প্রতœতাত্ত্বিক খননের জন্য ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে নির্বাচিত প্রতœতত্ত্বস্থলটির নাম সরকারি প্রজ্ঞাপন ও গেজেট অনুযায়ী ডেঙ্গু মিয়া ও নিয়ামত বিবির মাজার) নামক সম্ভাবনাময় প্রতœঢিবিটিতে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে খননের ফলে বিভিন্ন স্থাপত্যিক কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।
প্রতœতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত প্রতœবস্তু, উন্মোচিত কাঠামোর স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য স্থাপনা বিবেচনায় ধারণা করা যায় যে, রোয়াইলবাড়ি দুর্গ আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ১৪ শতকের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিলো। এই সময়ের অগ্রবর্তী সৈন্যদলের কবর হতে পারে এই কবরগুলো।
ইতোমধ্যে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খননে দুর্গের মূল কাঠামো, সিংহদ্বার, বুরুজ, পুকুর, পরিখা, সুড়ঙ্গপথ এবং মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
২০১৬ থেকে ১৭ সালের খননে চারটি ১০ কিনারা বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, জ্যামিতিক মোটিফ অঙ্কিত পাথর, মুসলিম যুগের টাইলস, মৃৎপাত্রের টুকরা এবং লোহা থেকে নির্মিত স্থাপত্য উপকরণ পাওয়া গেছে। যা বাংলার অন্যান্য প্রাচীন দুর্গ থেকে রোয়াইলবাড়িকে আলাদা করেছে।
প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দুর্গটির স্থাপত্যশৈলী ও উপকরণ বিশ্লেষণে এটি ১৫ শতকের শেষভাগে নির্মিত। একে সুলতানি আমলের শেষ ও মোগল যুগের প্রারম্ভিক সময়ের সামরিক স্থাপনা বলে ধারণা করা হয়।
নদী সংলগ্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বারদুয়ারি, প্যারেড গ্রাউন্ডসহ বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক আউটপোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
গবেষকদের মতে, সম্পূর্ণ খনন ও সংরক্ষণ কাজের মাধ্যমে বাংলার মধ্যযুগীয় সামরিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের আরও অজানা তথ্য উদ্ঘাটিত হবে। সম্পূর্ণ এলাকায় খনন পরিচালনা করা হলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গের সঙ্গে তৎকালীন পূর্বুবাংলার সামরিক নেটওয়ার্ক, নদী-ভিত্তিক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ ও ঈশা খাঁ পরবর্তী আঞ্চলিক ক্ষমতা বিকাশের তথ্যও উঠে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলাকাবাসী এ পুরাকীর্তিটিকে ‘ঈশাখার দুর্গ’ হিসেবে জানেন। স্থানীয় ঐতিহাসিকের মতে, ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ কামরূপের রাজা নিলাম্বরের বিরুদ্ধে প্রচ- যুদ্ধ পরিচালনা করে কামরূপ রাজ্য অধিকার করেন। পরে তার পুত্র নছরৎ শাহ্ কামরূপ রাজ্য শাসন করেন। এর কিছুদিন পর তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে বিতাড়িত হন এবং কামরূপ থেকে পালিয়ে এসে পূর্ব ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোণা জেলার অন্তর্গত) রোয়াইলবাড়িতে আশ্রয় নেন। তখন তিনি এ অঞ্চলটির নামকরণ করেন ‘নছরৎ ও জিয়াল’ (কারও কারও মতে- ‘নছরৎ আজিয়াল’)। পরবর্তীতে তার শাসনান্তর্গত সমস্ত প্রদেশটিই (বৃহত্তর ময়মনসিংহ) ‘নছরৎশাহী পরগনা’ নামে পরিচিত হয় এবং আকবর শাহ এর সময় পর্যন্তও পরগণাটি ওই নামেই পরিচিত ছিল। এরপর আলী ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও নেত্রকোণার রোয়াইলবাড়ি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেন। স্থানীয়রা জানান, রোয়াইলবাড়ি থেকে জঙ্গলবাড়ি পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তাও ছিল, যা এখন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম নির্যাতনের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলার সুলতান যেভাবে নেপাল বিজয় করেছিলেন
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আধুনিক কাগজ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা মুসলমানগণই
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












