ইতিহাস
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
, ২১ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৮ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
সময়টা তখন ১৪৯১ সাল। গ্রানাডার মুসলিম শাসনের সূর্য অস্তমিত প্রায়। দুর্বল এবং অযোগ্য মুসলিম শাসক থাকার সুযোগে তৃতীয়বারের মতো গ্রানাডা অবরোধ করেছে ক্যাস্টোলার শাসক পঞ্চম ফার্ডিন্যান্ড। এবার শেষবারের মতো অস্তিত্বরক্ষার লড়াইয়ে নামলো গ্রানাডার মুসলিমরা। গ্রানাডার মুসলিম যুবকরা সিদ্ধান্ত নিলো শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তারা খ্রিষ্টানবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবে।
এই যুবকদের নেতৃত্বে ছিলেন মুসা বিন আবী গাসসান নামক এক যুবক। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, খ্রিষ্টান শাসক জেনে রাখুক! আরবদের জন্মই হয়েছে বর্ষা নিক্ষেপ ও ঘোড়ায় আরোহনের জন্য। শত্রুদের বিলাসবহুল প্রাসাদে অবস্থান করার চাইতে তাদেরকে প্রতিরোধ করে গ্রানাডার কোনো ভাঙা দেয়ালের নিচে নিজের কবর নির্ধারণ করা আমার কাছে অধিক প্রিয়।
শুরু হলো যুবকদের প্রতিরোধ। এদিকে আল হামরা প্রাসাদে বসে ইতিপূর্বে করা নিজের ভুলের মাশুল দিচ্ছিলো দূর্বল শাসক সুলতান আবু আব্দুল্লাহ। টানা সাত মাস যুবকদের সাথে খ্রিষ্টান বাহিনীর লড়াই চলতে থাকে। ফার্ডিন্যান্ডের বাহিনী গ্রানাডার বাইরে থাকা গ্রামগুলোর উপর হামলা করে সব কয়টি গ্রাম দখল করে নেয়। শুধু ফাখখার নামক একটি গ্রাম তারা দখল করতে পারছিলো না। এই গ্রামের দখলকে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীর সাথে তাদের বেশ কয়েকটি লড়াই হয়। খ্রিষ্টানদের অনেক সেনা নিহত হয়। তবুও তারা গ্রামটির দখল নিতে পারছিলো না। মুসলমানরা কৌশলে খ্রিষ্টান শিবিরে গেরিলা হামলা চালাতে শুরু করলো।
অবরোধ ও প্রতিরোধও দীর্ঘ হয়ে ওঠে। মুসলমানদের সেনা সংখ্যাও কমতে থাকে। শীতের শুরুতে তীব্র তুষারপাত শুরু হয়। বন্ধ হয়ে যায় বাশারাহগামী সড়ক। ফলে বাহির থেকে গ্রানাডায় রসদ আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বেড়ে যায় দ্রব্যমূল্য। সুলতান আবু আব্দুল্লাহ তখন সব ছেড়ে নিজের পরিবারের নিরাপত্তার দিকে খেয়াল করতে শুরু করেন। অবরোধের শুরুতেই সুলতান ও তার চাটুকার আমীররা নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রানাডা থেকে পালাচ্ছিলো। গ্রানাডার পরিস্থিতি অনেক খারাপ হতে থাকে। তখন শহরের কিছু ব্যক্তি একত্রিত হয়ে সুলতানের কাছে গিয়ে তাকে আত্মসমর্পনের ঘৃণ্য আহ্বান জানায়।
আবু আব্দুল্লাহ কাপুরুষতার সহিত এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফার্ডিন্যান্ডের কাছে দূত পাঠায়। উভয়পক্ষের মধ্যে ৬৭টি চুক্তি হয়। চুক্তিগুলোর মধ্যে ছিলো- খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশ করবে না, মুসলমানদের আদালত ও বিচারকার্য শরীয়াহ অনুসারেই হবে, কোনো মুসলমানকে ধর্মান্তরিত করা যাবেনা, মুসলমানদের সম্পত্তির মালিকানা থাকবে মুসলমানদের হাতেই, খ্রিষ্টানরা মুসলমান হলে তাকে বাধা দেয়া যাবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই চুক্তির সংবাদ পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন মুসা বিন আবী গাসসান। তিনি তৎক্ষনাত সুলতানের প্রাসাদে উপস্থিত হয়ে সুলতান ও আমীরদের লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা কি নারী শিশুদের জন্য কান্না রেখে যাচ্ছেন? আমরা পুরুষ, আমাদের রয়েছে অন্তর, যা অশ্রু প্রবাহের জন্য নয়। বরং দুশমনদের রক্ত প্রবাহিত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। হায়! গ্রানাডার সম্ভ্রান্তরা আজ প্রতিরোধযুদ্ধে যেতে ভয় পাচ্ছে। এই বলে তিনি থামলেন। পুরো দরবারে পিনপতন নীরবতা।
তিনি আবার বললেন, আপনারা নিজেদের ধোঁকা দিবেন না। খ্রিষ্টানরা কখনই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। এই নগরীতে নেমে আসবে ধ্বংস, লুণ্ঠিত হবে আমাদের বসতবাড়ি, সম্ভ্রম হারাবে আমাদের মা-বোনরা। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বন্দীশালা, চাবুক ও জিঞ্জির। আজ যারা সৌভাগ্যের শাহাদাতকে ভয় করছে তারা শীঘ্রই এই নির্যাতনের মুখোমুখি হবে। আল্লাহ পাক উনার কসম! আমি কখনোই এসব প্রত্যক্ষ করবো না। কারণ আমি তোমাদের দলে নই।
এই বলে মুসা বিন আবী গাসসান দরবার ত্যাগ করলেন। তিনি বাড়িতে যান এবং অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসেন এবং একাই খ্রিষ্টানদের ১৫ জনের একটি দলের উপর আক্রমন করেন। এরপর অনেককেই জাহান্নামে পাঠিয়ে শাহাদাতবরণ করেন। উনার পুরো শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আর গ্রানাডারও পতন ঘটে। খ্রিষ্টানরা সকল চুক্তিই ভঙ্গ করে। ইতিহাস যার রক্তসাক্ষী।
-মুহম্মদ শাহজালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (৩)
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (২)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (২)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (১)
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উসমানীয় গেরিলা বাহিনী ‘দেলিলার’
২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (২য় পর্ব)
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












