স্থাপত্য-নিদর্শন
নহরে জুবাইদা: ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল
, ২৮ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৭ ছানী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৭ মে, ২০২৬ খ্রি:, ০৩ জৈষ্ঠ্য, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) স্থাপত্য নিদর্শন
মসজিদে নামিরা থেকে আরাফাতের ময়দান ঘুরে মুজদালিফা হয়ে মিনা যাওয়ার পথে চোখে পড়বে একটি পুরাতন স্থাপনা। স্থাপনাগুলো পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে দৃষ্টিসীমার বাইরে। যা নহরে জুবাইদা নামে পরিচিত। নহরের সমার্থক সরু, স্রোতস্বিনী, পানিধারা, খাল, নালা।
আব্বাসীয় শাসক হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফর পবিত্র মক্কা শরীফে হজ্জযাত্রীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল খনন করেছিলেন। যা হজ্জের সময় পানির অভাব দূর করে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলো। খালটি তায়েফের কাছের ঝরনা থেকে পানি এনে পবিত্র মক্কা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। জুবাইদা নিজে এই বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করে ব্যয়ভারও বহন করেন।
নহরে জুবাইদা ইসলামী প্রকৌশল ও স্থাপত্যের বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বিদ্যমান। জুবাইদা খানম অত্যন্ত বিদুষী, দ্বীনপরায়ণ ও পরোপকারী একজন নারী ছিলেন। জুবাইদা জাফর ইবনুল মানসুরের মেয়ে। জাফর ইবনুল মানসুর হারুনুর রশিদের চাচা। জুবাইদার আসল নাম ছিলো আমাতুল আজিজ। তার দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে ‘জুবাইদা’ (ছোট মাখনের টুকরা) ডাকতেন। কালক্রমে তিনি ‘জুবাইদা’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
নহরে জুবাইদা নির্মিত হয়েছিলো ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে। এটি ইরাকের নু’মান উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে তায়েফের পাশ দিয়ে আরাফাহ হয়ে পবিত্র মক্কা শরীফের দিকে পানি সরবরাহ করতো। প্রায় এক হাজার বছর ধরে সচল থাকলেও বর্তমানে কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে; তবে ব্যবহৃত হয় না।
নহরে জুবাইদা কঠিন ভূখ-ে সুড়ঙ্গ ও পানিপ্রণালি তৈরি করে, বিশাল প্রকৌশলের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিলো। এর নির্মাণে বেশ বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিলো। কঠিন শিলা কেটে খাল তৈরি করা এর অন্যতম। এটি একটি জটিল প্রকৌশল, যেখানে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, খালের অংশ এবং পানাধার নির্মাণ করা হয়েছিলো, যা পানিকে বাষ্পীভবন থেকে রক্ষা করতো।
সে সময় পবিত্র মক্কা শরীফে জমজম ছাড়া পানির উৎস ছিলো না। হজ্জে প্রচুর মানুষের ভিড়ে পানির তীব্র সংকট দেখা দিতো। উচ্চ মূল্যে পানি ক্রয় করতে হতো। খলীফা হারুনুর রশিদের আমলে পানির অভাব বেশ তীব্র ছিলো। তখন এক বালতি পানি বিক্রি হয় ২০ দিরহামে। ১৯৩ হিজরীতে তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী জুবাইদা হজ্জ পালন করতে পবিত্র মক্কা শরীফে যান। পানির সমস্যা দেখে তিনি একটি খাল কাটার সিদ্ধান্ত নেন।
নহরে জুবাইদা খননে আনুমানিক ১৭ লাখ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ হয়। জুবাইদা খানমের খাল খননের ফলে হাজিদের জন্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এই ব্যবস্থা পবিত্র মক্কা শরীফ ও আশেপাশের এলাকার কৃষকদের জন্যও বেশ উপকৃত করেছিলো। তারা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে খালের পানি ব্যবহার করতো। তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের পথে হজ্জযাত্রীদের জন্য কূপ, পানাধার এবং কৃত্রিম পুল তৈরি করেন।
‘দারব জুবাইদা’ (জুবাইদার পথ) নামে পরিচিত পথটির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। খালটি শুধু পানিই সরবরাহ করতো না বরং বাগদাদ থেকে পবিত্র মক্কা শরীফ পর্যন্ত বিস্তৃত ‘দারব জুবাইদা’কে (হজ্জযাত্রার পথ) সুগম করে তোলে। হজ্জযাত্রীদের সুবিধার জন্য পথে বিশ্রামস্থল, কূপ, পুকুর ও বাতিঘর স্থাপন করা হয়। নহরে জুবাইদা কেবল হাজিদের পানির সংকট দূর করেনি বরং শত শত বছর ধরে মুসলিম উম্মাহর সেবা ও নারীর দূরদর্শিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আজকের যুগেও অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম নারীরা অবহেলিত। সেই সময় রানী জুবাইদা কি চিন্তা করেছিলেন! এর ফলপ্রসূ বাস্তবায়নও বাকি রাখেননি। নারী জাগরণের ইতিহাসে তাকে উদাহরণ হিসেবে বলাই যায়। তিনি অনেক নারীর অনুপ্রেরণা। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে জুবাইদার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
নহরে জুবাইদা শুধু একটি পানিধারা ছিলো না, এটি রানী জুবাইদার প্রজ্ঞা, উদারতা এবং হজ্জ পালনকারী মহান আল্লাহ পাক উনার মেহমানদের প্রতি মুহব্বতের বহিপ্রকাশ ছিলো। বর্তমানে এটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত। একটি কালজয়ী স্থাপনা, যা ছিলো প্রকৌশল ও মানবতার অপূর্ব মেলবন্ধন।
নহরে জুবাইদার ভগ্নাবশেষ এখনো আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও মিনার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নহরটি এখন আর পুরোপুরি সক্রিয় পানিধারা না হলেও অনেক পর্যটক ও হাজি সাহেবরা সময় পেলেই নহরে জুবাইদা দেখতে মিনা ও আরাফাতের ময়দানে ছুটে যান।
-মুহম্মদ মুফহিম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম অবদানের এক জীবন্ত দলিল
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাজ-উল-মসজিদ ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সুনামগঞ্জে কালের সাক্ষী শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় মসজিদ
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মোঘল শাসক আওরঙ্গজেবের শাসনামল নিয়ে প্রচলিত ভাষ্য বদলে দিতে পারে ৩০০ বছর আগের নথি
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উমাইয়া আমলের মুসলিম স্থাপত্য ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আফ্রিকার দেশ ঘানার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বন্দরের ঐতিহাসিক নিদর্শন হযরত বাবা সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র মসজিদে জুমুয়াহ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতার অনবদ্য নিদর্শন নাফত বা পেট্রোলিয়াম
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারতের সাদা রত্ন ঐতিহাসিক মতি মসজিদ
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামকরণে তৈরী করা হয়েছিলো ভারতের যে মসজিদ: ফিরোজাবাদে যুগের সাক্ষী ঐতিহাসিক নিদর্শন কুতুব শাহি মসজিদ
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ভারতের জান্নাতবাদে ঐতিহাসিক জাহানীয়া মসজিদ
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












