বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
, ১৭ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৮ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) ইতিহাস
সু-প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার এই ভূখন্ড অভাবনীয় সমৃদ্ধশীল একটি অঞ্চল ছিলো। যার কারণে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই অঞ্চলে আগমন করতো। বিশেষ করে তৎকালীন সময়ে যে সকল পর্যটক বাংলার এই অঞ্চলে আগমন করেছেন তাদের সবাই এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, মানুষ, মুসলিম শাসন, সমাজ ও সাংস্কৃতিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো ইতিহাসবিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার ‘আল রিহলা’ গ্রন্থে বাংলা নিয়ে বর্ণিত বর্ণনাগুলো।
ইবনে বতুতার প্রকৃত নাম শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ। ইবনে বতুতার আগমন ১৩৪৬ খ্রি:। তিনি সিংহল (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) ভ্রমণ করে জাহাজে করে ৪০ দিন পর তৎকালীন ‘সুনুদকাও’ বা চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেন। সে সময় পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গকে ‘বাঙ্গালাহ’ বলা হতো।
ইবনে বতুতার বাংলায় ভ্রমন সাধারণ কোনো ভ্রমন ছিলো না। বরং তার এ অঞ্চলে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো বিখ্যাত ওলীআল্লাহ হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছোহবতে আসা। উনার সাথে সাক্ষাত করা। এজন্য ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দরে নামার পরই হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সিলেটের অঞ্চলের দিকে রওয়ানা দেন। হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আগে থেকে এ বিষয়টি জানতেন। তাই তিনি উনার কিছু খাদিমকে পাঠালেন ইবনে বতুতাকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য। এরপর ইবনে বতুতা হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে সাক্ষাত করেন এবং কিছুদিন উনার ছোহবতে অতিবাহিত করার পর অনুমতি সাপেক্ষে উনার দরবার শরীফ থেকে বিদায় নেন। বিদায় নিয়ে নহর-উল-আজরক (মেঘনা নদী) দিয়ে ১৫ দিনের যাত্রা শেষে তিনি তৎকালীন সোনারগাঁ পৌঁছেন। তিনি তার ভ্রমণলিপিতে সোনারগাঁকে ‘সুনুরকাও’ নামে উল্লেখ করেছেন।
নদীপথের ভ্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নদীর দুইধারে ডানে ও বামে ছিলো বহু উদ্যানরাজি ও অসংখ্য গ্রাম, অনেকটা মিশরের নীল নদ পথের মতো। আমরা ১৫ দিন ধরে গ্রাম ও উদ্যানরাজির মধ্য দিয়ে নদীপথে চললাম, মনে হয়েছিলো যেন আমরা একটি বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।’ সোনারগাঁ ছিলো সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের অধীন তৎকালীন বাংলার রাজধানী এবং মুদ্রা তৈরির টাকশাল। সুলতান ফখরুদ্দিন অত্যন্ত নেককার এবং ইনসাফগার একজন ব্যক্তি ছিলেন বলে ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন।
সোনারগাঁওয়ের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতি সুদৃঢ় ছিলো বলে ইবনে বতুতা সোনারগাঁকে ‘দুর্ভেদ্য নগরী’ রূপে উল্লেখ করেন। সোনারগাঁকে দেখা যায় একটি প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধশীল শহর ও বন্দর রূপে, যেখানে বৈদেশিক বাণিজ্য পোতগুলো পণ্যদ্রব্যের জন্য আগমন করতো। ইবনে বতুতা বলেন, ‘সোনারগাঁয়ে আগমনের পর আমরা একটি চীন দেশীয় পালতোলা তলদেশ চ্যাপটা বাণিজ্য জাহাজ দেখতে পেলাম। জাহাজটি ইন্দোনেশিয়ার জাভা যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সোনারগাঁ থেকে জাভার দূরত্ব ৪০ দিন।
ইবনে বতুতা এ অঞ্চলে আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং দরবেশগণদের সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, সে সময় বাংলাদেশ সম্মানিত দ্বীন ইসলাম প্রচারের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বহু আউলিয়ায়ে কিরাম, দরবেশ, ফকির ও উলামা বাস করতেন। বাংলাদেশে তখন তাদের বেশ প্রতিপত্তি ছিলো। বাংলার সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ আউলিয়া কিরামগণদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। সাধারণ জনগণের কাছেও উনারা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সুফি দরবেশ উনাদের নানা প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। নৌকায় যাতায়াত করলে উনাদের ভাড়া দিতে হতো না, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হতো। উনারা কোনো শহরে প্রবেশ করলে অর্ধ দিনার দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হতো।
দ্বীনি পরিবেশের পাশাপাশি বাঙ্গালাহ অঞ্চলের সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অবস্থারও বর্ণনা দিয়েছেন ইবনে বতুতা। তিনি উনার গ্রন্থে লিখেছেন, সবুজে ঘেরা বিশাল এক দেশের নাম বাঙ্গালাহ। এখানে প্রচুর চাল পাওয়া যায় এবং অন্য সব জিনিস এত সস্তায় পাওয়া যায় যে, এ রকম আর অন্য কোনো দেশ দেখিনি। বাংলার সম্পদরাজি দেখে ইবনে বতুতা আশ্চর্য্য হয়েছিলেন। ইবনে বতুতার বর্ণনায় পাওয়া যায়, মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশে ৮টি বড়সড় মুরগি পাওয়া যেতো।
ইবনে বতুতা আরো জানান, সেই সময় সুতি কাপড় ছিলো বাংলার অন্যতম রফতানি পণ্য। সোনারগাঁও থেকে দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের দূত হিসেবে চীন যাওয়ার পথে ১৫ দিন পর উনার জাহাজ বারাহনাকার নামের স্থানে পৌঁছালে তিনি কিছু মুসলিম অধিবাসীর সন্ধান পান, যারা বাঙ্গালাহ থেকে উন্নত সুতিবস্ত্র এনে সেখানে বিক্রি করেন। এখান (সোনারগাঁও) থেকে প্রচুর পরিমাণে সুতিবস্ত্র বিদেশে যায় এবং প্রচুর চাল পুরো ভারত, সিংহল, পেগু, মালাক্কা, সুমাত্রা এবং অন্যান্য স্থানে পাঠানো হয়।
ইবনে বতুতা বাংলার গ্রামীণ জনপদের নৈসর্গিক রূপমাধুর্য, শ্যামল শোভা ও ফলশোভিত বৃক্ষরাজি হৃদয় মন দিয়ে উপভোগ করেন। নদী বক্ষ ও তটপ্রান্ত থেকে নগর জীবন অপেক্ষা পল্লী বাংলার জীবনধারাকে অধিকতর উপলব্ধি করার সুযোগ পান। প্রধানত নৌপথেই দেশের বাণিজ্য চলাচল হতো এবং নদীগুলোতে নৌযান শ্রেণিবদ্ধভাবে চলতো।
ইবনে বতুতা বলেন, ‘বঙ্গদেশের নদীতে অসংখ্য নৌকা চলাচল করে। যখন নৌকাগুলো পরস্পর অতিক্রম করে তখন ওই সব নৌকা থেকে একে অপরকে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে সম্মান বিনিময় করা হতো।
ইবনে বতুতা সারা পৃথিবী ভ্রমন শেষে তার জন্মভূমি মরক্কোতে ফেরার পর মরক্কোর সুলতান আবু ইনান ফারিস তার ভ্রমণ কাহিনীর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার জন্য একজন সচিব নিয়োগ করেছিলেন। এই ভ্রমণ কাহিনীর নাম রিহলা। ১৩৫৫ সালের ৯ ডিসেম্বর মৌখিক বর্ণনা শেষ হলে ‘রিহলা’ নামক বইটি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ইতিহাসের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। (সমাপ্ত)
-মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
শুধু স্পেন নয় ফিলিপাইনও ছিলো মুসলিম অধ্যুষিত, শাসিত বর্তমানে ফিলিপাইন হতে পারতো খ্রিস্টানের পরিবর্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ
২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর কারণ: জ্ঞান চর্চা থেকে দূরে সরে আসা (২)
২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (২)
২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












