ইতিহাস
দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতন (২)
, ১৭ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৬ ছানী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ মে, ২০২৬ খ্রি:, ২৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
রাশিয়ায় বন্দী মুসলিম (খ):
মুসলমানদের নিমর্মভাবে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি রুশ নেতৃবৃন্দ। দ্বীন ইসলাম যাতে প্রচারিত এবং প্রসারিত না হতে পারে তার জন্য কয়েকটি ঘৃণ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করলো রাশিয়া। মসজিদ ও মাদরাসার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। প্রায় ৮ হাজার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া হয়। পবিত্র কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ উনাদের আইন এবং মুসলিম রীতিনীতি স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হল। হাজার হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। সারা দেশের ২৬ হাজার মসজিদের মধ্যে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত টিকে ছিলো মাত্র তেরশ মসজিদ। মসজিদগুলোর বেশিরভাগই এই কাফেরগুলি ব্যবহার করতো ক্লাব এবং পার্টির অফিস হিসেবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া জার্মানী দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই অবস্থায় মুসলমানদের সমর্থন লাভের জন্য সরকার মুসলমানদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো আপাততঃ ধ্বংস করা স্থগিত রাখে। ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে কয়েক লাখ মুসলিম সেনা জার্মানীর বিরুদ্ধে মরণপন লড়াই করে। মুসলমানদের সমর্থনকে ব্যবহার করে অবশেষে রাশিয়া জার্মানীর বিরুদ্ধে জয়ী হয়।
কিন্তু রাশিয়ার সরকার আবারও ১৯৫৩ সালে পুনরায় মুসলমানদের উপর শুরু করে আবারও পৈশাচিক নির্যাতন। নিকিতা ক্রুশ্চেভ মুসলমানদের হত্যাকার্য পুরোদমে চালালো। এ সময় মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং নেতৃবৃন্দকে আরেক দফা হত্যা করা হলো ঠান্ডা মাথায়। দ্বীন ইসলাম উনাকে আরেক ধাপ দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলো। অবশিষ্ট তেরশ মসজিদকে কমিয়ে বারশতে নামিয়ে আনা হলো। রাশিয়ার মুসলমানরা এক বিরাট ধ্বংসের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শুরু হলো, এক নব জাগরণ। বিপুল তৈল সম্পদ এবং এর অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ফুলে ফেঁপে সমৃদ্ধ হল উপসাগরীয় এবং আরব অঞ্চলের মুসলিম জনপদ। মুসলমানদের হাতে অর্থের ভান্ডার এসে গেল। ধূর্ত রাশিয়ার যালিম কম্যুনিষ্ট সরকার তার নীতিতে পরিবর্তন আনার কথা ভাবলো। মুসলিম দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো রাশিয়া। তাই আপাততঃ তার ইসলামবিদ্বেষী বীভৎস মূর্তিকে ঢেকে রাখার এক অপকৌশল আঁটলো সে।
ক্রুশ্চেভের পর রুশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির হাল ধরল ব্রেজনেভ। সে মুসলমানদের বন্ধু সাজবার চেষ্টা চালালো। সে ক্ষমতায় এসেই মুসলিম নিদর্শনগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা স্থগিত রাখল। শুধু তাই নয়। মুসলমানদের জন্য একটা নিরাপদ অবস্থান গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বের মুসলমান দেশের সরকার ও বিশ্ব মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টাও আঁটল। মুসলিম দেশগুলোর অর্থের ভান্ডার কুক্ষিগত করার জন্য সে কিছু কিছু মুসলিম নিদর্শন মেরামত করালো এবং কম্যুনিষ্ট নিয়ন্ত্রিত একটা পাতানো সীমিত পরিসরে ইসলামী কার্যক্রম চালু করার ব্যবস্থা করলো ব্রেজনেভ।
সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার নাস্তিক সরকার তার দীর্ঘ শাসনামলে মুসলমানদের প্রকৃত পরিচয়টুকু মুছে ফেলার জন্যও কম চেষ্টা করেনি। এজন্য মুসলমানদের কৃত্রিম জাতিতে ভাগ করারও প্রচেষ্টা চালানো হয়। বিভিন্ন মুসলিম গোত্রকে নতুন জাতি আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তি থেকে শুরু করে। এসব তথাকথিত জাতির মধ্যে নতুন জাতির বর্ণমালা এবং সাহিত্যেরও প্রচলন করা হয়।
মুসলমানদের উজবেক, তাজিক, তুর্কমেন, কাজাক, কিরমিজ এবং অন্যান্য জাতীয় হিসেবে পরিচিত করা হয়। ফলে বিপ্লবের আগে এরা নিজেদের মুসলমান বলে মনে করলেও এখন তারা নিজেদের কেউ উজবেক, কেউ তাজিক অথবা কেউ তুর্কমেন মনে করে থাকে। ফলে নিজেদের মুসলিম ঐতিহ্য হতে রাশিয়ার মুসলমানরা সত্তর বছর পর বহুদূর সরে পড়েছে।
রাশিয়ার মুসলমানরা যাতে তাদের জাতীয় চরিত্র হারিয়ে কম্যুনিষ্ট চরিত্রের সাথে মিশে যেতে পারে তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে রাশিয়ায়। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নাস্তিকরা মুসলমানদের সাথে টার্গেট ভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত উপায়ে কম্যুনিষ্টরা মুসলমানদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। এভাবে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা করেও রাশিয়ার মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলোপ করার অপচেষ্টা চালায় তারা।
তবে মধ্য এশিয়া, মধ্য ভোলগা এবং ককেশাসের মুসলমানরা নিজেদের মুসলিম চেতনাটুকু ভুলে যায়নি। তারা নিজেদের জীবনে একজন খাঁটি মুসলিমের বৈশিষ্ট্যগুলো ধরে রাখতে না পারলেও দ্বীন ইসলামের বেশ কিছু রীতিনীতি চালু আছে এদের মধ্যে।
রাশিয়ার নাস্তিক সরকার বাইরের দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কর্মকান্ড পরিচালনা করেছিলো। সরকার ইসলামী কার্যক্রমগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চারটি ডাইরেকটরেট চালু রেখেছে। বিদেশী পর্যটকদের দেখানোর জন্য এইসব ডাইরেকটরেট সরকারী কিছু নামাযীর ব্যবস্থা করে রাখে। ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাল্পনিক বর্ণনা দিয়ে সরকারী কিছু মৌলুভী রাশিয়ায় ইসলাম প্রচারের কাজ করছে বলে মুখে মুখে বলে বেড়াত। অথচ এরই অন্তরালে ইসলামী মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ বিনাশের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। (চলবে)
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
জাতিগত নির্মূলের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেকের জাগ্রত হওয়ার ডাক
০৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতন (১)
২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুঘল আমলের নিরাপত্তা নিদর্শন হাজীগঞ্জ দুর্গ
২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (৪র্থ পর্ব)
২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সম্মানিত শরীয়ত প্রতিপালনে খিলজী সালতানাতের কাজী মুগিসউদ্দিনের সাহসিকতা
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফ্রান্সের অব্যাহত লুটপাট! একটি সমৃদ্ধ জনপদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার না জানা ইতিহাস (২)
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি: কসতুনতুনিয়া (ইস্তানবুল) বিজয়ে যার অবদান অনস্বীকার্য
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (৯)
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও সঠিক ইতিহাস
১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ফ্রান্সের অব্যাহত লুটপাট! একটি সমৃদ্ধ জনপদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার না জানা ইতিহাস (১)
১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সোনার বাংলাকে যেভাবে লুটপাট করেছিলো ফিরিঙ্গি বেনিয়ারা (৩)
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
আব্বাসীয় সালতানাতের মুসলিম নৌশক্তি
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












