ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১১)
, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) আইন ও জিহাদ
জোট ভাঙ্গনের কারণ:
জোট বাহিনী পিছু হটার পর বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে মুসলমানরা বনু কুরাইজার মহল্লা অবরোধ করেন। অবরোধের মুখে বনু কুরাইজার নেতা কাব ইবনে আসাদ ইহুদীদের সামনে তিনটি প্রস্তাব রাখে। ১. পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ ২. সন্তানদের হত্যা করে নিজেরা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করা। ৩. সাবতি (শনিবার) আক্রমণ হবে না এই বিষয়ে মুসলমানরা নিশ্চিত ছিলেন বলে সেদিন ধোঁকা দিয়ে আক্রমণ করা। কিন্তু ইহুদীরা তিনটি প্রস্তাবের কোনোটিই গ্রহণ করেনি। ফলে কাব ইবনে আসাদ ক্ষুব্ধ হয়ে বলে, আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে একটি লোকও জন্মেনি, যে সারা জীবনে একটি রাতের জন্যও স্থির ও অবিচল সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। তার ফলে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
তারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট প্রস্তাব দেয় যাতে তাদের মিত্র আবু লুবাবাকে পরামর্শের জন্য পাঠানো হয়। আবু লুবাবা পৌঁছানোর পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তারা আত্মসমর্পণ করবে কিনা। আবু লুবাবা হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। তবে সেসময় বনু কুরাইজার শাস্তি নির্ধারিত না হলেও আবু লুবাবা হাত দিয়ে কন্ঠনালীর দিকে ইঙ্গিত করে মৃত্যুদ- হতে পারে জানান। কিন্তু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এরূপ নির্দেশ না দেওয়া সত্ত্বেও নিজ থেকে একথা জানানোর কারণে তিনি নিজেকে দোষী বিবেচনা করে মসজিদে নববী শরীফে গিয়ে খুটির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখেন। এই ঘটনার ছয়দিন পর আবু লুবাবা মুক্তি পান। ২৫ দিন অবরোধের পর শেষ পর্যন্ত বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর মুসলমানরা তাদের দুর্গ এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নেন। পুরুষদের সংখ্যা ছিলো ৪০০ থেকে ৯০০ জন। তাদেরকে বন্দী করে হযরত মুহম্মদ ইবনে মাসলামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। নারী এবং শিশুদেরকে পৃথকভাবে রাখা হয়।
ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকে বনু আউসের সাথে বনু কুরাইজার মিত্রতা ছিলো। বনু আউসের অনুরোধে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদের গোত্রের হযরত সা’দ ইবনে মুয়াজ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বনু কুরাইজার বিচারের জন্য নিযুক্ত করেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় হযরত সাদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আহত হয়েছিলেন। সেসময় তীরের আঘাতে উনার হাতের শিরা কেটে যায়। যুদ্ধাহত অবস্থায় উনাকে বিচারের জন্য নিয়ে আসা হয়। তিনি তাওরাতের আইন অনুযায়ী সমস্ত পুরুষকে হত্যা ও নারী এবং শিশুদেরকে বাঁদী হিসেবে বন্দী এবং সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।
ওল্ড টেস্টামেন্টের দ্বিতীয় বিবরণে বলা হয়েছে, যখন তোমরা কোনো শহর আক্রমণ করতে যাবে, তখন প্রথমে সেখানকার লোকদের শান্তির আবেদন জানাবে। যদি তারা তোমাদের প্রস্তাব স্বীকার করে এবং দরজা খুলে দেয়, তাহলে সেই শহরের সমস্ত লোকেরা তোমাদের ক্রীতদাসে পরিণত হবে এবং তোমাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু যদি শহরের লোকেরা তোমাদের শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসে তাহলে তোমরা অবশ্যই শহরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে। এবং যখন শহরটিকে অধিগ্রহণ করতে প্রভু তোমাদের ঈশ্বর তোমাদের সাহায্য করবে, তখন তোমরা অবশ্যই সেখানকার সমস্ত পুরুষদের হত্যা করবে। কিন্তু তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য স্ত্রীলোকদের, শিশুদের, গবাদিপশু ও শহরের যাবতীয় জিনিস নিতে পারো। তোমরা এই সমস্ত জিনিসগুলি ব্যবহার করতে পারো। প্রভু তোমাদের ঈশ্বর, তোমাদের এই জিনিসগুলি দিয়েছেন। (বাইবেল, ওল্ড টেস্টামেন্ট, দ্বিতীয় বিবরণ, ২০:১০-১৪)
বন্দীদেরকে বনু নাজ্জার গোত্রের নারী কাইস বিনতে হারিসার বাড়িতে রাখা হয়। তারপর মদীনা শরীফের বাজারে গর্ত খুড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ বন্দীর শিরচ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইজাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। ইতিপূর্বে বনু কুরাইজাকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বনু কুরাইজার ভাগ্য বরণের জন্য হুয়াই তাদের সাথে অবস্থান করছিলো। তার পোশাক যাতে কেউ নিতে না পারে সেজন্য সে বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র করে রেখেছিলো। তাকে নিয়ে আসার পর সে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উদ্দেশ্য করে বলে, আপনার সাথে শত্রুতার জন্য আমি নিজেকে নিন্দা করি না। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে যুদ্ধে সে পরাজিত হয়। তারপর লোকেদের সম্বোধন করে বলে, হে আমার সম্প্রদায়! মহান আল্লাহ পাক উনার ফায়সালায় কোনো অসুবিধা নেই। এটা ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি এমন হত্যাকা- যা বনী ইসরাইলের জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। তারপর হুয়াই বসে পড়ে ও তার শিরচ্ছেদ করা হয়।
পুরুষদের সাথে এক নারীকেও মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছিলো। এই নারী হযরত কাল্লাদ বিন সুয়াইদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার উপর যাতা ছুড়ে মেরে উনাকে শহীদ করেছিলো। বন্দী নারী এবং শিশুসহ যুদ্ধলব্ধ সব সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়। তবে মুসলমানদের অনুরোধে বেশ কয়েকজন ইহুদীকে ক্ষমা করা হয়। তাছাড়াও বনু কুরাইজার কিছু লোক পূর্বে দুর্গ ত্যাগ করে পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে। তাদেরকেও ক্ষমা করা হয়। (চলবে)
-আল্লামা মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৯ম পর্ব)
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৯)
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১০)
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
খরচ করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক উনার ফায়সালা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৮ম পর্ব)
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (৯)
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৮)
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (৮)
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উম্মাহর মাঝে শ্রেষ্ঠতম মর্যাদায় আসীন
১০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৭ম পর্ব)
১০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সকল কাফিররাই মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৭)
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












