মাদরাসা শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই ছড়িয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো। বৃটিশ শাসনপূর্ব মুসলিম শাসনামলে শুধু বাংলাদেশেই ৮০ হাজার মক্তব যার প্রমান।
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (২য় পর্ব)
, ২১ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৮ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
যেভাবে মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে কথিত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছিলো:
১৮৩৭ সালে বর্বর বৃটিশ বেনিয়ারা অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ফার্সির স্থলে ইংরেজি চালু করে। অথচ বেনিয়া বৃটিশরা ক্ষমতা দখলের পরেও ৮০ বছর ফার্সী ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালু ছিলো। এর ফলাফল হলো এই, লক্ষ লক্ষ মুসলিম যারা সরকারী বিভিন্ন পজিশনে চাকুরী করতেন তারা বেকার হয়ে গেলেন, তাদের জীবনে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। ফার্সি ভাষা শেখার ব্যাপারেও আর আগ্রহ থাকলো না। ফলে ফার্সিতে রচিত বিপুল সংখ্যক সাহিত্য ভান্ডার থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমরা।
বছরের পর বছর, শতকের পর শতক ফার্সিতে যে সাহিত্য মুসলিম জ্ঞানী-গুনীজন তৈরি করেছিলেন তার সাথে বাংলার মুসলিমদের সংযোগ এক প্রকার হারিয়েই গেলো। জাতি হিসেবে মুসলমানদের এত বড় ক্ষতি মনে হয় আর কোনটাই নয়।
একই সাথে ১৭৭৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ মাধ্যমে লাখেরাজ সম্পত্তির (ওয়াকফ) মালিকানা বাদ দেয়ার ফলে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, মক্তব (যাদের খরচ নির্বাহ হতে এই সম্পত্তি থেকে) বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আরবী শিক্ষাও হয়ে পড়ে কষ্টকর। কেননা পূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য বেতনতো দিতেই হতো না বরং মোঘল আমলে ছাত্রদেরকে বৃত্তি দেয়া হতো। ধীরে ধীরে শিক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়ে মুসলিম সমাজে।
১৮৫৪ সালে Woods Despatch নামে একটি শিক্ষা কমিশন হয় বৃটিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে। নৌদস্যু, সন্ত্রাসী চার্লস উড ছিলো ভারত কন্ট্রোল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। তার রিপোর্টের প্রস্তাবনা অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার আদলে ভারতে শিক্ষা কাঠামো তৈরি হয়।
প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে এবং উচ্চশিক্ষা স্তরে কিভাবে কি পড়ানো হয় তার বিভাগ করে দেয়া হয়। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি এবং প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্থানীয় ভাষাকে গ্রহণ করা হয়। দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইঙ্গ-দেশীয় ভাষা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অনুমোদিত কলেজগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি অনুদান পেতে শুরু করে (Ali Riay, ২০১০).
এই প্রথম পশ্চিমা শিক্ষা (যাকে বলা হতো কথিত স্যাকুলার শিক্ষা) এবং দ্বীনি শিক্ষা আলাদা হয়ে গেলো। মাদরাসা শিক্ষাকে রাখা হলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে (নাউযুবিল্লাহ) আর কথিত স্যাকুলার শিক্ষায় সরকারী সাহায্য পেতে হলে ইংরেজি শিখতে হবে এমন শর্ত দিয়ে দেয়া হলো। এভাবে করে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা (যেখানে দ্বীন ও দুনিয়া দুটোরই সমন্বয় ছিলো) ও মাদরাসাগুলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধীরে ধীরে আরো সংকুচিত হয়ে পড়লো।
মোদ্দাকথা, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে বাস্তব অর্থে একটি হিন্দু রেনেসাঁস ঘটে যায় বাংলায়। দুঃখজনক হলো, এই হিন্দু রেনেসাঁস কে ‘বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁস’ বলা হয়ে থাকে (এম আর আখতার মুকুল, ১৯৮৭) এবং এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের বর্তমান ভাষা, সাহিত্য, কবিতা এমনকি পাঠ্যপুস্তক। নাউযুবিল্লাহ!
উপরোল্লিখিত ইতিহাসে সহজেই প্রমানিত যে ব্রিটিশ আমলের পূর্বে মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম সূতিকাগার। যে ইতিহাসকে বৃটিশরা হিন্দুদের সহযোগীতায় মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করেছিলো।
যার প্রেক্ষিতে তারা বীজ বপন করে দ্বীনহীন, জ্ঞান বিজ্ঞানবিহীন শিক্ষা ব্যবস্থার। যার রেশ এখনো মুসলমান বহন করছে। বর্তমান সিলেবাস বৃটিশদের আশা আকাঙ্খারই প্রতিফলন।
লক্ষ্য কি ছিলো?
এ সম্পর্কে অধ্যক্ষ মুহম্মদ আলমগীর রচিত ‘ইতিহাসের আলোকে আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য ও প্রকৃতি’ বইয়ের ৪৬ পৃষ্ঠায় বলা আছে-
“ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসেও দেখা যায় যে, ব্রিটিশ শাসকরা তদানী ভারতবর্ষকে ‘ইউরোপীয় করার জন্যে ইংরেজী সভ্যতার আলোকে ভারত শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছিলো। তারা ভারতের প্রচলিত নৈতিকতা, মানবতাসমৃদ্ধ উর্দু ও ফারসি ভাষাকে তুলে দিয়ে তদস্থলে ইংরেজি ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষায় অভিষিক্ত করে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি চালু করে সর্বত্র। ফলে সার্পের কথায় “(ভারতীয়রা) হবে এমন এক শ্রেণীর যারা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয়; কিন্তু রুচি, ভাবধারা, নীতি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ।” (Selection fro Educational Research Part 1, P. 23).
যার বাস্তব প্রতিফলন আজ কথিত মুসলিম সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আজকে কথিত মুসলমান রক্তে, বর্ণে মুসলমান কিন্তু কাজ-কর্মে, চাল-চলনে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে, পোশাক-আশাকে, শিক্ষা-দীক্ষায় সকল কিছুতে পশ্চিমাদের অনুসরণ-অনুকরণ করছে। নাউযুবিল্লাহ! যার মূলে রয়েছে বৃটিশ কর্তৃক প্রণীত কথিত সেক্যুলার নামক শিক্ষা ব্যবস্থা।
কথিত মুসলমান যদি নিজের মুসলমানিত্ব বজায় রাখতে চায় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার আন্দোলনে এগিয়ে আসতে নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস বাতিল করে দ্বীন ইসলাম ভিত্তিক সিলেবাস প্রনয়ন করতে হবে।
-ডাঃ মুহম্মদ মারুফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (৩)
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (২)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (২)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (১)
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উসমানীয় গেরিলা বাহিনী ‘দেলিলার’
২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












