স্থাপত্য-নিদর্শন
মুসলমানদের শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন ইসলামী মৃৎপাত্র (৩)
, ১৪ মুহররমুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১১ ছানী, ১৩৯৩ শামসী সন , ১০ জুলাই, ২০২৫ খ্রি:, ২৬ আষাঢ়, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) স্থাপত্য নিদর্শন
খোদাই অলঙ্করণ ও রঙ্গিন ঔজ্জ্বল্যের মৃৎপাত্র:
প্রাথমিক ইসলামী মৃন্ময়পাত্রের অলঙ্করণ সরু কাঠির মাধ্যমে খোদাই করে স্বচ্ছ ও ঔজ্জ্বল্য তামার প্রলেপ দিয়ে মোহনীয় করে তোলা হয়েছে। এরূপভাবে অলঙ্কৃত পাত্রাদি মৃৎপাত্র হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং এগুলোর বাণিজ্যিক সম্পূর্ণটাই সবুজ অথবা হালকা পীতবর্ণ যার ওপর ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে অন্যান্য রং। যেমন সবুজ ও পিঙ্গলবর্ণ অথবা হলদে-সবুজ এবং বেগুনে রং বিশেষ। এরূপ সহজতর খোদাই অলঙ্করণ বিভিন্ন কালপর্বে ও অনেক দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মৃৎপাত্র বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভাজিত হতে পারে। যার সর্বপ্রথম বিভাজন উমাইয়া কালপর্বে নির্ণীত হয়ে থাকে। মৃন্ময়পাত্রের বিশেষ প্রকরণ হলো রক্তিম মৃত্তিকার তৈরি বাটি যার খোদাইকৃত অলঙ্করণের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়। ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্ট পরিসরে কুফিক লিপিতে অনুলিখন। আর এগুলোর পটভূমি সাধারণত অনুরূপ অলঙ্করণ সারিতে সজ্জিত অথবা স্ক্রোল মটিফ দ্বারা পরিশোভিত। আর তা ঔজ্জ্বল্য ক্রিম বা ননী বর্ণের এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রান্ত সীমা সবুজ ব্যান্ড বা রেখা দ্বারা পরিবেষ্টিত। খোদাই অলঙ্করণের মৃৎপাত্র নবম ও দশম শতাব্দীর যা পূর্বাঞ্চলীয় নিশাপুর ও পার্শ্ববর্তী স্থানসমূহে তৈরি। উন্নতমানের গ্রাফিটো মৃৎপাত্র ইরানের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে মাজেন্দারান প্রদেশে লক্ষ্য করা যায়।
রঞ্জিত অলঙ্করণসহ মৃৎপাত্র মুসলমান কুম্ভকারগণ মৃৎপাত্রদির অলঙ্কার শিল্পের বিকাশ সাধন করেছেন স্বচ্ছ ঔজ্জ্বল্যের ওপর অথবা অস্পষ্ট ছায়ার উপকরণে পেইন্টিং বা রঞ্জিতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে সরু কাঠির ওপর পেইন্ট বা রং প্রয়োগ করা হয়েছে এবং এভাবে রং প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের মৃৎপাত্রাদি আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। অপরপক্ষে দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অস্পষ্ট উপাদানের ওপর নীল জাতীয় রং অথবা উজ্জ্বল রং প্রয়োগ করে মৃৎপাত্রাদির অলঙ্করণের শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয়েছে। মৃৎপাত্রের সুশোভিতকরণে এই সব প্রক্রিয়া অবলম্বনের মাধ্যমে বিশেষ করে মেসোপটেমিয়া ও ইরানের মুসলিম কুম্ভকারগণ এমন আকর্ষণীয় মৃৎপাত্রের বিকাশ ঘটিয়েছেন যা পরবর্তী সেলজুক যুগের মনোরম মৃৎপাত্রাদির নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
অনুজ্জ্বল রংসহ মৃৎপাত্র নিশাপুরে উৎখননের ফলে বিভিন্ন প্রকারের যেসব রঞ্জিত ইরানি মৃৎপাত্রের সন্ধান মিলেছে সেগুলোর সময়কাল অষ্টম শতাব্দীর শেষ থেকে দশম শতাব্দীর প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব মৃৎপাত্রের মধ্যে কোনো কোনোটার মিল রয়েছে সমরকন্দে প্রাপ্ত মৃন্ময়পাত্রের সাথে এবং অন্যগুলো নিশাপুরসহ সমগ্র খোরাসান প্রদেশে প্রাপ্ত মৃৎপাত্র হতে আলাদা রকমের। এক বা বহু রঙের সংমিশ্রণে রঞ্জিত নিশাপুরের মৃৎপাত্র আবার প্রকৃতিগত দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের। এসব প্রকারে যেসব অলঙ্করণশৈলী পরিদৃষ্ট হয় সেগুলোর মধ্যে সরল জ্যামিতিক রেখাচিত্র, কুফিক অনুলিখনের ব্যান্ড, প্যামেট ও এরাবেক্স স্ক্রোল, রোজেট বা গোলাপ ফুলসদৃশ সমন্বয়ে সৃষ্ট প্যাটার্ন বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
নিশাপুর মৃৎপাত্র হতে কিছুটা স্বতন্ত্র শ্রেণির মৃন্ময়পাত্রের অলঙ্করণে প্রত্যক্ষ করা যায়। এই জাতীয় মটিফ মৃৎবাটির অভ্যন্তর অংশের পুরাটার অলঙ্করণে ব্যবহৃত হয়েছে যা রাই হতে প্রাপ্ত কোনো কোনো ঔজ্জ্বল মৃৎপাত্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই শ্রেণিভুক্ত একটি অনন্য মৃৎবাটির উদাহরণ পেশ করা যায় যা প্রাথমিক ইসলামী কালপর্বের প্রদীপ্ত নিদর্শন হিসেবে গণ্য হতে পারে। পীতবর্ণের পটভূমিতে এই বাটির অভ্যন্তরাংশে গোলাপ সদৃশ মটিফ ও কুফিক অনুলিখন কালো ও সবুজ রঙে রঞ্জিত হয়ে পরিবেষ্টন করেছে। নিশাপুর মৃন্ময়পাত্রের আর একটি আকর্ষণীয় শ্রেণির অলঙ্করণে প্রত্যক্ষ করা যায় শুভ্র পটভূমির ওপর তামাটে অথবা গাঢ় বেগুনে রঙে শোভিত লিপিমালা।
এই লিপিমালা বাটির মধ্যস্থলে সমগ্র অংশে অথবা প্রান্তসীমায় উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। এসব মৃৎবাটি সাধারণত মজবুতভাবে তৈরি এবং সৌন্দর্যের দিক হতে নয়নাভিরাম। নিশাপুরের অন্য রকমের মৃন্ময়পাত্রের অলঙ্করণে কালোর সাথে লাল অথবা কেবলমাত্র লাল রং ব্যবহার করে তা দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে। এরূপ অলঙ্করণের অনেক চমৎকার মৃৎপাত্র আমেরিকার মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম ও ইরানের তেহরান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
এসব মৃন্ময়পাত্রের সংমিশ্রিত অলঙ্করণে লতাকুন্ড, কুফিক লিখনমালা ও গোলাকৃতির ক্ষুদ্র মেডেল বেগুনে, ইট-লাল ও জলপাই-সবুজ রঙে চিত্রিত করে উপস্থাপিত হয়েছে।
(অসমাপ্ত)
-মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৪র্থ পর্ব)
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৩য় পর্ব)
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান”
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (১ম পর্ব)
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (৩)
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (২)
১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইস্তাম্বুলে হযরত আবু আইয়ূব আল আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদ (১)
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
খেজুরের পাতায় লিখা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ
২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোঘল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ
২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল সাক্ষী সাতৈর শাহী মসজিদ (১)
০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণে মুসলমানদের অবদান
২৩ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মালয়েশিয়ার ঐতিহাসিক মসজিদ “মসজিদ নেগারা”
১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












