যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা (৩)
, ০৮ যিলহজ্জ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৬ ছানী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৬ মে, ২০২৬ খ্রি:, ১২ জৈষ্ঠ্য, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
জেটি ভরে যেতো বিদায় দিতে আসা স্বজনদের ভিড়ে:
অনেকে ফিরে আসতে না পারা বা জীবনের শেষ ভ্রমণ হিসেবে হজকে বিবেচনা করতেন। তাই হজে যাওয়া ব্যক্তিদের বিদায় দিতে আসতেন চেনা-জানা সবাই। তারা আশেপাশের হোটেলে বা আত্মীয়দের বাসায় উঠতেন।
আত্মীয়-পরিজনের কারণে এতই ভিড় হতো যে, চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত চার নম্বর জেটি হজযাত্রীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিলো। ১৭টি জেটির মধ্যে চার নম্বর জেটি ছিলো সবচেয়ে বড় এবং খোলামেলা পরিবেশের।
বিদায় দেওয়ার দিন হজযাত্রীদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হতো বন্দরে। সকাল ৯টা-১০টা নাগাদ জাহাজে সব যাত্রী উঠে পড়লে জাহাজের সিঁড়ি তুলে নেওয়া হতো। আর নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাও তুলে বন্দরে সাধারণের প্রবেশ অনুমতি দিতো। তখন আত্মীয়-পরিজনেরা তো থাকতেনই, আশেপাশের লোকেরাও এসে ভিড় জমাতেন হজযাত্রীদের রওনা হওয়া দেখতে।
দোয়া-মুনাজাত শেষে জাহাজ জেটি থেকে ধীরে ধীরে ছেড়ে যেতো। কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে জাহাজ যখন সমুদ্রে প্রবেশ করতো, তখন দেশি-বিদেশি অন্যান্য জাহাজ হুইসেল বাজিয়ে হজযাত্রীদের শুভেচ্ছা জানাতো। সে সময় হাতে গোনা কয়েকজনই হজে যেতে পারতেন, অথচ হজ ছিলো অনেক বেশি গৌরব ও সম্মানের বিষয়।
আহমাদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে যায়, আমি তখন ছাত্র ছিলাম। আমি চলে গেছিলাম হজ করতে। জাহাজের ডেকে বা তৃতীয় শ্রেণিতে তখন ভাড়া পড়তো ১,৯১৯ টাকা। যদিও সেবার আমার আর যাওয়া হয়নি। তবে এই টাকার মধ্যে এক হাজার টাকা সৌদি আরবে থাকা-খাওয়া খরচ এবং ৯১৯ টাকা জাহাজে খাওয়া ও ভাড়া এবং অন্যান্য সরকারি খরচ।’
'জাহাজে দ্বিতীয় শ্রেণিতে যাতায়াত করলে সবমিলিয়ে খরচ হতো ৪,৫০০ টাকা। এছাড়া প্রথম শ্রেণিতে সর্বমোট খরচ হতো ৭,০০০ টাকার কিছুটা বেশি-যা বিমানের তুলনায় আবার কম ছিলো।
যুদ্ধ শেষে হজযাত্রীরা ছিলেন আতঙ্কে:
যুদ্ধ শুরু হলে সফিনায়ে আরব ও সফিনায়ে আরাফাতের প্রথম ট্রিপ হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও দ্বিতীয় ট্রিপ আর যেতে পারেনি।
আহমেদুল ইসলাম জানান, ‘১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি ছিলো আরাফাত দিবস। ফলে হজযাত্রীরা রওনা দিয়েছেন আরও আগেই। দেশ স্বাধীন হলে তারা পড়ে যান উৎকণ্ঠায়। কারণ তাদের সব কাগজপত্র ছিলো পাকিস্তান সরকারের। তারা না পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারছেন, না বাংলাদেশে ঢুকতে পারছেন। পরে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের মাধ্যমে সৌদি শাসকের কাছে চিঠি লেখেন, যাতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যাওয়া হজযাত্রীদের ফেরত আসার অনুমতি দেওয়া যায়। সৌদি সরকারের অনুমতি লাভের পর ভারতীয় মোহাম্মদী জাহাজে করে দুই ট্রিপে হাজিদের পাঠানো হয়।’
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে তখন অসংখ্য মাইন এবং জাহাজ ডুবে থাকায় তা ছিলো অনিরাপদ। হাজিভর্তি জাহাজকে তাই মংলা বন্দরমুখী হতে হয়। কিন্তু নাব্যতা স্বল্পতার কারণে সেখানেও নোঙর ফেলতে ব্যর্থ হয় জাহাজ। অবশেষে অনেক কষ্টে নদীতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাঁদপুরে নোঙর ফেলে মোহাম্মদী জাহাজ।
এদিকে হজযাত্রীদের ফিরে আসার খবরে হাজার হাজার নিকটতম লোকজন মোংলা যান তাদের গ্রহণ করতে। পরে তারা আবার চাঁদপুরে ফিরে আসেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২-১৯৭৫/৭৬ সাল পর্যন্ত হজ গমন ছিলো সীমিত। কেননা বাংলাদেশ সৌদি আরবের স্বীকৃতি তখনও পায়নি। এরপর সৌদি বাদশাহর কাছে চিঠি পাঠালে, সৌদি বাদশাহ সম্মত হয়।
ভারত সরকারের সহায়তায় তখন তাদের মোহাম্মদী জাহাজে করে হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রওনা দেন। কিন্তু মোহাম্মদী জাহাজ অতি পুরানো বিধায় পরের বছর শুধু বাংলাদেশ বিমানে মাত্র ৩ হাজার জনকে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে ঢাকা থেকে বিমানে ক্রয় হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
হাজিদের জন্য বাংলাদেশি একমাত্র জাহাজ, ‘হিজবুল বাহার’:
১৯৭৬/৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘হিজবুল বাহার’ নামে একটি জাহাজ কেনে। এ জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ছিলো ১,৮০০ জন। যাতায়াত করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতো। পরবর্তীতে ব্যয় সংকোচনের জন্য এ জাহাজ নৌবাহিনীকে স্থানান্তর করা হয়।
নৌবাহিনী শহীদ সালাহউদ্দিন নামকরণ করে তাদের তত্ত্বাবধানেও হজযাত্রী যাতায়াত করে কয়েক বছর। এরপর জাহাজটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
১৯৭৭ সালের পর ঢাকা-জেদ্দা সৌদি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট চালু করলে পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন শুরু হয়। তখন ওমরাহ করতে আসা-যাওয়া ভাড়া ছিলো ৯,০০০ টাকার কিছু বেশি। যাত্রাসময়ও কমে আসে ৬-৭ ঘণ্টায়। এ প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকলে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই সমুদ্রপথে যাত্রী পরিবহন ক্রমশ কমে যায়। ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে গেলে একসময় চট্টগ্রামের হজ ক্যাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হাজিক্যাম্পকে ঘিরে একসময় হজ মৌসুমে পুরো চট্টগ্রাম শহরে বিরাজ করতো এক দ্বীনি উৎসবমুখর, আবেগঘন পরিবেশ। আর ছিলো হাজিদের পদচারণা।
পাহাড়তলীর হাজী ক্যাম্প ঘিরে এই আনন্দঘন পরিবেশ ছিলো পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে, হিজবুল বাহার যতদিন ছিলো ততদিন পর্যন্ত। এরপর আশির দশকে ঢাকা থেকে ফ্লাইট ব্যবস্থা চালু হলে বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মিত হয়।
পরে ১৯৮৯ সালে এ হজ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে ঢাকার আশকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই বর্তমানে হজ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
-মুহম্মদ মুফহিম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৪র্থ পর্ব)
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (১৪)
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৩য় পর্ব)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হযরত শায়েখ সাইয়্যিদ আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং নববী মুহব্বতের দৃষ্টান্ত
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ: অভিশপ্ত ইহুদী মনস্তত্ব বিশ্লেষণ
০২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উসমানীয় সালতানাতে যেভাবে পবিত্র কুরবানীর ঈদ বিশেষভাবে উদযাপন করা হতো
২৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
কুরবানীবিরোধী ও মুসলিম বিদ্বেষী জালিম শাসক গৌরগোবিন্দের করুণ পরিণতি
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা (২)
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (২য় পর্ব)
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (৫ম পর্ব)
১৭ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
উসমানীয় শাসনের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আত্মত্যাগ এবং সিঙ্গাপুর গণহত্যার করুণ ইতিহাস
১৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
‘গরুর গোস্তে রোগ আছে’ এই সংক্রান্ত বাতিল হাদীছ ও তার খন্ডনমূলক জবাব
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












