ইতিহাস
হযরত আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি: কসতুনতুনিয়া (ইস্তানবুল) বিজয়ে যার অবদান অনস্বীকার্য
, ০২ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২১ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ০৮ বৈশাখ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
ঐতিহাসিক কসতুনতুনিয়া অর্থাৎ ইস্তানবুল বিজয় করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন উসমানীয় সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহ রহমতুল্লাহি আলাইহি। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইস্তানবুল বিজয়ের যে ভবিষ্যৎবাণী মুবারক প্রদান করেছিলেন তার বাস্তবায়ন করেছিলেন সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহ রহমতুল্লাহি আলাইহি। আর উনার এই অসামান্য বিজয়ের পেছনে অন্যতম অবদান হলো উনারই সম্মানিত শায়েখ হযরত আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি।
উনার পুরো নাম মুহম্মদ শামসুদ্দীন ইবনে হামজা রহমতুল্লাহি আলাইহি। তবে তিনি ‘শায়েখ আক শামসুদ্দীন’ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, উনার সম্মানিত নসব মুবারক খলীফাতু রসূলিল্লাহ হযরত ছিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম উনার সাথে গিয়ে মিলে যায়। তিনি ১৩৮৯ সনে দামেস্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ হিফজ করেন। তিনি প্রথমে তুরস্কের আমাসিয়া প্রদেশ, এরপর আলেপ্পো এবং সর্বশেষ আঙ্কারায় অধ্যয়ন করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উসমানীয় যুগে সম্মানিত ইসলামী সভ্যতার একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। শরঈ ইলমের পাশাপাশি তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, জীববিজ্ঞান এবং উদ্ভিদতত্ত্বে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।
হযরত আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ উনার পুত্র মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধি গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি সুলতান মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ, ফিকহ এবং আরবী, ফার্সি, তুর্কিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় শিক্ষা প্রদান করেন। বিশেষ করে তিনি উনাকে যুদ্ধের আধুনিক রণকৌশল শিক্ষা দেন।
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তিনি উনার পুত্রকে প্রশাসন ও সরকারী ব্যবস্থা পরিচালনার প্রশিক্ষণস্বরূপ যখন মানিসা নগরীর প্রশাসকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, তখন আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথেই সেখানে চলে যান। এই সময়েই শায়েখ আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তরুন মুজাহিদ মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দীলে ইস্তানবুল বিজয়ের স্বপ্ন এঁকে দেন। তিনি বার বার মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পবিত্র হাদীছ শরীফ বার বার শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নিঃসন্দেহে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানে ইস্তানবুল) বিজিত হবে। এর আমীর হবে উত্তম আমীর, এবং সেই বাহিনী হবে উৎকৃষ্টতম সেনাবাহিনী”। সুবহানাল্লাহ!
সুলতান মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতার ইন্তেকালের পর উসমানীয় সালতানাতের শাসনক্ষমতায় আসেন এবং শৈশবে শায়েখ আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মনে যে স্বপ্ন গেঁথে দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি অবিলম্বে একটি শক্তিশালী ও দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন সেনাবাহিনী গঠনে উদ্যোগী হন এবং ইস্তানবুল বিজয়ে যাবতীয় পরিকল্পনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে ১৪৫৩ সালের ২৯ মে সকালে সুলতান মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতেই ইস্তানবুল বিজিত হয়। তখন সুলতানের বয়স ছিলো মাত্র ২১ বছর।
আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন সে সকল বুযূর্গ উনাদের একজন, যাকে সুলতান আল-ফাতিহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি অত্যাধিক মুহব্বত মুবারক করতেন। অভিভাবক বিবেচনা করতেন। শায়েখ আক শামসুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তৎকালীন আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের সংঘবদ্ধ একটি দল সাথে নিয়ে সুলতানের সাথে সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে অগ্রসর হন। শায়েখ উনার যাত্রা করার বিষয়টি ইস্তানবুল বিজয়ে প্রাণান্তকর প্রয়াসে সেনাবাহিনীকে সর্বাধিক উজ্জীবিত করেছিলো।
বিশেষত ইস্তানবুল অবরোধকালে উসমানীয় বাহিনীর উপর যে কঠিন ও হতাশাময় পরিস্থিতি আবর্তিত হয়েছিলো, সে সময় উলামাদের উপস্থিতি সেনাবাহিনীতে প্রচ- শক্তি যুগিয়েছিলো। অবরোধের বেশ কিছুদিন পরও কোনো সাফল্য না আসায় উনার কতিপয় মন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইস্তানবুল শহরের উপর থেকে অবরোধ তুলে বাহিনী ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে জোর দাবি জানান। সেসময় সুলতানের কাছে প্রেরিত শায়েখের অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও প্রেরণাদীপ্ত একটি পত্রের কল্যাণে সুলতান মুহম্মদ আল-ফাতিহ’র পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের চাপ অগ্রাহ্য করে সম্মুখ পানে এগিয়ে যাওয়া। চিঠিতে তিনি সুলতানকে কাফিরদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ মুবারক দিয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা মুনাফিকী শুরু করেছিলো তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার নির্দেশ মুবারক দিয়েছিলেন। তিনি চিঠিতে পবিত্র সূরা তওবা শরীফ উনার ৭৩ নং আয়াত শরীফ স্বরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। যে পবিত্র আয়াত শরীফ মুবারকে মহান আল্লাহ পাক তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কাফির এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার এবং কঠোর হওয়ার নির্দেশনা মুবারক দিয়েছিলেন। সুবহানাল্লাহ!
এভাবেই যুগে যুগ দ্বীন ইসলাম উনার বীর মুজাহিদগণ কোনো না কোনো হযরত শায়েখ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দিক নির্দেশনা মুবারকেই সাফল্যের চূড়ান্ত চূড়ায় আরোহন করেছিলেন।
-মুহম্মদ শাহজালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (১৪)
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (৩য় পর্ব)
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হযরত শায়েখ সাইয়্যিদ আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং নববী মুহব্বতের দৃষ্টান্ত
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ: অভিশপ্ত ইহুদী মনস্তত্ব বিশ্লেষণ
০২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা (৩)
২৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উসমানীয় সালতানাতে যেভাবে পবিত্র কুরবানীর ঈদ বিশেষভাবে উদযাপন করা হতো
২৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
কুরবানীবিরোধী ও মুসলিম বিদ্বেষী জালিম শাসক গৌরগোবিন্দের করুণ পরিণতি
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা (২)
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (২য় পর্ব)
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (৫ম পর্ব)
১৭ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
উসমানীয় শাসনের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আত্মত্যাগ এবং সিঙ্গাপুর গণহত্যার করুণ ইতিহাস
১৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
‘গরুর গোস্তে রোগ আছে’ এই সংক্রান্ত বাতিল হাদীছ ও তার খন্ডনমূলক জবাব
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












