ইতিহাস
ফ্রান্সের অব্যাহত লুটপাট! একটি সমৃদ্ধ জনপদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার না জানা ইতিহাস (২)
, ০৪ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৩ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ১০ বৈশাখ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) ইতিহাস
৩) মালি সাম্রাজ্যে! বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষের রাজ্য!
ঘানা সাম্রাজ্যের ধ্বংসের উপরই একসময় উৎপত্তি হয় মালি সাম্রাজ্যের। এই সাম্রাজ্যের বিখ্যাত শাসক ছিলেন দুইজন। একজন হলেন মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা “সুন্দিয়াতা”। যিনি ১২৩০ হতে ১২৫৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। অপর বিখ্যাত শাসক ছিলেন “মানস মুসা”।
মানস মুসা ১৩১২ সাল থেকে ১৩৩৭ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৫ বছর মালি সাম্রাজ্য তথা আজকের মালি, মৌরতানিয়া, সেনেগাল, নাইজারকে শাসন করেছিলেন। তিনি খুবই দ্বীনদার ছিলেন। তার আগের শাসকরা যেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় স্কলারের অপছন্দের ছিলেন, সে জায়গায় মানস মুসাকে ইসলামী স্কলাররা অনেক পছন্দ করতেন।
মানস মুসা সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়ে আছেন তার হজ্জ পালনের মধ্য দিয়ে। পশ্চিম আফ্রিকা হতে বালিময় বিস্তীর্ণ সাহারা পাড়ি দিয়ে তিনি মিশর পৌঁছান। এরপর মিশর হতে মক্কা শরীফে যায় তার বিশাল হজ্জ বহর। সুদীর্ঘ এই রওয়ানাপথে তিনি এতবেশি স্বর্ণ দান করেছিলেন যে, মিশরে এরপর কয়েক দশক স্বর্ণের দাম খুব কম ছিলো।
১৩২৪-২৫ সালে তার এই হজ্জব্রতের ঘটনা ঘটে। মক্কা শরীফ হতে ফিরে আসার সময় তিনি অনেক স্কলার ও স্থাপত্যবিদদের সাথে করে নিয়ে আনেন। এই সকল স্কলাররা মালিতে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটান। আর স্থাপত্যবিদরা শৈলীপূর্ণ স্থাপত্য নির্মাণ করেন। এই স্থাপত্যবিদরা সে সময় ৫টি অপূর্ব মসজিদ নির্মাণ করেন মালি সাম্রাজ্যের বুকে। এছাড়াও আরব হতে আসা স্কলাররা মালির প্রশাসনিক সিস্টেমকেও সুগঠিত করে তোলে।
মানস মুসা এই জ্ঞানী ব্যক্তিদের আনার মধ্য দিয়ে মালিতে ইসলামের ভিত মজবুত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ও মালিকে আরো সুগঠিত করতে সক্ষম হন। মানস মুসার সময়ে মালি কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে মিশর, তিউনিসিয়াসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সাথে। আর এভাবে মানস মুসা মালিকে পরিচিত করে তোলেন বিশ্বব্যাপী।
মালি সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে মালিতে ভ্রমণ করতে চসেন বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা। তার সময়ে শাসক ছিলেন মানস সুলায়মান (১৩৪১-৬০)।
ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ বিবরণীতে মালিকে একটি উনত ও সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনে বতুতা ছাড়াও আরো অনেক বিখ্যাত পরিব্রাজক ও স্কলাররা সে সময় মালিতে ভ্রমণ করতে ও জ্ঞান অর্জন করতে যেতো।
৪) কানেম বোর্নো সাম্রাজ্য:
বর্তমানে চাদ, ক্যামেরুন, নাইজার, নাইজেরিয়া ও সুদান জুড়ে বিস্তৃত ছিলো কানেম বোর্নো সাম্রাজ্য। কানেম নামক জায়গাটি বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকার চাদ নামক দেশের উত্তরে অবস্থিত। প্রখ্যাত মুসলিম মনীষী মুহম্মদ মানি দ্বারা এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটে।
উম্মে জিলানিই কানেম রাজ্যের প্রথম শাসক যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ১০৮৫ সাল থেকে ১০৯৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি খুব ধর্মপ্রাণ শাসক ছিলেন। হজ্জব্রত পালনের জন্য মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও যাত্রার মাঝপথে মিশরে এসে তিনি ইন্তেকাল করেন।
অবশ্য উম্মে জিলানির ইসলাম গ্রহণের আগেও কানেম রাজ্যের সাথে ইসলামের সংযোগ ছিলো। প্রখ্যাত আন্দালুসিয়ান ঐতিহাসিক আল বারকির মতে, অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে আব্বাসীয়দের হাতে উমাইয়া রাজবংশের পতন হলে কিছু সংখ্যক উমাইয়া বংশীয় লোক কানেম রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন।
কানেম রাজ্য ইসলামে অন্তর্ভুক্তি হওয়ার পরে রাজ্যটি মধ্য সুদান, আরব এবং মাগরিবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
প্রথম মুসলিম শাসক উম্মে জিলানির মৃত্যুর পর কানেম রাজ্যের ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র দুমামা-১ (১০৯২-১১৫০)। তিনি তার তৃতীয় হজ্জ যাত্রার সময় মিশরেই মারা যান তার পিতার মতো।
দুমামা-২ (১২২১-৫৯) এর রাজত্বের সময় কানেম রাজ্য তিউনিসে একটি দূতাবাস প্রতিষ্ঠা করে, এমনটাই বইয়ে উল্লেখ করেন বিখ্যাত আন্দালুসিয়ান ঐতিহাসিক ইবনে খালেদুন। এছাড়াও সে সময়ে কানেম রাজ্যটি মিশরে মাদরাসা ইবনে রাশিক নামে একটি কলেজ কাম হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিউতে (আলজেরিয়ান সাহারা) একটি দূতাবাস স্থাপন করা হয় কানেম রাজ্যের।
তেরো শতাব্দীর সময়ে কানেম রাজ্যটি ইসলামী জ্ঞান চর্চা ও সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। সে সময় মালি থেকে অনেক স্কলার কানেম রাজ্যে গমন করেন শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে। কানেম রাজ্যের তখনকার স্কলার ও কবিরা খুবই উচ্চমানের আরবী সাহিত্য রচনা করেন।
চৌদ্দ শতাব্দীতে কানেম রাজ্যের তার আগের ভূমি হারিয়ে নতুন জায়গায় গিয়ে রাজ্য গড়ে তোলে। যার রাজধানী স্থাপন করা হয় বোর্নোতে। রাজধানীটি স্থাপিত করেন কানেম (বোর্নো) রাজ্যের তৎকালীন সুলতান ‘আলী ডুমামা।’ ‘আলী গাজী’ নামে পরিচিত এই শাসক ১৪৭৬ থেকে ১৫০৩ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। যাইহোক বোর্নোতে স্থাপিত রাজধানীটি কানেম রাজ্যের (পরিবর্তিত বোর্নো রাজ্য) শেষদিন পর্যন্ত রাজধানী হিসেবেই ছিলো।
১৮১০ সালে মাই আহমদের পতনের সাথে সাথে কানেম ও বোর্নো সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। তবে শিক্ষাদীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কানেম এরপরেও স্কলারদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (৩)
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (২)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (২)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান (১)
৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উসমানীয় গেরিলা বাহিনী ‘দেলিলার’
২৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












