ইতিহাস
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (৩)
, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) ইতিহাস
স্থল, নৌ ও আকাশপথে মুসলমানদের ডাকব্যবস্থা:
স্থলপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা: মুসলমান সালতানাতগুলোতে স্থলপথে ডাকসেবা পরিচালনায় যারা দায়িত্ব পালন করতেন উনাদেরকে ফুয়ুজ বা সুআত নামে ডাকা হতো। বিরতিহীন ভ্রমণ ও নিরলস পরিশ্রমে উনারা ছিলেন সুপরিচিত। মুসলমানগণ সে যুগে ডাকসেবা পরিচালনায় ব্যাপকভাবে উট, ঘোড়া ব্যবহার করতেন। খচ্চরের প্রচলনও ছিলো উল্লেখযোগ্য হারে। স্থলপথে অবস্থিত সকল শহর ও পয়েন্টে ডাকবাহন ও দায়িত্বশীলদের জন্য পৃথক পৃথক বিশ্রামাগার থাকতো, সেখানে বাহনের খাবার ও বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হতো। প্রয়োজনে বাহন পাল্টে নতুন করে নেয়ার মতো অনেক ঘোড়া ও গাধা সবসময় সেখানে প্রস্তুত থাকতো।
ডাকব্যবস্থায় ‘শাহারা’ নামক একপ্রকার দ্রুতগামী ঘোড়া ও ‘নাজিব’ নামক একপ্রকার দ্রুতগামী উট ব্যবহার হতো, যা অন্যসব ঘোড়া ও উট থেকে তুলনামূলক ক্ষিপ্র ও পরিশ্রমী প্রকৃতির হতো।
নৌপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা: সমুদ্রপথে ডাক-যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো উন্নত ও অত্যাধুনিক সব নৌযান। উমাইয়াদের মধ্যে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সমুদ্রে আলকাতরার আবরণে তৈরি শক্ত কাঠ ও লোহার পেরেক দ্বারা নির্মিত দ্রুতগামী নৌযান পরিচালনা করেন ডাক পৌঁছানোর জন্য।
আকাশপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা: আকাশপথে ডাকব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হতো ডাক পায়রা। ক্ষুদেবার্তা আদান প্রদানের জন্য এটি ছিলো একটি কার্যকর ব্যবস্থা। বার্তাটি ডাক পায়রার পিঠে বা পালকের নীচে অথবা পায়ে বেঁধে দেয়া হতো। আর তা নিয়ে সে গন্তব্যের দিকে রওনা হতো। এ ধরণের পায়রাকে ডাকা হতো ‘হাদি’ নামে।
মুসলমানগণ শুধু স্থল ও নৌপথে ডাকসেবা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হননি বরং অপেক্ষাকৃত দ্রুত ও উন্নত ডাকব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প হাতে নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিলো ডাকপায়রা।
ডাকপথে ব্যবহৃত কবুতরের অনেক কদর ছিলো এবং সে সময় তা চড়া দামে বিক্রি হতো। বিশেষত বসরা নগরীতে মানুষ তা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তো। ডাক পায়রার জন্য সে সময় আলাদা মার্কেট ছিলো। এমনকি একটি পায়রার দাম ৭০০ দিনার পর্যন্ত উঠতো সেখানে। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শাসনামলে এবং উবাইদি ফাতেমিদের শাসনামলে এ ধরণের পায়রার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
সুদূর বসরা থেকে কায়রো পর্যন্ত এবং কায়রো থেকে দামেশক পর্যন্ত পায়রাযোগে পত্র আদান-প্রদানের রীতি চালু ছিলো। পায়রার বিরতি গ্রহণ ও অবতরণের জন্য তখন আলাদা উচু মিনার নির্মাণ করা হয়। মিনার থেকে মিনারে গমন করতে করতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট গন্তব্যের মিনারে এসে অবতরণ করতো ডাক পায়রা। দামেশকের মিনারগুলোতে মিশরের পায়রা রাখা হতো এবং মিশরের মিনারগুলোতে দামেশকের পায়রা রাখা হতো।
সাধারণত একবার পত্র প্রেরণের জন্য দুটি চিঠি ও দুটি পায়রা প্রস্তুত করা হতো। একটি ওড়ানোর প্রায় দুই ঘন্টা পর দ্বিতীয়টি ওড়ানো হতো। প্রথমটি পথ হারিয়ে ফেললে বা দুর্ঘটনায় মারা গেলে দ্বিতীয় পায়রাটি যেন গন্তব্যে পৌঁছে যায়। বৃষ্টির সময় বা বৈরি আবহাওয়ার সময় সাধারণত পত্র পাঠানো হতো না। পেটভরতি আহার না করিয়ে কখনো পায়রা ছাড়া হতো না।
পায়রাযোগে পাঠানো পত্রগুলো হতো অতি সংক্ষিপ্ত ও ইঙ্গিতবহ ভাষায় লেখা। এ ধরনের বার্তা যুদ্ধের সময় বেশি পাঠানো হতো। ছোট্ট হালকা কাগজে সংক্ষিপ্ত করে লিখে বৃষ্টি-বাদল বা ঝড় থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তা পায়রার পায়ে বা পালকের নীচে বেঁধে দেয়া হতো। আর তাতে লেখা হতো খুবই চিকন ও হালকা অক্ষরে।
এই ছিলো আকাশপথে পরিচালিত মুসলমানদের ব্যবহৃত ডাক ও যোগাযোগব্যবস্থা, যা স্থলীয় ডাকব্যবস্থা থেকে কোনো অংশে কম গুরুত্বের ছিলো না। (সমাপ্ত)
-মুহম্মদ শাহজালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (২)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (২)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (১)
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উসমানীয় গেরিলা বাহিনী ‘দেলিলার’
২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (২য় পর্ব)
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












