বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৩য় পর্ব)
, ০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
আব্বাসীয় যুগে বিজ্ঞানচর্চা; জ্যোতির্বিদ্যা:
আব্বাসীয় যুগে জ্যোতির্বিদ্যারও প্রভূত উন্নতি হয়েছিলো। জ্যোতির্বিদদের মধ্যে মাশাআল্লাহ, সেন্দা বিন আলী, ইয়াহিয়া বিন মনসূর, আবূ মাসার প্রমুখ বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আবূ মাসারের লিখিত ‘জিসবায়ে মাসার’ জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎস বলে বিবেচিত হতো। আবুল হাসান দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করে জ্যোতিঃশাস্ত্রের বিশেষ উন্নতি সাধন করেন। ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত আল বাত্তানীর বাতানীর জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় তালিকাসমূহ বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের জ্যোতিঃশাস্ত্রের ভিত্তিরূপে গৃহীত হয়েছিলো। আবাসীয় শাসক মামুনের প্রতিষ্ঠিত সামাহিয়ার গবেষণাগারে প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ আবূ জাফর মুহাম্মাদ বিন মূসা, ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমী এ গবেষণাগারে গবেষণা করতেন। আবুল ওয়াদা ত্রিকোণমিতি এবং জ্যোতিঃশাস্ত্র বিষয়ক গবেষণার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন এবং টলেমীর চান্দ্রিক মতবাদের ভ্রান্তি প্রদর্শন করে স্বাধীন ও নতুন তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। সুলতান মাহমুদ গজনভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়কার আল বিরুনী একজন প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ছিলেন। উনার লিখিত ‘আল-কানূন আল মাসুদী’ অংক ও জ্যোতিঃশাস্ত্রে মৌলিক জ্ঞান ও গবেষণার পরিচয় পাওয়া যায়। কবি ওমর খৈয়ামও জ্যোতির্বিদ্যায় ও অংক শাস্ত্রে ব্যুৎপন্ন ছিলেন।
গণিত শাস্ত্র:
গণিত শাস্ত্রে আরবদের অবদান বিস্ময়কর। আরবগণ পাশ্চাত্য জগতকে সংখ্যা গণনা পদ্ধতি শিক্ষাদান করে। আরব প্রতীক এখনও পৃথিবীর সকল জাতি ব্যবহার করে। উনারা দশমিক পদ্ধতিও প্রবর্তন করে। বীজগণিতকেও উনারা পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করেন। বীজগণিত ও আরবদের অন্যান্য গাণিতিক আবিষ্কারগুলো আরব বণিকগণ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়। আরবগণ সর্বপ্রথম বীজগণিতকে জ্যামিতিতে ব্যবহার করেন। এরপর সমীকরণ আবিষ্কার করে দ্বিঘাত সমীকরণ ও দ্বিপদ উপপাদ্যের উন্নতি সাধন করেন। উনারা গোলক ত্রিকোণমিতি আবিষ্কার করেছিলেন এবং উনারা জ্যামিতিকে অ্যালজাব্রিয়ায় প্রয়োগ করেন। গণিত শাস্ত্রে মৌলিক অবদানের ক্ষেত্রে আল বাত্তানী, আল ফারাবী, আলবিরুনী, আল খাওয়ারিজমী, আবুল কাশেম মানশামা, ওমর খৈয়াম, আর কায়বী প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
রসায়ন শাস্ত্র:
আলকেমি হতে রসায়ন শাস্ত্রের জন্ম হয়েছে। আলকেমি মূলত আরবী শব্দ আল কিমিয়া থেকে এসেছে। এ শাস্ত্রের উন্নতিতে মুসলমানদের অবদান অপরিসীম। মুসলমানগণই প্রথম পাতন, পরিস্রবণ ও স্বচ্ছকরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আধুনিক রসায়নের জনক বলা হয়। তিনি রসায়ন শাস্ত্রের ওপর প্রায় ৫০০ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি রসায়ন শাস্ত্রের দুটি মূলসূত্র ভস্মীকরণ ও লঘুকরণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা করেন। জাবের বালীকরণ, ঊর্ধ্বপাতন, দ্রবীকরণ, স্ফটিককরণ প্রভৃতি পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেন। তাছাড়া যবক্ষার এসিড, গন্ধক, দ্রাবক, পানি-দ্রাবক ও অন্যান্য গবেষণা পদ্ধতিতে পরিণত করেন। এ যুগের অপর একজন বিখ্যাত রসায়নবিদ ছিলেন আল রাযি। তিনি যবক্ষার এসিডের পুনরাবিষ্কার করেন। বিখ্যাত চিকিৎসক ইবনে সিনাও রসায়ন শাস্ত্রকে প্রণালীবদ্ধ করতে সাহায্য করেন।
উদ্ভিদ বিজ্ঞান:
আব্বাসীয় যুগে উদ্ভিদ বিদ্যারও বহু উন্নতি হয়। মুসলমানগণ দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির গাছের শ্রেণীকরণ করেছিলেন। উদ্ভিদবিদদের মধ্যে ইবনে বাতরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লতাপাতা সম্পর্কিত তার প্রবন্ধাদি আজও উদ্ভিদবিদদের নিকট মূল্যবান বলে বিবেচিত। তাছাড়া ভূতত্ত্ব ও প্রাণীতত্ত্বেরও তারা প্রভূত উন্নতি সাধন করেন।
মুসলমান স্পেনে বিজ্ঞান চর্চা:
স্পেনে মুসলমান সালতানাতের সময় মুসলমানগণ বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগ বিশেষ করে জ্যোতিষশাস্ত্র ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে আশানুরূপ উন্নতি করেন। আন্দালুসিয়ায় জ্যোতির্বিদ্যার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। এ সময়ের জ্যোতির্বিদগণের মধ্যে প্রখ্যাত ছিলেন কর্ডোভার আল মাজরিত, টলেডোর আল-জারকালী এবং সেভিলের ইবনে আফলাহ। আবদুল ইবনে আহম্মেদ ছিলেন স্পেনের তথা মুসলমান জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভিদ তত্ত্ববিদ।
সাহিত্য:
সাহিত্যকলাকে মানব সভ্যতার দর্পণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সাহিত্যকলার প্রকৃত বিস্তার হয়েছিলো সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মাধ্যমেই। সাহিত্যকে সুন্দর, সুষমাম-িত ও পরিশীলিত ধারায় ব্যঞ্জনা দিয়েছেন সম্মানিত দ্বীন ইসলাম। সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আগমনের পূর্বে আরব সাহিত্য বা অন্য যে কোন সাহিত্যের প্রতি তাকালে দেখা যাবে সাহিত্যের নামে যা কিছু ছিলো, তা অত্যন্ত ক্লেদাক্ত ও কলুষিত। সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এসে সাহিত্য অঙ্গনকে যাবতীয় কলুষ-কালিমা ও ক্লেদ থেকে পূত- পরিচ্ছন্ন মানবিক-নৈতিক এবং প্রাণরসের সঞ্জীবনী ধারায় উন্নীত করেছে।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মুসলমান কবি ও সাহিত্যিকগণকে পৃষ্ঠপোষকতা ও পুরস্কৃত করে উৎসাহ প্রদান করতেন। উনারই মুবারক দয়া ইহসানে সাহিত্যের চূড়ায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত হাসসান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি। সুবহানাল্লাহ!
সাহিত্যে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ:
মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম পবিত্র কুরআন শরীফ উনার নির্যাস এক অতুলনীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাহিত্য। পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ নাযিল হওয়ার পর অশ্লীল কাব্যচর্চা বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় শ্লীল, মার্জিত ও রুচিসম্মত কাব্যচর্চা। (অসমাপ্ত)
-মুহম্মদ শাহজালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আজকের নির্যাতিত-নিপীড়িত নিষ্পেষিত মুসলিম জনপদের দখল যেভাবে নিলো কুখ্যাত ইহুদী গোষ্ঠী
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার খলীফা মনোনীত হওয়ার সঠিক ইতিহাস
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
উসমানীয় সুলতানের কাছে ফিলিস্তিনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব!
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক একটি ঘটনা
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ধূর্ত রোমান শাসককে আব্বাসীয় সালতানাতের দাতভাঙ্গা জবাব
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’দাদ শরীফ পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ দিন ও রাত্রই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে বড় ঈদের দিন
২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’দাদ শরীফ মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ কুল-কায়িনাতের সকল রাত ও দিনের চেয়েও লক্ষ-কোটিগুণ বেশি মর্যাদাসম্পন্ন ও ফযীলতপূর্ণ রাত ও দিন মুবারক
২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












