মন্তব্য কলাম
রেলপথ দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। রেলের ইঞ্জিন স্বল্পতার কারণে আগ্রহ থাকলেও প্রতিষ্ঠান বেছে নিচ্ছে অন্য পথ চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের ৯৬ শতাংশই হয় সড়কপথে অপরদিকে রেল অথবা সড়কপথে যাত্রী চলাচল কিংবা পণ্য পরিবহনে তুলনামূলকভাবে খরচ অনেক কম হয় পানিপথে।
, ২৮ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২১ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ০৫ পৌষ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) মন্তব্য কলাম
প্রকৃতপক্ষে নৌ-পরিবহনে নৌপথ সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে সব বাজেটেই কম বরাদ্দ থাকে।
গত অর্থবছরের বাজেটে পরিবহন খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা যার থেকে শুধু সড়ক পরিবহন খাতে ছিল ৬২ শতাংশ, রেলপথে ২৩ শতাংশ এবং আকাশপথে প্রায় ৭ শতাংশ ও পাশাপাশি নৌ-পরিবহন খাতে বরাদ্দ রাখা ছিল মাত্র ৬ শতাংশের কিছু বেশি অর্থ।
বৈষম্যটা পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু এই বৈষম্য নিরসনে কোনো সরকারই কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও নিচ্ছে না কিন্তু দাবী করছে সংস্কারের সরকার।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান দ্বার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে প্রায় ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ২০ ফুট ইকুইভ্যালেন্ট কনটেইনার (টিইইউ) হ্যান্ডলিং হয়েছে, যার ৯৬ শতাংশই পরিবহন হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে। মহাসড়কটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কপথগুলোর একটি। ঢাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামকে যুক্ত করেছে এ মহাসড়ক। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় পুরো ভার বহন করছে সড়কটি। অথচ সড়কটির গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা বাড়ানো যায়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পণ্য পরিবহনকে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এসব সমস্যা সমাধানে সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি রেল ও নৌপথকে কার্যকরভাবে গড়ে তোলা জরুরি।
রেলপথ দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বড় আকারের আমদানি-রফতানিমুখী পণ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো নির্মাণের কাঁচামাল এবং খাদ্যশস্য পরিবহনে রেলওয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে ইঞ্জিন সংকট এবং যাত্রীবাহী সার্ভিসকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে কয়েক বছর ধরে চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সম্প্রতি পণ্য পরিবহন থেকে আয় কমে যাওয়ায় রেলের মোট লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।
রেলের পরিবহন বিভাগ জানাচ্ছে, কয়েক মাস আগে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানা থেকে উত্তরবঙ্গের জন্য ২০ হাজার টন সার পরিবহনের প্রস্তাব ছিল। দীর্ঘদিন রেলের পরিবহন দপ্তরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল করপোরেশনের কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেও ট্রেন সার্ভিস পাননি। বাধ্য হয়ে এসব সার সড়কপথে পাঠাতে হয়েছে। এতে সময় ও খরচ বেড়ে সরবরাহের মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
একইভাবে উত্তরবঙ্গের জন্য জ্বালানি তেল ও খাদ্যশস্য পরিবহনের বড় প্রস্তাবগুলোও রেলওয়ে পূরণ করতে পারছে না। এতে রেলের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমূল্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ হারাচ্ছে। রেলপথে পণ্য পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম। বিশেষ করে জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য এবং আমদানি-রফতানিমুখী পণ্য পরিবহনে রেলের গুরুত্ব অপরিসীম। পূর্বাঞ্চল রেলের মিটার গেজ লাইনে সবচেয়ে বেশি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশন ও পরিবহন) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, “জ্বালানি পণ্য রেলপথে পরিবহন সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। রেলপথে একটি ওয়াগনে সর্বাধিক জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় অপচয় কম হয়। আমাদের আগ্রহ থাকলেও রেলওয়ে কাক্সিক্ষত মাত্রায় সার্ভিস দিতে পারছে না। বিভিন্ন সময়ে আমরা রেলওয়েকে চিঠি দিয়েছি। এখন নৌপথের পাশাপাশি সড়কপথে ট্যাংকারে জ্বালানি পরিবহন বেড়েছে। এতে খরচ বাড়লেও আমরা কিছু করতে পারি না।”
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় পাথর, সার, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়মিতভাবে রেলপথে পরিবহন হতো। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো নির্মাণের কাঁচামাল, খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনে রেলকে প্রাধান্য দিত। কিন্তু ইঞ্জিনস্বল্পতার কারণে এখন তারা বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে। সড়কপথে পরিবহন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি থাকে। ব্যবসায়ীরা সাশ্রয়ী মূল্যে রেলপথে নিরাপদে পরিবহন করতে চান, কিন্তু সার্ভিস না থাকায় তারা বিকল্প ব্যবস্থায় ঝুঁকছে।
রেলের নথিপত্রে দেখা গেছে, পূর্বাঞ্চলে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেলওয়ে ৪ হাজার ২৭৩টি পণ্যবাহী ট্রেন চালিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংখ্যা কমে ৩ হাজার ৩৮৭টি হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মাত্র ২ হাজার ৮৫টি ট্রেন সার্ভিস চালানো হয়েছে। অর্থাৎ সার্ভিসের সংখ্যা আরও কমেছে। পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই ধারা চললে কয়েক বছরের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
রেলপথে দেশের পণ্য পরিবহন বিপর্যয়ের মুখে। সম্প্রতি নথিপত্রে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রেলওয়ে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে কোনো ট্রেন পরিচালনা করতে পারেনি। একসময় ১৫০-২০০ কনটেইনার ট্রেন সার্ভিস নিয়মিত চললেও এখন তা কমে ৮০-৮৫টির মধ্যে। আগে প্রতি মাসে শতাধিক জ্বালানিবাহী ট্রেন চললেও এখন তা অর্ধেকে নেমেছে। নভেম্বরে (২৮ তারিখ পর্যন্ত) চলেছে মাত্র ২২টি ট্রেন। চলতি বছরের মার্চে ১১৫টি ও জুলাইয়ে ১০৯টি ট্রেন পরিচালনা করা হয়েছিল। খাদ্য, সার, পাথরসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন এখন নিয়মিত মাত্র পাঁচ-সাতটি ট্রেনে। সাম্প্রতিক কয়েক মাসে এই ধরনের কোনো ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি।
প্রকৌশল বিভাগ জানায়, পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য ১৯টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সরবরাহ কমে চার-পাঁচটিতে নেমেছে। যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য বরাদ্দ ইঞ্জিন সরিয়ে নেওয়ায় সার্ভিস আরও কমেছে। রেলওয়ে প্রশাসন তীব্র ইঞ্জিন সংকটের কারণে পণ্য খাতে সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ করছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করে ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, তবে কোনো সুফল দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও বহুবার কনটেইনার সার্ভিস বৃদ্ধি চেয়েছেন। কিন্তু রেলওয়ে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে পারছে না। এর ফলে কমলাপুর আইসিডিমুখী কনটেইনার সার্ভিস কমে ব্যবসায়ীরা নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে ২০১৭ সালে নির্মাণ শেষ হয়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ। চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাস্তবে তা হয়নি। এ সড়কে যানবাহনের চাপ সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি এবং বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ, ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নেই মহাসড়কটির দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাটবাজার ও বসতবাড়ি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ফলে নিয়মিত যানজট, সময় অপচয় এবং পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে।
সাধারণত ৫০ বা ১০০ বছরের চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল মাথায় রেখে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বৈশ্বিকভাবে এটিই অনুসরিত চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেকটাই এর ভিন্নতা দেখা যায়। এখানে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা ও পরিকল্পনাহীনতার ছাপ স্পষ্ট। কোনো প্রকল্পে নকশায়ই ভুল রয়ে যাচ্ছে, আবার কোনোটা বাস্তবায়ন শেষে ধরা পড়ছে নানা নির্মাণ ত্রুটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের ক্ষেত্রেও কিছু ত্রুটি থেকে যাওয়ার বিষয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক হলেও এ মহাসড়ক নির্মাণের সময় যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাফিক গ্রোথ (যানবাহন চলাচল)। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় মহাসড়কের ট্রাফিক গ্রোথ অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময় ডিজাইন ম্যানুয়েলে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ হারে। দুঃখজনকভাবে চালুর পরই চার লেনের মহাসড়কটিতে গাড়ির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে যানবাহনের চাপে এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় সড়কটি। প্রতিটি দেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন সব পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী মহাসড়ক নির্মাণের প্রকৌশলগত কৌশল একই। বড় কথা, আমাদের সামনে উন্নত দেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা সহজেই কাজে লাগানো যেত। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক চর্চাগুলো ঠিকমতো অনুসৃত না হওয়ায় শুরু থেকেই এর উপযোগিতা প্রশ্নের সম্মুখীন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যানজটের কারণে এ মহাসড়কে পণ্য পরিবহন ব্যয় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প, বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়ে। রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে। আর শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
২০২৩ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি সমীক্ষার কাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সমীক্ষায় মহাসড়কটি ছয় বা আট লেনে উন্নীত করার বিষয়টি উঠে আসে এবং এ কাজে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়। কিন্তু সমীক্ষার পর আর কোনো প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে বড় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে মহাসড়ক সম্প্রসারণে কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট। কারণ এটি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রেল ও নৌপথের কার্যকর ব্যবহার এবং কনটেইনার পরিবহনের বিকল্প রুট তৈরি না করা গেলে এ সড়কের ওপর চাপ কমানো কঠিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমাতে শুধু সড়কনির্ভর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা কনটেইনারের ৯৬ শতাংশই এ মহাসড়ক দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর রেলপথে মাত্র ৩ শতাংশ ও নৌপথে ১ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন আমাদের ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি। অথচ রেল ও নদীপথ তুলনামূলক সস্তা, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে সড়ককে অতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে রেল ও নদীপথকে অবহেলা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যৌথ উদ্যোগে ঢাকার কেরানীগঞ্জে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে আসা কনটেইনারের মালামাল নদীপথে পরিবহনের মাধ্যমে মহাসড়কের ওপর চাপ কমিয়ে আনা। এছাড়া ঢাকা ও আশপাশের শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় সাশ্রয় করে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে সহজতর করা, ছোট ছোট জাহাজে করে কনটেইনার পরিবহন করা, পরিবেশবান্ধব হিসেবে নদীপথে কনটেইনার পরিবহনকে জনপ্রিয় করে তোলা ও বন্দর সুবিধাকে আমদানি-রফতানিকারকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। কিন্তু ব্যবসায়ীদের পরিবেশবান্ধব এ পথ ব্যবহারে আগ্রহী করে তোলা যাচ্ছে না। ফলে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে নির্মিত কনটেইনার টার্মিনালটির সক্ষমতার বড় অংশই এখনো অব্যবহৃত থাকছে। এ অবস্থায় পণ্য পরিবহনে মহাসড়কে চাপ না কমায় প্রকল্পটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার (বি আই ডব্লিউ টি এ ) তথ্যানুসারে গত ২০১৮- ২০১৯ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন নৌ-রুটে ৩১ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করেছে, পাশাপাশি ৫৪৮৩৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যা ১০ বছর আগেও ছিল এর এক-তৃতীয়াংশ কম। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে প্রতিবছর যাত্রীসংখ্যা এবং পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বেড়েই চলছে, কমছে না।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রতিবছর যাত্রী চলাচল এবং পণ্য পরিবহন বাড়ার পেছনে বিআইডব্লিউটিএ সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মতৎপরতা এবং আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে দেশের বিভিন্ন রুটে যত যাত্রী চলাচল করেছে তার ১৬ ভাগ অভ্যন্তরীণ নৌ-রুট গুলিতে চলাচল করেছে, বাকি ৫৪ ভাগ সড়কপথে এবং ৩০ ভাগ রেলপথে চলাচল করছে। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে নৌ-রুটে চলাচল করেছে মোট যাত্রীর ১৫ ভাগ।
এরপরে বিস্ময়কর বিষয়টি হচ্ছে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই যাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র আট ভাগে, অর্থাৎ বলা যায়, প্রায় অর্ধেক ও পরিসংখ্যান অনুসারে এই বছরে সড়কপথে মানুষ চলাচল করেছে ৮৫ শতাংশেরও বেশি।
দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-রুট দেখাশোনা করে থাকে ‘বিআইডব্লিউটিসি’ নামক সংস্থাটি। তাদের দাবি, দেশের ভেতরে চলাচলকারী মোট যাত্রীদের ৪ ভাগের ১ ভাগ এবং পণ্যের অর্ধেকের বেশি পরিবহন করা হয় নৌপথে। এটা আমরা সবাই জানি যে, রেল অথবা সড়কপথে যাত্রী চলাচল কিংবা পণ্য পরিবহনে তুলনামূলকভাবে খরচ অনেক কম হয় জলপথে। তার পরেও নৌ-রুটগুলো নৌযান চলাচলে সচল রাখা এবং নদীর নাব্যতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং অর্থ বরাদ্দ ঠিকভাবে করা হয় না বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।
প্রকৃতপক্ষে নৌ-পরিবহনে নৌপথ সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বাজেটেই সাধারণত কম বরাদ্দ থাকে। গত অর্থবছরের বাজেটে পরিবহন খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা যার থেকে শুধু সড়ক পরিবহন খাতে ছিল ৬২ শতাংশ, রেলপথে ২৩ শতাংশ এবং আকাশপথে প্রায় ৭ শতাংশ ও পাশাপাশি নৌ-পরিবহন খাতে বরাদ্দ রাখা ছিল মাত্র ৬ শতাংশের কিছু বেশি অর্থ। বৈষম্যটা পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু এই বৈষম্য নিরসনে সাধারণত কখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না।
এতে পরিষ্কার দেখা যায়, বাজেটে সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দিলেও কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রেলপথ এবং নৌপথকে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেলপথ এবং নৌপথ অথচ আমরা সবাই জানি, নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীপথেই সম্ভবত বেশিরভাগ মানুষ চলাচল করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সাধারণ মানুষের ধারণা, সড়ক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপই হয়তো বা রেলপথ এবং নৌপথ এভাবে যুগের পর যুগ গুরুত্বহীন এবং অবহেলিত থাকার অন্যতম কারণ।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভৌগোলিক সুবিধার কারণেও আমাদের দেশের প্রায় সব নদ-নদীই পণ্য পরিবহন এবং যাত্রীবাহী জলযান চলাচল করার উপযোগী কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এদিকটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিরদিন অবহেলিত থেকে গেছে বলেই মনে হয়। এ থেকে উত্তরণ জরুরি। তা না হলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী র্অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমরা সবাই জানি, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়কপথের চেয়ে রেলপথ এবং নৌপথ অনেক সাশ্রয়ী ও এর পাশাপাশি আর যে বিষয়টি রয়েছে সেটি হলো দুর্ঘটনা এখন অর্থাৎ এই সময়ে শুধু নয়, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও দু-চারটা সড়ক দুর্ঘটনা না ঘটছে এবং তাতে হতাহত না হচ্ছে ও সে তুলনায় রেলপথ এবং নদীপথে চলাচলকারী যাত্রীদের জন্য অনেক নিরাপদ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কারণ যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়ক ও রেলপথের চেয়ে নৌপথ আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সহজ এবং সাশ্রয়ী।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান আরিফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
শুধু একটি মৃত্যুর খবর, নাকি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ?
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সস্তা জনপ্রিয়তার বিপরীতে সস্তা জনরোষের পথেই কী হাটতে চায় সরকার? মাত্র ১০/১৫ হাজার কোটি টাকার জন্য ওয়াদা খেলাফ করে বিদ্যুতের দাম আবার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির আগুনে আরো ঘি ঢালছে সরকার। জনভোগান্তির জুলুম থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে।
০৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না (৮)
০৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
১৯৯০ সালে কাঁচা চামড়া রফতানীর নিষিদ্ধ করণের প্রেক্ষাপট বর্তমানে নেই। এ মুহুর্তে কাঁচা চামড়া রফতানীর অনুমোদন বর্তমান সংকটকে অনেকটাই কমাতে পারে।
০৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
কুরবানী আসে-যায় মৌসুমী কসাইরা অরক্ষা আর অবহেলাতেই থেকে যায়। তাদের অনেকে আহত হয়, পঙ্গু হয়, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়- মৌসুমী কসাইদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্টপোষকতার পাশাপাশি ঈদুল আদ্বহায় বিশেষ স্বাস্থসেবা চালু করা দরকার।
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
‘দ্যা গ্রেট রিসেট’ ও নমরুদী মশার প্রতিশোধের এক চরম ইহুদী-নাসারায়ী নীলনকশা!
২৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বিদ্যুতের বিল বার বার বাড়ানো শোষক জমিদারি কায়দায় চক্র বৃদ্ধি হারে খাজনার চাবুক মারা অথচ বিদ্যুতে শুধু চুরি নয়, সব দিক থেকে সাগর চুরি হচ্ছে। সে চুরির ক্ষত পোষাতে জনগণের উপর খাজনা বৃদ্ধি করে চোরদের উৎসাহ ও প্রনোদনা এবং নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।
২৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সে যুগেও হুসাইন আহমদকে ইহুদীদের দালাল, হিন্দুদের কংগ্রেসের পা চাটা- গোলাম প্রচারণা করা হলেও থানভী গংরা তা বুঝতে পারলো কৈ? আজকে পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার মসজিদ ভাঙ্গা ও লাখ লাখ মুসলমানদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস, হিন্দুত্ববাদ গ্রহণে বাধ্য করার মত মহা জুলুমের মূলে হোসেন আহমদের সর্ব ভারতীয় জাতীয়বাদ।
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আকাশের অতন্দ্র প্রহরী: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও আবহাওয়া রাডার অবকাঠামোর মহাপরিকল্পনা কেন জরুরি? (১ম পর্ব)
২৩ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২৫) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কিন্তু গতকাল গুগল, ফেইসবুকে অসংখ্য আইডি থেকে প্রচারিত- ‘তারেক রমমান নারিকেল দ্বীপ (সেন্টমার্টিন দ্বীপ) আমেরিকাকে দিয়ে দিয়েছেন নারিকেল দ্বীপ এখন মার্কিন ঘাটি হবে’- ইত্যকার প্রচারণা দেশবাসীকে হতভম্ব করছে। সর্বপোরি সরকারের দলীয় বা প্রশাসনের তরফ থেকে এটাকে গুজব না বলায়- হতাশা চরম আকার ধারণ করেছে।
২২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বর্বর আম্রিকা আর সন্ত্রাসী ইসরাইলের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কিন্তু মুসলিম দেশ ইয়েমেন থেকে শুরু করে সোমালিয়া-লিবিয়া হতে সুদানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চালিয়ে রাখছে আরব-আমিরাত ভয়াবহ মানবেতর সংকটে সুদান, সহিংসতা-রোগ-দুর্ভিক্ষে দিশাহারা মানুষ সুদানের রক্তপাত বন্ধে মুসলিম বিশ্বকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে এক্ষুনি
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












