গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৯)
, ১৭ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৬ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) আইন ও জিহাদ
সন্ধিচুক্তি এবং সন্ধির শর্তসমূহ:
(হযরত সুহাইল বিন ‘আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি তখনও পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেননি, পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের পর উনি পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেন।)
উনাকে প্রেরণের সময় কুরাইশরা এ পরামর্শ দিলো যে, সন্ধিচুক্তিতে অবশ্যই এ চুক্তিটি উল্লেখিত হবে যে, এ বছর পবিত্র ওমরাহ পালন না করেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে পবিত্র মদীনা শরীফে প্রত্যাবর্তন করবেন, যাতে পবিত্র মক্কা শরীফ উনার লোকেরা এমন চিন্তার অবকাশ না পায় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জোর জবরদস্তি করে আমাদের শহরে প্রবেশ করেছেন।
কুরাইশগণের নিকট হতে এ সকল নির্দেশ সহকারে হযরত সুহাইল বিন ‘আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট উপস্থিত হলেন। হযরত সুহাইল বিন ‘আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে আসতে দেখে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে বললেন-
قَدْ سَهَّلَ لَكُمْ أَمْرَكُمْ
‘তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ করে দেয়া হয়েছে। হযরত সুহাইল বিন ‘আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, কুরাইশগণ সন্ধি চাচ্ছে।’
হযরত সুহাইল বিন ‘আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট আগমনের পর উনারা বহুক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলেন এবং অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তির শর্তসমূহ স্থির করা হলো। চুক্তির শর্তসমূহ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ:
১. ১০ বছর পবিত্র মক্কা শরীফ উনার কুরাইশ ও মুসলমানদের মাঝে যে কোনো ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকবে।
২. মুসলমানরা এ বছর পবিত্র ওমরাহ মুবারক পালন না করেই পবিত্র মদীনা শরীফ এ ফিরে যাবেন। মুসলমানরা চাইলে আগামী বছর পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য আসবেন, তবে তিন দিনের বেশি পবিত্র মক্কা শরীফ এ অবস্থান করতে পারবেন না। পবিত্র মক্কা শরীফে মুসলমানদের অবস্থানের সময় পবিত্র মক্কাবাসীরা অন্যত্র আশ্রয় নেবে।
৩. মুসলমানরা আত্মরক্ষার জন্য শুধুমাত্র কোষবদ্ধ তরবারি আনতে পারবেন। এছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবেন না।
৪. এ সন্ধি সূত্রের ভিত্তিতে আরবের যে কোন গোত্র নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে বা কুরাইশদের সাথে সন্ধি সূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
৫. সন্ধির মেয়াদকালে জনগণের পূর্ণ নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। কেউ কারো ক্ষতি সাধন করবে না, আক্রমণ বা লুণ্ঠন করবে না।
৬. কোনো মক্কাবাসী পবিত্র মদীনা শরীফে আশ্রয় গ্রহণ করলে মুসলমানরা তাকে আশ্রয় দিতে পারবেন না। পক্ষান্তরে কোনো মুসলমান পবিত্র মদীনা শরীফ থেকে পবিত্র মক্কা শরীফ আগমন করলে পবিত্র মক্কাবাসী তাকে প্রত্যার্পণ করতে বাধ্য থাকবে না।
৭. হজ্জের সময় কুরাইশরা মুসলমানদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করবে। বিনিময়ে পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বণিকরা নিরাপদে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার পথে সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশে বাণিজ্য করতে পারবে।
৮. অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন নাবালক মুসলমানদের সাথে যোগ দিতে পারবেন না।
৯. এ সন্ধি চুক্তি ১০ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে।
১০. সন্ধির শর্তাবলি উভয়পক্ষকেই পরিপূর্ণভাবে পালন করতে হবে।
সন্ধিচুক্তি এবং সন্ধির শর্তসমূহ নির্ধারিত হওয়ার পর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাকে সন্ধির শর্তগুলো লিপিবদ্ধ করার জন্য নির্দেশ মুবারক দিলেন। তিনি বললেন লিখুন-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيْمِ
এর পরিপ্রেক্ষিতে কুরাইশদের পক্ষ থেকে হযরত সুহাইল ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, ‘রহমান’ বলতে যে কি বুঝায় আমরা তা জানি না। আপনি এভাবে লিখুন, ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ (আয় মহান আল্লাহ পাক আপনার নামে)। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাকে সেভাবেই লিখতে নির্দেশ মুবারক দিলেন এবং তিনি সেভাবেই তা লিখলেন।
অতঃপর মুবারক নির্দেশে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি লিখলেন-
هٰذَا مَا صَالَحَ عَلَيْهِ سَيِّدُنَا مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
“এগুলো হচ্ছে সেসব কথা যার উপর ভিত্তি করে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সন্ধি করলেন।”
এ কথার প্রেক্ষিতে হযরত সুহাইল ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, ‘আমরা যদি মানতাম যে, আপনি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাহলে আমরা আপনাকে মহান আল্লাহ পাক উনার ঘর হতে বিরত রাখতাম না এবং আপনার সঙ্গে যুদ্ধও করতাম না। কাজেই আপনি লিখুন, ‘মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ।’ আলাইহিমাস ছলাতু ওয়াস সালাম। (চলবে)
-মুহম্মদ নাজমুল হুদা ফরাজী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (১০)
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
খরচ করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক উনার ফায়সালা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৮ম পর্ব)
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (৯)
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৮)
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (৮)
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উম্মাহর মাঝে শ্রেষ্ঠতম মর্যাদায় আসীন
১০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সম্মানিত উহুদ উনার পরিচয়: (৭ম পর্ব)
১০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সকল কাফিররাই মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (৭)
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পবিত্র ফাতহে মক্কা অর্থাৎ পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয় দিবস
০৭ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ঐতিহাসিক সম্মানিত খন্দকের জিহাদ (৭)
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












