ইতিহাস
রোয়াইলবাড়ি দুর্গ পূর্ণাঙ্গ খননে উন্মোচিত হতে পারে বাংলার অজানা ইতিহাস (২)
, ১০ রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০২ ছামিন, ১৩৯৩ শামসী সন , ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ১৬ পৌষ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
২০১৭ সালে পরিচালিত খনন কাজের তদারককারী কর্মকর্তা প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী পরিচালক মাহবুব উল আলম বলেন, স্থাপত্যশৈলী এবং উদ্ধার করা জিনিসপত্র দেখে মনে হয়েছে, এটি ১৫ শতকের শেষ দিকে, অর্থাৎ মোঘল আমলের আগে এবং সুলতানি আমলের শেষের দিকে নির্মিত। এ হিসেবে এটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো। ধারণা করা যায়, এটি সৈন্যবাহিনী বা পদাতিক বাহিনীর আউটপোস্ট ছিলো।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সেখানে খনন কাজ চালায়। এ সময় মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে ইটের দেয়ালবেষ্টিত দুর্গ, মূল প্রবেশদ্বার (সিংহদ্বার), বহু কক্ষবিশিষ্ট একাধিক ইমারতের চিহ্ন, শান বাঁধানো ঘাটসহ দুটি বড় পুকুর, দুটি পরিখা, বুরুজ ঢিবি বা উঁচু ইমারত (টাওয়ার), বার দুয়ারি ঢিবি, কবরস্থান, মসজিদ, মিহরাব, চওড়া প্রাচীর, সুড়ঙ্গপথ, লতাপাতা ও ফুল-ফলে আঁকা রঙিন প্রলেপযুক্ত কারুকাজ, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, টালি, জ্যামিতিক মোটিফ, টেরাকোটা, বর্শা, প্রস্তরখ- এবং লোহা ও চিনামাটির নানা জিনিসপত্র।
সরেজমিন দেখা গেছে, সমস্ত দুর্গ এলাকাটি তিনভাগে বিভক্ত। মূল দুর্গের পূর্বদিকে দুটি পুকুর, যার অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। দক্ষিণ দিকের মাটির দেয়ালের দু’পাশে দুটি পরিখা। একটি পরিখা বেতাই নদী থেকে আসা নৌযানসমূহ নোঙর করার জন্য ব্যবহৃত হতো বলে অনুমান করা হয়। ধারণা করা হয়, দুর্গের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে বড় বড় পাথর খ- দিয়ে নির্মিত আরও দুটি প্রবেশ পথ ছিলো। দুর্গের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষিত এলাকার উত্তরাংশে ছিলো একটি বুরুজ ঢিবি (উঁচু ইমরাত বা টাওয়ার), একটি প্রবেশপথ ও কবরস্থান। এছাড়াও বুরুজ ঢিবির পাশে রয়েছে পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ, সমান্তরাল তিনটি দেয়াল, প্রবেশদ্বার, ওয়াচ টাওয়ার (পর্যবেক্ষণ চিলেকোঠা) ও চওড়া সিঁড়ি। কারুকার্যখচিত যে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে; অনেকের মতে-এটিই দেওয়ান জালাল নির্মিত ‘মসজিদ-এ জালাল’ বা ‘জালাল মসজিদ’।
রোয়াইলবাড়িতেই দুর্গ কেন গড়ে উঠে সে প্রসঙ্গে লেখক ও গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব জানান, “আমাদের ধারণা এ পানি অধ্যুষিত অঞ্চলটাকে নৌদস্যুর হাত থেকে রক্ষার জন্যে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ, কেল্লা তাজপুর দুর্গ, পুখুরিয়া দুর্গ, মোহনগঞ্জের দিকে বেতাম দুর্গ নামে দুর্গগুলো গড়ে উঠে এবং পরবর্তী সময়ে হয়ত যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দুর্গগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচীন বেতাই নদীর ঘাটটি হয়ত সেনাবাহিনী দুর্গের কাজে ব্যবহার করতো। তার পাশেই একটি কুচকাওয়াজের মাঠ, পুকুর, পরিখা, চারটি মেহরাব, চারটি দরজা সম্বলিত একটি মসজিদ, মসজিদের যে গঠনশৈলী তা দেখে প্রতœতাত্ত্বিকরা মনে করেন যে এটা সুলতানি কিংবা মোঘল আমলের। তবে স্থানটি দেখে যতটুকু বুঝা যায় যে সমগ্র রোয়াইলবাড়ি অঞ্চলটিই হয়ত একটা বড় ধরনের দুর্গ ছিলো।
খনন কাজ এখনো শেষ হয়নি, তবে সমস্ত খনন কাজ শেষ হলে পুরো গ্রামটিই একটি দুর্গ ছিলো বলে প্রমাণিত হতে পারে বলে আশা করছেন প্রতœতত্ত্ববিদেরা।
স্থানীয় লেখকরা ও সাংবাদিকরা জানান, “রোয়াইলবাড়ি ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটিকে আমরা রোয়াইলবাড়ি দুর্গ হিসেবেই চিনি। স্থানীয়ভাবে এটাকে কেউ ইশা খাঁর দুর্গ বলেন, কেউ নসরত শাহের দুর্গ বলেন। নানা কিংবদন্তি আছে জায়গাটাকে কেন্দ্র করে।
আলাউদ্দিন, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপ রাজ্য অধিকার করেন, তার পরবর্তী সময়ে নসরত শাহ এ রাজ্য শাসন করেন, নসরত শাহের নামে এ অঞ্চলে একটি পরগনা ছিলো। নাম ছিলো নসরৎ আজিয়াল, ধারণা করা হয় বা কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে নসরত শাহ, যখন কামরূপে প্রতিপক্ষের আক্রমণে পরেন তখন তিনি পূর্ব ময়মনসিংহের এই রোয়াইলবাড়িতে এসে আশ্রয় নেন এবং এ দুর্গটা গড়ে তুলেন। প্রতœতাত্ত্বিক গবেষকদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি তারাও অনুমান করেন যে আনুমানিক পনেরোশত শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ মোঘল আমলের শুরুর দিকে এবং সুলতানি আমলের শেষের দিকে দুর্গটা তৈরি করা হয়।”
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, এটি একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা, তাই এটি সংরক্ষণের সম্পূর্ণ এখতিয়ার প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন সার্বিক সহায়তা প্রদানে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রতœতত্ত্বস্থলসমূহের সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ২ বছরের মধ্যে এখানে প্রতœতাত্ত্বিক খনন করা হবে। এরপর প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আগামীতে সংস্কার সংরক্ষণ ও প্রদর্শনীর বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
তিনি জানান, ১৯৯১ থেকে ৯৩ ও ২০১৭ সালে খনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং খননকালে পাওয়া ইট-পাথরগুলো অস্থায়ীভাবে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। এই দুর্গের ডেঙ্গু মিয়া ও নিয়ামত বিবির মাজার নামক সম্ভাবনাময় প্রতœঢিবিটিতে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে খনন করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে এই স্থানটির সংস্কার সংরক্ষণ ও সংলগ্ন বারোদুয়ারি মসজিদ চত্বরের ভূমি উন্নয়ন করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এই স্থানটি জেলা পরিষদের সহযোগিতায় সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার নৌবাহিনী গঠন এবং বিজিত এলাকার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত নিযামুদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ প্রাঙ্গণে বসন্ত পঞ্চমী উৎসবের বানোয়াট ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অশ্লীল চিত্র দেখা ও তৈরিতে যে সমস্ত বিধর্মী রাষ্ট্র শীর্ষে...
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বিধর্মীদের কুকীর্তিগুলো লিখিত রূপ দেয়নি কোনো লেখক, ফলে তাদের অপকীর্তিগুলো মুসলমানদের জানার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি বিধর্মী-কাফির, মুশরিকরা কতবেশি বিদ্বেষ পোষণ করে তার একটি উদাহরণ
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর বিধর্মীপ্রীতিতে মত্ত শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি এক ছোট্ট কুটিরে খুঁজে পেলেন গরিব কিন্তু বেমেছাল তাক্বওয়াধারী এক পুত্রবধু
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার ইলম মুবারক
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি অনন্য খুছুছিয়ত মুবারক আর বাবুল ইলমী শানে মহীয়ান
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৪র্থ পর্ব)
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (১৪)
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৩য় পর্ব)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












