মাদরাসা শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই ছড়িয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো। বৃটিশ শাসনপূর্ব মুসলিম শাসনামলে শুধু বাংলাদেশেই ৮০ হাজার মক্তব যার প্রমান।
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (১ম পর্ব)
, ১৮ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৫ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৪ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২০ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইতিহাস
নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষীরা মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কটূক্তি করে বলে থাকে, মাদরাসায় নাকি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা হয়না। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থায় নাকি জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখানো হয়! এ অপপ্রচারে মাদরাসা নিয়ে অভিভাবক মহলে হীনমন্যতার প্রবেশ করে।
ইতিহাস সাক্ষী অতীতের সকল মুসলিম বিজ্ঞানী, জ্ঞানী-গুনী সবাই মক্তব-মাদরাসায় পড়াশোনা করেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। বেনিয়া বৃটিশ শাসনের পুর্বে মুসলিম শাসনামলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিলো মূল। যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা সম্পর্কে পড়ানো হত।
মুসলিম শাসনামলের অবদান:
মুসলিম শাসনামলের শুরু থেকেই মুসলমানরা বাদশাহ, সুলতান, নবাব এবং তাদের বড় রাজ কর্মচারীদের প্রদত্ত জায়গীর, আয়মা, আল তগমা, মদ মাশ প্রভৃত্তি লাখেরাজ সম্পত্তি (নিষ্কর সম্পত্তি যা ওয়াকফ করে দেয়া হতো) ভোগ করতেন। এসব সম্পত্তির আয় দ্বারা শুধু ভরনপোষনই নয়, অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, মুসাফির খানাসহ নানা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হতো।
মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “বাংলা ও বাঙালী: মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা” নামক বইয়ের ১৫৩ পৃষ্ঠায় বলা আছে- হযরত ওলী-আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ও আলেমদের প্রভাবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কল্যানে বাঙালী মুসলমানগণ অত্যন্ত উন্নত আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করতেন। ১৩ শতকের সুলতান রুকনউদ্দীন কায়কাউসের সময় ত্রিবেনীর মাদ্রাসায় উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি শিক্ষা সম্পর্কে সে যুগের মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে “তোমরা জ্ঞানার্জন করো, কেননা জ্ঞানার্জনই প্রকৃত আত্মনিবেদন, এর অনুসন্ধানই মুহব্বত এবং এর চর্চাতেই পরম গৌরব।
কেমন ছিলো শিক্ষা ব্যবস্থা?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সম্পর্কে ম্যাক্সমুলার উল্লেখ করেছে যে- “ইংরেজদের ক্ষমতা দখলকালে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তবের অস্তিত্ব ছিলো। প্রতি ৪০০ লোকের জন্য তখন একটি মাদরাসা ছিলো”। (সূত্র: মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা”, ৬০ পৃষ্ঠা)
মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “বাংলা ও বাঙালী: মুক্তি সংগ্রামের মুলধারা” নামক বইয়ের ১৫৪-১৫৫ পৃষ্ঠা বলা আছে- মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন হয়। উইলিয়াম এডাম এর ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। বাংলার শিক্ষার তৎকালীন অবস্থার উপর জরিপ চালিয়ে সে উল্লেখ করে যে “বাংলা ও বিহারে পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সের প্রতি ৩০০ জনের বেশি অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীর জন্য তখন একটি গ্রাম্য বিদ্যালয় ছিলো”। (উইলিয়াম এডামঃ শিক্ষা রিপোর্ট ১৮৩৫-৩৮, কলকাতা, ৬-৭ পৃষ্ঠা)
“এডাম এর এই রিপোর্ট প্রনয়নকালে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিধ্বস্থ ছিলো। মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত ছিলো। প্রাথমিক মক্তব ও পাঠশালার সংখ্যাও ছিলো অনেক বেশি। মুসলমানদের সামর্থ্য বেশি ছিলো বলে উনাদের মধ্যে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্তা চালু ছিলো”। (ডক্টর এম এ রহিম- বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২১৫ পৃষ্ঠা)
মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা খুবই সুলভ ছিলো। শিক্ষার পদ্ধতিও ছিলো যথেষ্ট উন্নত। মুসলিম শাসনামলের শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে এইচ জে রাওলিনসন লিখেছে- “মুঘল ভারতের উন্নততর শিক্ষা সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিমানে তাদের শিক্ষা পদ্ধতিরই ফসল। শিক্ষা দ্বীনি কর্তব্য হিসেবে পরিগনিত হতো। ধনী পিতা মাতার সন্তানকে ৪ বছর বয়সে কুরআন শরীফের একটি আয়াত উৎকীর্ণ করা পাথর বসানো শ্লেট দিয়ে একজন শিক্ষকের হাতে তুলে দেয়া হতো। আর গরীব পিতা মাতার সন্তানকে মৌলভী উনাদের দ্বারা পরিচালিত মক্তব বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো। প্রতিটি মসজিদের সাথেও একটি মক্তব ছিলো”। (এইচ জে রাওলিসন: রহফরধ-ধ ংযড়ৎঃ পঁষঃঁৎধষ যরংঃড়ৎু, ৩৭২ পৃষ্ঠা)
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম শাসনামলে পাঠ্য বিষয়রূপে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, দ্বীনতত্ত্ব, ফিক্বহ, আইনশাস্ত্র ও অন্যান্য দ্বীন ইসলামী বিষয়ের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, কৃষি, জ্যামিতি, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারী আইনকানুন, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, শাসন কৌশল, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করানো হতো।
ইউরোপীয় পর্যটক বার্নিয়ার ও মানুচি উল্লেখ করে যে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন ও রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলমানরা ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ এর পদ্ধতি অনুসরন করতেন।
উইলিয়াম এডাম এমনকি উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও বাংলার মাদরাসাগুলোতে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন চালু থাকতে দেখেছে। সে তার ১৮৩৫ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করে যে- “দ্বীন ইসলামী বিষয়াদি ছাড়াও প্রকৃতি বিষয়ক দর্শন এবং সাধারণ দর্শন শাস্ত্রের গ্রন্থাদির সাথে জ্যামিতি এবং জ্যোতিষশাস্ত্র মাদরাসাগুলোতে পড়ানো হতো”। (উইলিয়াম এডাম: শিক্ষা রিপোর্ট ১৮৩৫-৩৮, কলকাতা ৬-৭ পৃষ্ঠা)
হিন্দুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মুসলমানদের তৎকালীন মাদরাসাগুলির তুলনা করে উইলিয়াম এডাম লিখেছে- “এ দেশে মুসলমানদের অনুসৃত পাঠ্য পদ্ধতি হিন্দু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রচলিত পাঠ্য বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ও উদার ছিলো। এই পাঠ্যক্রম অনুসরন করে শিক্ষিত ব্যক্তিরা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতো”। (উইলিয়াম এডামঃ সেকেন্ড রিপোর্ট, ২৬-২৭ পৃষ্ঠা)
তৎকালে মুসলমানদের শিক্ষা সন্বন্ধে উইলিয়াম এ্যাডাম মন্তব্য করে, এ দেশে মুসলিমগণ বহু বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং উনারা শিক্ষাকে পেশা ও জীবিকা নির্বাহের উপায় বলে গ্রহণ করেননি। উনারা একে ন্যায় ও নেকীর কাজ বলে মনে করতেন। সে আমলে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা বাংলা ভাষার এবং উচ্চ শিক্ষা আরবী ও ফারসী ভাষার দেয়া হতো। কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর ভারতীয় মুসলিমগণ ফারসী ও উর্দুভাষা ব্যবহার করতেন। মুসলমান সমাজের অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে-মেয়েরা মসজিদে পবিত্র কুরআন শরীফ শিক্ষার সাথে এক বা একাধিক বিষয় যেমন বাংলা, গনিত, আরবী, ফারসী ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতেন। বিত্তশীল লোকেরা নিষ্কর জমি, ওয়াকফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি দান করে এ শিক্ষা ব্যবস্থা উৎসাহ দিতেন”। (হাসানূজ্জামান বিপুল, বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর যশোর)
-ডা. মুহম্মদ মারুফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (৩)
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (২)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (২)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (১)
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উসমানীয় গেরিলা বাহিনী ‘দেলিলার’
২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












