ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১০)
, ১৩ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০২ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ১৯ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) আইন ও জিহাদ
বনূ কুরাইজার চুক্তি ভঙ্গ এবং মুসলমানদের
নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ:
চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত সা’দ বিন উবাদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের কাছে তাদের পরামর্শ চান। উনারা জানান যে, যদি এটি মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ মুবারক হয় তবে তাদের আপত্তি নেই কিন্তু যদি পবিত্র মদীনা শরীফবাসী উনাদের দূরাবস্থার কথা চিন্তা করে এই পদক্ষেপ নেয়া হয় তবে তার প্রয়োজন নেই।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জানান যে, সমগ্র আরব অস্ত্র ধারণ করেছে বলে তিনি তাদের জন্যই এই পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। ফলে প্রস্তাব অগ্রসর হয়নি। সে অবস্থায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে বনু গাতফানের নেতা ও জোটবাহিনীর কাছে হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সাক্ষাতের জন্য আসেন। ইতিপূর্বে তিনি গোপনে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি দায়িত্ব চাওয়ার পর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে বলেন, যাতে জোটের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে অবরোধ সমাপ্ত করা হয়।
হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি এরপর একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেন। সম্মানিত দ্বীন ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উনার সাথে বনু কুরাইজার সুসম্পর্ক ছিলো। তাই তিনি প্রথমে বনু কুরাইজার কাছে যান এবং জোটের বাকিদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের সতর্ক করেন। তিনি তাদের বলেন বনু কুরাইজার সাথে কুরাইশ ও গাতফানের পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। এখানে দুই গোত্রের ঘরবাড়ী, সহায়-সম্পদ বলতে কিছু নেই। তারা তাদের স্বার্থ দেখলে গ্রহণ করবে আর না দেখলে চলে যাবে। কিন্তু এই এলাকা বনু কুরাইজার নিজস্ব যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন তাদেরকে এখানেই থাকতে হবে এবং যদি তারা মুসলমানদের শত্রুর সাথে হাত মেলায় তবে অবশ্যই মুসলমানরা এর প্রতিশোধ নেবে। এই কথা শোনার পর বনু কুরাইজা ভীত হয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চায়।
হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মত দেন, যতক্ষণ কুরাইশদের মধ্য থেকে কিছু লোককে জামিন হিসেবে বনু কুরাইজার জিম্মায় না দেওয়া হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত যাতে তাদের সহায়তা করা না হয়। তারপর হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি কুরাইশদের শিবিরে যান। তিনি বলেন, ইহুদীরা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে লজ্জিত। তাই তারা কুরাইশদের কিছু লোককে জামিন হিসেবে গ্রহণ করে মুসলমানদের কাছে সমর্পণ করতে চায় যাতে অঙ্গীকার ভঙ্গের ক্ষতি পূরণ হয়। তাই ইহুদীরা যদি জামিন হিসেবে কিছু লোক চায় তবে তা যাতে মেনে নেওয়া না হয়। হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একইভাবে বনু গাতফানের কাছে গিয়ে একই বার্তা দেন।
জোট ভাঙ্গনের কারণ:
হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়। আলোচনার পর কুরাইশ নেতারা বনু কুরাইজার নিকট বার্তা পাঠিয়ে জানায় যে, তাদের নিজেদের অবস্থা প্রতিকূল। উট এবং ঘোড়াগুলিও মারা যাচ্ছে। তাই যাতে দক্ষিণ দিক থেকে বনু কুরাইজা এবং উত্তর দিক থেকে জোট বাহিনী আক্রমণ করে। কিন্তু সেসময় সাবতি (শনিবার ছিলো) বিধায় ইহুদীরা জানায় যে, এই দিনে কাজ করা তাদের ধর্মবিরুদ্ধ এবং ইতিপূর্বে তাদের পূর্বপুরুষদের যারা এই নির্দেশ অমান্য করেছিলো তাদের ভয়াবহ পরিণতি হয়।
তাছাড়া কুরাইশ পক্ষের কিছু লোককে জামিন হিসেবে বনু কুরাইজার জিম্মায় না দেওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধে অংশ নেবে না। তার ফলে কুরাইশ ও গাতফানরা হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কথার সত্যতা পায় এবং জামিন হিসেবে লোক প্রেরণের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ফলে কুরাইশ এবং গাতফানের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে কুরাইজাও হযরত নুয়াইম ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কথার সত্যতা পেয়ে শঙ্কিত হয়। ফলে জোটে ভাঙ্গন ধরে যায়।
জোট বাহিনীর রসদ ফুরিয়ে আসছিলো। ক্ষুধা ও আঘাতের কারণে ঘোড়া ও উটগুলি মারা পড়ছিলো। শীতও খুব তীব্র আকার ধারণ করে। প্রচন্ড বায়ুপ্রবাহের ফলে আক্রমণকারী বাহিনীর তাবু উপড়ে যায় এবং সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। রাতের বেলা জোট বাহিনী পিছু হটে, ফলে পরের দিন সকালে যুদ্ধক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে যায়। পরের দিন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মদীনা শরীফে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তিনি বলেছিলেন, এখন থেকে আমরাই তাদের উপর আক্রমণ করবো, তারা আমাদের উপর আক্রমণ করবে না। এখন আমাদের সৈন্যরা তাদের দিকে যাবে।”
এই ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মাঝে এসেছে-
عن حضرت سُلَيْمَانَ بْنَ صُرَدٍ رضى الله تعالى عنه يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ حِينَ أَجْلَى الأَحْزَابُ عَنْهُ "الآنَ نَغْزُوهُمْ وَلاَ يَغْزُونَنَا، نَحْنُ نَسِيرُ إِلَيْهِمْ-
হযরত সুলায়মান ইবনে সুরাদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনী পবিত্র মদীনা শরীফ ছেড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে আমি বলতে শুনেছি যে, এখন থেকে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো। তারা আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে পারবে না। আর আমরা তাদের এলাকায় গিয়েই আক্রমণ করবো। (মিনহাজুল কুরআনুল কারীম ফী দাওয়াতিল মুশরিকীন ইলাল ইসলাম-২/৮৩৭, তাফসীরে মাযহারী-৭/৩০৫ পবিত্র বুখারী শরীফ,হাদীছ শরীফ নং-৩৮১০)
-আল্লামা মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৮)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (২৫ তম পর্ব)
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৭)
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (২৪ তম পর্ব)
১৮ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৬)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (২৩ তম পর্ব)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৫)
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (২২ তম পর্ব)
২৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৪)
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (২১ তম পর্ব)
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (২৩)
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












