উমাইয়া আমলের মুসলিম স্থাপত্য ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’
, ২৭ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৪ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৩ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) স্থাপত্য নিদর্শন
জর্দানের রাজধানী আম্মানের প্রায় পঞ্চাশ মাইল পূর্বে “কুসাইর আমরা দুর্গ” নামক ঐতিহাসিক একটি মুসলিম ইমারত স্থাপত্য অবস্থিত। ৭১১-৭১৪ খৃ: উমাইয়া শাসক আল ওয়ালিদের সময় জর্দানের রাজধানী আম্মানের প্রায় ৫০ মাইল পূর্বে ওয়াদি বাতুম নামক স্থানে “কুসাইর আমরা দুর্গটি” নির্মিত হয়। কুসাইর আমরা ছিলো উমাইয়া শাসকদের দ্বারা নির্মিত প্রথম জাগতিক স্থাপত্যের নির্দশন।
ভূমি নকশা ও গঠন:
‘কুসাইর আমরা’ অন্যান্য উমাইয়া স্থাপনার তুলনায় সুরক্ষিত। এটি সামান্য লোহিতাভ চুনা পাথরে নির্মিত এবং দুইটি সংবদ্ধ অংশে বিভক্ত। পশ্চিমদিকের আয়তাকার অংশটি হলো কক্ষ এবং বিশ্রাম কক্ষের জন্য নির্মিত, আর পূর্বদিকের যৌগিক অংশটি অবগাহনের (নিরাশয়ের) নিমিত্তে তৈরী। শেষোক্ত নিরাশয়ের অংশটির জন্যই ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’ সাধারণভাবে একটি হাম্মামখানা হিসাবে সমধিক পরিচিত।
আবিষ্কার:
যদিও সপ্তদশ শতাব্দী হতে বিভিন্ন ভ্রমণ কাহিনীতে ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’র উল্লেখ পাওয়া যায় তথাপি প্রতœতত্ত্বের দিক হতে আলোইস নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমেই এটি আবিস্কৃত হয়। সে ব্যক্তি এর প্রথম সন্ধান পায় ১৮৯৮ খৃ:। ১৯০০ থেকে ১৯০১ খৃ: সে এই দুর্গটি পরিদর্শন করে।
স্থাপত্যগত বর্ণনা:
লোহিতাভ চুনাপাথরে নির্মিত ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’ অন্যান্য উমাইয়া স্থাপত্যর তুলনায় অনেকটাই সুরক্ষিত। উত্তর দেওয়ালের মধ্যাংশে দুর্গটির প্রবেশ পথ। প্রবেশ পথ বরাবর কক্ষের দক্ষিণে ক্ষুদ্রাকৃতি একটি আয়তাকার খাস কামরা রয়েছে। দূর্গের হলটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ২৪ ফুট (৭.৫০মিটার) এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৮ ফুট (৮.৫০ মিটার)। উত্তর দেওয়ালের মধ্যাংশে রয়েছে এর প্রবেশপথ। প্রবেশ পথ বরাবর কক্ষের দক্ষিণে ক্ষুদ্রাকৃতি একটি আয়াতাকার খাস দেয়াল রয়েছে যেটার উচ্চতা কনুই পর্যন্ত।
এই আয়তাকৃতিতে বেষ্টিত কনুই বরাবার উচ্চাতা দেয়ালের দুই পার্শ্বে একটি করে আরো দুইটি সমআয়তনের কক্ষ এবং এই খাস কক্ষের তিনটিই নালাকৃতি খিলানছাদ বিশিষ্ট। দূর্গের হল কক্ষটি উত্তর-দক্ষিনে দুইটি প্রশস্ত কৌণিক খিলনের কারণে সমানভাবে তিন অংশে বিভক্ত। এই প্রশস্ত খিলানদ্বয়ের উপরেই কক্ষের নালাকৃতি খিলানছাদ সমূহ নির্মিত। খিলান ছাদগুলির শেষ অংশে একটি করে মোট ছয়টি জানালা আছে। এই ছয়টি জানালা ব্যতীতও রুমের পূর্ব দিকে উপরে আরো দুইটি জানালা রয়েছে। জানালাসমূহ দুর্গ অভ্যন্তরে আলো ও বায়ু প্রবেশের জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিলো।
দূর্গের হাম্মামখানা:
দূর্গের হাম্মামখানার হলো কক্ষটির পূর্বদিকে একটি প্রবেশ পথ দ্বারা হাম্মামখানায় প্রবেশ করতে হয়। এ হাম্মাখানটি তিনটি কক্ষ সমন্বয়ে গঠিত। কক্ষের মেঝে হতে ৬.৫ ফুট উর্ধ্বে চতুর্দিকের দেওয়াল সামান্য বাঁকা হয়ে ভেতরের দিকে এসেছে এবং বাঁকা অংশের নিম্নে কক্ষের প্রতিকোণে চারটি করে পাইপ রয়েছে। এ পাইপসমূহ ছাদের উপর হতে অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হয়েছে। এ কক্ষটির নিম্নাংশেও প্রথম কক্ষটির ন্যায় উষ্ণ বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ দূর্গেও এই স্থানটিকে হাম্মামখানা বলে অভিহিত করেছে।
দূর্গে পানি সরবরাহ:
স্থাপত্যটির প্রথমাংশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হতে একটি দেওয়াল প্রথমে পশ্চিম দিকে, পরে উত্তর-পশ্চিম দিকে এবং সর্বশেষে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়ে একটি কূপের সাথে সংযোজিত হয়েছে। এ কূপ হতে পানি পাইপের মাধ্যমে হাম্মামখানায় নেওয়া হতো।
দূর্গের অলঙ্করণ:
আধুনিক শিল্পকলা বিশারদগণের নিকট ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’ এর অলঙ্করণের জন্য সুপরিচিত। ‘কুসাইর আমরা’ নির্মাণের মাধ্যমে মুসলিম স্থাপত্যের নব দিগন্তের সূচনা হয়। ‘কুসাইর আমরা’ মুসলিম স্থাপত্যে প্রথম দিকের মৌলিক নিদর্শন হলেও মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি প্রাথমিক ইসলামী শিল্প ও স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়। স্থাপনাটি আসলে একটি বৃহত্তর কমপ্লেক্সের অবশিষ্টাংশ, যার মধ্যে একটি আসল দুর্গ অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
-মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
আফ্রিকার দেশ ঘানার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বন্দরের ঐতিহাসিক নিদর্শন হযরত বাবা সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র মসজিদে জুমুয়াহ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতার অনবদ্য নিদর্শন নাফত বা পেট্রোলিয়াম
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারতের সাদা রত্ন ঐতিহাসিক মতি মসজিদ
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নহরে জুবাইদা: ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল
১৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামকরণে তৈরী করা হয়েছিলো ভারতের যে মসজিদ: ফিরোজাবাদে যুগের সাক্ষী ঐতিহাসিক নিদর্শন কুতুব শাহি মসজিদ
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ভারতের জান্নাতবাদে ঐতিহাসিক জাহানীয়া মসজিদ
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সুবা বাংলার ঐতিহাসিক শেখ বাহার উল্লাহ শাহী জামে মসজিদ
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ঢাকায় ৩০০ বছর আগের মুঘল আমলের ঐতিহাসিক মসজিদ
২৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ফুলের মতোই সুন্দর মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় অবস্থিত পুত্রা মসজিদ
০৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক স্থপতি “মিমার সিনান” (৫ম পর্ব)
০১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












