জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও সঠিক ইতিহাস
, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) ইতিহাস
কায়িনাত জুড়ে রহমত-বরকতেপূর্ণ মুবারক স্থানসমূহের মধ্যে পবিত্র মদীনা শরীফ সর্বশীর্ষে। সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা পবিত্র মদীনা শরীফ উনার ইজ্জত-হুরমত বিনষ্টের অপচেষ্টা চালিয়েছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অতীব প্রয়োজন। সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি সম্মানিত খিলাফত উনার মুবারক দায়িত্ব গ্রহণ করতঃ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক ইজাযত নিয়ে রাজধানী পবিত্র মদীনা শরীফ হতে কুফায় স্থানান্তর করেন। কিন্তু এ বিষয়টি ইসলামবিদ্বেষীদের মনপুত হয়নি।
ইসলামবিদ্বেষী তথাকথিত ঐতিহাসিকরা বলে যে, সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ হতে রাজধানী স্থানান্তরিত করে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার গুরুত্ব তাৎপর্য বিনষ্ট করেছেন। নাউযুবিল্লাহ! তারা সঠিক ইতিহাসকে বিকৃত করতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ হতে রাজধানী সরিয়ে নেয়ায় পবিত্র মদীনা শরীফ উনার গুরুত্ব কোনোভাবেই হ্রাস পায়নি। বরং পবিত্র মদীনা শরীফ উনার নিরাপত্তা আরো সুসংহত হয়েছে। ইসলামবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের বাঁকা চোখ পবিত্র মদীনা শরীফ হতে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি নতুন রাজধানীতে তাশরীফ মুবারক রেখে শুরুতেই সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারকের সাথে জড়িতদেরকে গ্রেফতার করতে তদন্ত শুরু করেন। কুচক্রী মুনাফিকরা দেখলো যে- এখন তারা ধরা পড়ে যাবে। কাজেই যেকোনো মূল্যে এই কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে হবে। তাই তারা নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করলো।
উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি সেই বছর পবিত্র হজ্জ মুবারক করার জন্য পবিত্র মক্কা শরীফে গমন করেছিলেন। সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার মুবারক শাহাদাতে তিনি অত্যন্ত কষ্ট পান। তিনি যখন পবিত্র মক্কা শরীফ হতে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার পথ ধরলেন, তখন মুনাফিকরা উনার চতুষ্পাশে জমা হতে শুরু করলো। উনার মুবারক খিদমতে যত সব মিথ্যা প্রোপাগান্ডা শুরু করলো। তারা বললো, আপনি উম্মুল মু’মিনীন। আপনি সকলের মাতা। আপনি সকলের অভিভাবক। আপনি সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারক উনার বিচার অবশ্যই চেয়ে থাকেন। কিন্তু নতুন খলীফা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বিচার করতে চান না। বরং তিনি আসামীদেরকে প্রশ্রয় দেন। নাউযুবিল্লাহ! তাদের এসব মিথ্যা অপবাদ শুনে উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি সম্মানিত খলীফা উনার সাথে আলোচনা করার ইচ্ছা মুবারক পোষণ করেন। তাই তিনি কুফা অভিমুখে রওনা হন। মুনাফিকরা দেখলো- যদি উনারা দু’জন আলোচনায় একত্রিত হন, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে। তাই তারা আলোচনার পরিবর্তে যুদ্ধ বাঁধানোর অপচেষ্টা শুরু করলো। নাউযুবিল্লাহ!
মুনাফিকরা সম্মানিত খলীফা উনার বিরুদ্ধে লোক জমানো শুরু করলো। অপরদিকে খলীফা উনার নিকট সংবাদ পৌঁছানো হলো যে, উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি আপনার বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছেন। সংবাদ শুনে তিনি আশ্চর্যবোধ করলেন। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি অগ্রসর হলেন। বসরার নিকটবর্তী এক স্থানে সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার শিবির দেখা গেল। বিধায় অপরদিকে তিনিও শিবির স্থাপন করালেন। উনারা দু’জনই আলোচনায় একত্রিত হতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা বারবারই তা বাধাগ্রস্ত করলো। এভাবে দিন গিয়ে রাত এলো। গভীর রাতে দু’শিবিরের সকলেই ঘুমন্ত। কিন্তু মুনাফিকরা সজাগ। তারা দু’দলে বিভক্ত হয়ে অন্ধকারে দু’শিবিরে হামলা চালায়। শুরু হয়ে যায় হৈ হুল্লোড়, চিৎকার চেঁচামেচি। সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাকে বলা হলো যে, উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার লোকেরা হামলা চালিয়েছে। আবার উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাকে বলা হলো যে, সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার লোকেরা হামলা চালিয়েছে। শুরু হয়ে গেল ঘোরতর যুদ্ধ। কিন্তু উনারা দু’জনই এজন্য আফসুস করলেন। যুদ্ধ বন্ধের জন্য কৌশল অবলম্বন করতে লাগলেন।
ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি যুদ্ধ বন্ধের জন্য বারবার কৌশল অবলম্বন করেন। আর মুনাফিকরা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে অপচেষ্টা চালায়। পরিশেষে উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ সাইয়্যদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাকে বহনকারী উটের পা কেটে দিয়ে উনার হাওদা মুবারক সরিয়ে নিলে যুদ্ধ থেমে যায়। অত্যধিক তা’যীম তাকরীমের সহিত উনাকে পবিত্র মদীনা শরীফে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ যুদ্ধকে ইতিহাসে জঙ্গে জামাল হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মুনাফিকরা জঙ্গে জামালের মাধ্যমে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারক উনার বিচার বিঘিœত করার পাশাপাশি উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম এবং ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাদেরকেও শহীদ করার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়নি। তাই মুনাফিকরা ষড়যন্ত্রে আরো মরিয়া হয়ে উঠে।
খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার মুবারক খিলাফতকাল হতে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মুনাফিকরা তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য এবার সিরিয়ায় একত্রিত হতে থাকে। ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি আলোচনার জন্য এগিয়ে যান। অপরদিকে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনিও আলোচনার জন্য এগিয়ে আসেন। উনারা দু’জনই ফোরাত নদীর তীরে অবস্থান মুবারক গ্রহণ করেন। জঙ্গে জামালের অনুকরণে মুনাফিকরা আবারো যুদ্ধ বাঁধায়। মুনাফিকরা ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার লোকদের উপর রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে বলে যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার লোকেরা হামলা করেছে। অনুরূপভাবে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার লোকদের উপর হামলা চালিয়ে মুনাফিকরা বলে যে, ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার লোকেরা হামলা চালিয়েছে। আবারো শুরু হয় ঘোরতর যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ৭০ হাজার মুসলমান শহীদ হন। ইতিহাসে তা সিফফিনের যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত।
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার বিদ্বেষী তথাকথিত ঐতিহাসিকরা জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফীনকে কেন্দ্র করে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার বিরোধী মনোভাবকে কাগজে অঙ্কনের বেশ অপচেষ্টা চালিয়েছে। বাজারে প্রাপ্ত অধিকাংশ ইতিহাস বইতে একই কথা। উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম, ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম এবং কাতিবে ওহী হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের মুবারক শানের বিরোধী বক্তব্যে সেগুলো ভরপুর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উনাদেরকে দোষারোপ করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ! উনাদের সমালোচনা করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ!
মূলত, উনারা হচ্ছেন ঈমান। উনাদের মুহব্বত ঈমানের মূল। উনাদের ইতায়াত আমলের মূল। উনাদের রেযামন্দি মুবারক নাজাতের মূল। উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী এবং জাহান্নামী হওয়ার কারণ।
-আল্লামা আহমদ নুছাইর।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ফ্রান্সের অব্যাহত লুটপাট! একটি সমৃদ্ধ জনপদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার না জানা ইতিহাস (১)
১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সোনার বাংলাকে যেভাবে লুটপাট করেছিলো ফিরিঙ্গি বেনিয়ারা (৩)
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
আব্বাসীয় সালতানাতের মুসলিম নৌশক্তি
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকা বাগদাদ যেভাবে পিছিয়ে পড়লো
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (৭)
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ইতিহাসে ইহুদী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সোনার বাংলাকে যেভাবে লুটপাট করেছিলো ফিরিঙ্গি বেনিয়ারা (২)
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত ইলম অন্বেষনকারীদের উপর গায়েবী মদদের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা
২৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সোনার বাংলাকে যেভাবে লুটপাট করেছিলো ফিরিঙ্গি বেনিয়ারা (১)
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাসে মুসলমানদের অবিস্মরণীয় বিজয়সমূহ
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উসমানীয় আমলে পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস যেভাবে পালন করা হতো
১৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জানা আছে কি? আজকের সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা একসময় মুসলমানদের কর দিয়ে চলতো
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












