মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি একজন ক্রীতদাসীর ভক্তি
, ১৪ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০১ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ৩০ জুন, ২০২৬ খ্রি:, ১৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন তারুগান্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একদিন পবিত্র মক্কা শরীফ উনার এক বাজারে গিয়েছিলেন। দেখলেন, এক বৃদ্ধ এক ক্রীতদাসীকে বিক্রি করবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ক্রীতদাসীর শরীরের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, শরীর ভীষণ রোগা ও দূর্বল, কিন্তু চেহারা বেশ নূরানী। বৃদ্ধ লোকটি বলছে, সে বিশ দীনারের অধিক মূল্যে এই বাঁদীকে বিক্রি করবে এবং তার দোষ-ত্রুটির জন্য তাকে ফেরৎ দেয়া যাবেনা।
তখন হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বাঁদীর দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধ বললো, “এ বাঁদী পাগলিনী, সব সময় চিন্তায় নিশ্চুপ হয়ে থাকে। সারা রাত্রি ইবাদত করে, দিনে রোযা রাখে, কিন্তু পানাহার করে না। সর্বদা একা একা থাকতে পছন্দ করে।” একথা শুনে আগ্রহ সহকারে তিনি বৃদ্ধের দাবীকৃত মূল্যে বাঁদীকে ক্রয় করে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। বাঁদী তখন বললো, “হে আমার ছোট প্রভু! মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি কোথাকার বাসিন্দা?” তিনি বললেন, “আমি ইরাকের বাসিন্দা”, সে জিজ্ঞেস করলো, “কোন ইরাক? বসরার ইরাক না কুফার ইরাক?” তিনি বললেন, “বসরার ইরাক।”
তখন সে বললো, “আপনি সম্ভবতঃ বাগদাদের মদীনাতুস সালামে থাকেন?” তিনি স্বীকৃতিসূচক হ্যাঁ বললেন। বাঁদী তখন আনন্দিত হয়ে বললো, “বাহ! এ শহরটি তো যাহেদ এবং আবেদগণের শহর।” একথা শুনে হযরত ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং মনে মনে ভাবলেন বাঁদী তো অন্দরমহলের বাসিন্দা, সে কি করে যাহেদ এবং আবেদগণের খবর রাখে। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বুজুর্গানে দ্বীনের মধ্যে কাকে কাকে চেনো?” সে তখন হযরত মালেক ইবনে দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত বিশর হাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মারূফ কারখী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের এবং আরও কয়েকজনের নাম বললো।
আরও কিছু আলাপের পর হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হে বাঁদী! আমিই মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন।” বাঁদী তখন বললো, “আমি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আরজু করেছিলাম, যেন মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। আপনার যেই মধুর আওয়াজ দ্বারা মুরীদগণের দিল যিন্দা করতেন এবং শ্রোতাদের চোখে পানি ঝরাতেন, সেই মধুর আওয়াজ কই?
আপনার খোদার কসম, আপনি আমাকে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে শুনান।” তিনি তখন শুধুমাত্র “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” পড়লেন। এ শুনেই বাঁদী চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে পড়লো। চোখে মুখে পানি ছিটা দেবার পর কিছুক্ষণের মধ্যে হুঁশ ফিরে এলে বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! এ তো উনার নাম মাত্র। এ শুনেই আমি অজ্ঞান হলাম। আর যখন উনাকে আমি চিনতে পারবো এবং বেহেশতে দেখতে পাবো তখন আমার কি অবস্থা হবে?” এ বলে সে আরও কিছু তিলাওয়াতের জন্য অনুরোধ করলো। অতঃপর হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পাঠ করলেন, যার অর্থ- “যারা গুণাহের কাজ করছে, তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ঈমানদার ও নেককারদের সমান করবো? তাদের জীবন ও মৃত্যু একইরূপ? (কখনোই না)। কাফেররা যা বলে, তা খুবই মন্দ।” বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আমি কোন মূর্তিকেও পূঁজা করিনি।
অন্য কোন মাবুদকেও কবুল করিনি। পড়তে থাকুন। মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।” তিনি আরও পড়লেন, যার অর্থ- “আমি যালিমদের জন্য দোযখের আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, তাদের চতুর্স্পার্শ্বে আগুনের তাবু থাকবে। তারা পানি প্রার্থনা করলে, তাদেরকে তাম্রগলিত উত্তপ্ত পানির ন্যায় পানি দেয়া হবে; যা তাদের চেহারার চামড়া খসিয়ে ফেলবে। তাদের এ পান করাও মন্দ, তাদের বাসস্থানও নিকৃষ্ট।”
তিলাওয়াত শেষে বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি নিজের নফসকে নৈরাশ্যের মধ্যে রেখেছেন। অন্তঃকরণকে ভয় এবং আশার মধ্যস্থলে রেখে একটু আরাম দিন।” তারপর সে আরও কিছু পাঠ করার জন্য বললো। তিনি পড়লেন, অর্থাৎ “কতক চেহারা কিয়ামতের দিন আনন্দিত, হাসিমাখা এবং প্রফুল্ল হবে।” আরও পড়লেন, যার অর্থ- “কতক চেহারা সেদিন সতেজ, প্রফুল্ল, স্বীয় পরওয়ারদেগারকে দর্শকারী হবে।”
বাঁদী বললো, “আহা! উনার সাথে মিলিত হবার জন্য আমার মনে কত আগ্রহ, যেদিন তিনি স্বীয় বন্ধুবর্গকে দর্শন দেবার জন্য আত্মপ্রকাশ করবেন। আরও কিছু পড়ুন।” তিনি পড়লেন, অর্থ- “বেহেশতবাসীগণ, যারা অনন্তকাল স্থায়ী হবে, তাদেরকে প্রদক্ষিণ করবে বালকগণ, হাতে শরাবে মায়ীনের পেয়ালা, জগ এবং পানপাত্র নিয়ে। সে শরাব পানকারীদের মাথাও ঘুরবে না, তারা মাতালও হবে না।”
অতঃপর বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আমার মনে হয়, আপনি বেহেশতের হুরদিগকে মিলনের পয়গাম পাঠিয়েছেন। তবে তাদের মোহর আদায় করেছেন কি?” তিনি বললেন, “হে বাঁদী! তা কি জিনিস?” সে বললো, “রাত জেগে ইবাদত করা নিজের জন্য ওয়াজিব করে নিন, সর্বদা রোযা রাখুন, ফকীর মিসকীনদের মুহব্বত করুন।” অতঃপর বাঁদী বেহুঁশ হয়ে গেলেন। চোখে মুখে পানি ছিটা দেবার পর হুঁশ ফিরে এলে সে মুনাজাত করতে শুরু করলো। মুনাজাত করতে করতে সে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলো। এবার আর জ্ঞান ফিরে এলো না, সে মাশুকের সাথে মিলনের জন্য ইহকাল থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলো। হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তার মৃত্যুতে খুবই দুঃখিত হলেন। তার কাফন দাফনের ব্যবস্থার জন্য তিনি বাজারে গেলেন। ফিরে এসে দেখেন তার কাফন পড়ানো হয়ে গেছে, খুশবু লাগানো হয়েছে। তার দেহে দু’টি সবুজ রংয়ের বেহেশতী চাদরে ঢাকা। এতে দু’ছতরে দু’টো কথা লিখা আছে। প্রথমে লিখা আছে-
لااله الا الله محمد رسول الله صلي الله عليه وسلم
তারপর লিখা আছে-
الا ان اولياء الله لا خوف عليهم ولا هم يحزنون.
হযরত ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বন্ধুবর্গকে নিয়ে উনার জানাযা এবং দাফন শেষে সূরা ইয়াসীন পাঠ করে বাড়ী ফিরে এলেন।
বাড়ী ফিরে তিনি দু’রাকাত নামায পড়ে শুয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখলেন, সেই বাঁদী বেহেশতের মধ্যে, বেহেশতের চাদর পরিহিত অবস্থায় জাফরানের তখতের উপরে সমাসীন। তথায় রেশম ও মখমলের ফরাশ, মাথায় হীরা, জাওয়াহের মনিমুক্তা খচিত মুকুট, পায়ে লাল ইয়াকুতের জুতা, মেশক ও আম্বরের সুগন্ধি বেরুচ্ছে, চেহারা সূর্যের চেয়েও উজ্জল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে বাঁদী! কোন আমলের বরকতে আপনি এ মর্তবায় পৌঁছলেন?” তিনি জবাব দিলেন, “ফকীর ও মিসকীনদের মুহব্বত, অত্যাধিক ইস্তিগফার, আর মুসলমানদের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়ার বদৌলতে আজ আমাকে এ মর্তবা দেয়া হয়েছে।”
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আজকের নির্যাতিত-নিপীড়িত নিষ্পেষিত মুসলিম জনপদের দখল যেভাবে নিলো কুখ্যাত ইহুদী গোষ্ঠী
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার খলীফা মনোনীত হওয়ার সঠিক ইতিহাস
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
উসমানীয় সুলতানের কাছে ফিলিস্তিনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব!
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












