যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা (২)
, ০৩ যিলহজ্জ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২১ ছানী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২১ মে, ২০২৬ খ্রি:, ০৭ জৈষ্ঠ্য, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) ইতিহাস
জাহাজগুলো থাকতো অতিরিক্ত যাত্রীতে ঠাসা:
জাহাজগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ ও জনবলও ছিলো না। তার ওপর জাহাজগুলো থাকতো অতিরিক্ত যাত্রীতে ঠাসা। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র মতো পত্রিকাগুলোতে হাজিদের দুরবস্থার বর্ণনা করে নানা রকম চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশিত হতো তখন।
এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ভারত সরকার ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত টমাস কুক কোম্পানিকে হজের জন্য সরকারি ভ্রমণ এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করে। তবে হজ ভ্রমণে মুনাফা না থাকার অভিযোগ তুলে কোম্পানিটি এ সেবা বন্ধ করে দেয়। এরপর ভারতীয় হাজিরা আবার ব্রিটিশ ও ভারতীয় বিভিন্ন দালাল ও এজেন্টের সাহায্যে হজযাত্রা শুরু করেন।
১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে, ভারতের ৭০ শতাংশ হজ জাহাজই মোগল লাইনের মালিকানাধীন ছিলো। কিন্তু বোম্বে গিয়ে যাতায়াতের পথগুলো ছিলো প্রতিকূল। তাই পূর্ব ভারতীয়রা যাতে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজে যেতে পারেন, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করেন চট্টগ্রামের খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী। তিনি নিজেই ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন সদস্য।
ব্রিটিশ সরকার রাজি হলে, চট্টগ্রামের শিল্পপতি এ.কে খানের শশুর ফটিকছড়ির ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরীর শিপিং লাইনের ইংলিশতান জাহাজে করে ১৯৩৭ সালে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজযাত্রী গমন শুরু হয়। (দৈনিক পূর্বকোণ, ২৯ মে ২০২৩, হজের ইতিহাসে চট্টগ্রামের অবস্থান)
রোযার ঈদের পরপরই চট্টগ্রাম নগরীতে হজের মৌসুম শুরু হয়ে যেতো:
এরপর পাক-ভারত আলাদা হলে, ১৯৪৮ সালে সরকারিভাবে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সাগর পথে হজযাত্রী পরিবহন শুরু হয়। সেই লক্ষ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ৯ একর ৩৫ শতকের একটি স্থায়ী হাজি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব হাজিরা হজে যাতায়াত করতেন।
ক্যাম্পের ভেতরে ছিলো একটি বড় মসজিদ, একটি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন ও যাত্রীদের অবস্থানের জন্য ৭টি দ্বিতল ভবন। অন্তত এক সপ্তাহ থাকতে হতো হাজি ক্যাম্পে। সেখানেই তাদের হজযাত্রার প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
এ সময় চট্টগ্রাম থেকে রোযার ঈদের পরপর ‘সাফিনা-ই-আরব’ ও ‘সফিনা-ই-আরাফাত’ নামে দুটি জাহাজ দুই ট্রিপে হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দা গমন করতো।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম-করাচি নিয়মিত জাহাজটি (শামস) চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রী নিয়ে করাচি বন্দরে পৌঁছতো। সেখান থেকে বড় জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হতো জেদ্দায়।
পাশাপাশি বিমানসেবাও ছিলো, কিন্তু অল্প কিছু সচ্ছল হাজিই ঢাকা থেকে করাচিতে বিমানে করে যেতেন।
জাহাজের প্রথম ট্রিপ ছাড়তো রোযার ঈদের সাতদিন পরে। প্রথম ট্রিপে যাওয়ার জন্য হজযাত্রীদের অনেকেই ঈদুল ফিতরের পরপরই পাহাড়তলীর হজ ক্যাম্পে চলে আসতেন। দুই জাহাজ মিলে প্রথম ট্রিপে যেতেন প্রায় ১,৩০০ হজযাত্রী।
১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জেদ্দায় গিয়েছিলেন মোট ৩,৮৯৫ জন। দূর-দূরান্তের হজযাত্রীরা যেন নির্বিঘেœ চট্টগ্রামে আসতে পারেন, সেজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের টিকিট ইস্যু করা হতো।
হজ যাত্রায় সেসময় জেলাভিত্তিক কোটা ছিলো:
দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মতো জায়গাগুলো থেকে আবেদন আসতো কম। ওদিকে চট্টগ্রামের কোটা পূরণ হয়ে যেতো সবার আগে। তাই অন্যান্য জেলা থেকে আবেদন নিয়ে আবার চট্টগ্রামের ওয়েটিং লিস্ট থেকে নেওয়া হতো বাকিদের।
অনেকে আবার আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে অন্যান্য জেলা (যেসব জেলায় কোটা খালি থাকতো) থেকে আবেদন করতেন হজের জন্য।
হজযাত্রীর সংখ্যা অত্যধিক থাকায় ডেক শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হতো। চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে এই লটারি অনুষ্ঠিত হতো। অন্যদিকে ১ম এবং ২য় শ্রেণির ভাড়া বেশি থাকায়, কিছু কিছু আসন খালিও যেতো।
যেহেতু, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো এবং সৌদি আরবের তীব্র গরম আবহাওয়া ও প্রচ- ভিড়ে অনেক হাজি খুব দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তাই হজযাত্রীদের সাথে যেতেন চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, এবং নার্স।
খান বাহাদুর আহসানউল্লার ‘আমার জীবনধারা’ গ্রন্থে লিখেছেন- ‘আমাদের সঙ্গে প্রচুর চাল, ডাল, ঘি, চিনি ও চা ছিলো। আমাকে রান্নার ভার দেওয়া হলো। আমি দুপুরে খিচুড়ি রাঁধতাম। মঞ্জিলে মঞ্জিলে কেবল জ্বালানি কাঠ ও পানি খরিদ করা হতো। পথিমধ্যে মাছ দুষ্প্রাপ্য ছিলো। তবে ছাগলের গোশত পাওয়া যেতো। জাহাজ সোকোট্টার (ভারত মহাসাগরে চারটি দ্বীপের একটি মালা, ইয়েমেনের অংশ) কাছে পৌঁছালে সমুদ্রের গর্জন শুরু হয়। উত্তাল তরঙ্গে জাহাজ দুলে ওঠে। আমাদের কামরার কাচের সব বাসনপত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। অন্ধকারের ভেতর আমি হাঁটু গেড়ে জাহাজের শিকল ধরে থাকি।’
-মুহম্মদ মুফহিম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার নৌবাহিনী গঠন এবং বিজিত এলাকার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত নিযামুদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ প্রাঙ্গণে বসন্ত পঞ্চমী উৎসবের বানোয়াট ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অশ্লীল চিত্র দেখা ও তৈরিতে যে সমস্ত বিধর্মী রাষ্ট্র শীর্ষে...
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বিধর্মীদের কুকীর্তিগুলো লিখিত রূপ দেয়নি কোনো লেখক, ফলে তাদের অপকীর্তিগুলো মুসলমানদের জানার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি বিধর্মী-কাফির, মুশরিকরা কতবেশি বিদ্বেষ পোষণ করে তার একটি উদাহরণ
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর বিধর্মীপ্রীতিতে মত্ত শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি এক ছোট্ট কুটিরে খুঁজে পেলেন গরিব কিন্তু বেমেছাল তাক্বওয়াধারী এক পুত্রবধু
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার ইলম মুবারক
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি অনন্য খুছুছিয়ত মুবারক আর বাবুল ইলমী শানে মহীয়ান
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৪র্থ পর্ব)
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (১৪)
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৩য় পর্ব)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












