ইসলামী শিলালিপিতে বাংলার ইতিহাসের বৈচিত্র্যময় অধ্যায়
, ০৭ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৯ ছামিন, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ১৩ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) পাঁচ মিশালী
প্রাচীন স্থাপনার দেয়ালে খোদাই করা শিলালিপি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য মাধ্যম। একদিকে এতে রয়েছে ইতিহাসের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় তথ্য, অন্যদিকে শিল্পমান বিবেচনায় এগুলো অমূল্য। বিশেষ করে আরবি ও ফারসি শিলালিপিগুলো এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন ও বিস্তারের ইতিহাস বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এই ইতিহাসের পথ ধরেই বাঙালি মুসলমানরা একসময় ইসলামি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিলো।
শিলালিপিবিদ্যার সঙ্গে বাংলার সংযোগ বেশ পুরোনো। পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে মক্কার একটি মাদ্রাসায় কর্মরত বাঙালি শিক্ষাবিদ ও গবেষক জামালউদ্দিন শিবীরের হাত ধরে মুসলিম বিশ্বে শিলালিপিবিদ্যার হাতেখড়ি হয়। তার গবেষণা দেখিয়েছিলো, প্রাচীন বিশ্বের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার হারিয়ে যাওয়া সূত্রগুলো খুঁজে পেতে এই শিলালিপিগুলো কিভাবে সহায়তা করতে পারে।
ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে বাংলা বিজয়ের পর সুলতান আলাউদ্দিন (আলি মর্দান) খলজির একটি ফারসি শিলালিপির মাধ্যমে বাংলায় আরবি ও ফারসি লিপি খোদাইয়ের ঐতিহ্য শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আরেক খলজি শাসক বলকা খান খলজির (৬২৬-৬২৮ হিজরি/১২২৯-৩০ খ্রিষ্টাব্দ) শিলালিপি প্রমাণ করে, মুসলিম শাসক ও অভিজাতদের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু থেকেই ফারসি ভাষা রাজভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
মধ্যযুগীয় বাংলার রাজধানী গৌড়ের কাছে মহদীপুর গ্রামে ‘নিম দরওয়াজা’র চমৎকার আরবি শিলালিপিটি আবিষ্কার হয়েছিলো। এটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিলালিপিগুলোর একটি। এই লিপি এবং ‘চাঁদ দরওয়াজা’র আরবি শিলালিপিটি একসময় গৌড়ের সুলতানি প্রাসাদের দুটি বিশাল প্রবেশদ্বার অলংকৃত করতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় প্রাচীন শিল্প সংগ্রাহকেরা বহু শিলালিপি পাচার করে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কর্নেল ফ্র্যাঙ্কলিন বাংলার বহু আরবি শিলালিপি ইংল্যান্ডে তার বাড়িতে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো, যার মধ্যে চাঁদ দরওয়াজার শিলালিপিটিও ছিলো। ঐতিহাসিক এই লিপিগুলো অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে, যা অন্য কোনো উৎসে পাওয়া দুষ্কর।
আরবি ও ফারসি শিলালিপি ইসলামি স্থাপত্য অলংকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পাঠ্যবস্তু, শিল্পরূপ ও গঠনগত বৈচিত্র্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাংস্কৃতিক গতিবিধি এবং ধর্মীয় রূপান্তরের প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করে। শিলালিপিতে খোদাই করা শাসকের উপাধিগুলো তাদের ক্ষমতা ও গৌরবের প্রতি পার্থিব আকাক্সক্ষা প্রকাশ করে, যা প্রায়শই ধর্মীয় আবরণে অতিরঞ্জিত থাকে।
সুলতানি আমলে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে আন্তধর্মীয় সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শিলালিপিগুলো সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম রাজবংশগুলো পাল বা সেন আমলের তুলনায় বেশি দিন টিকে ছিলো তাদের মধ্যপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। প্রচলিত ধারণায় তাদের যতটা কঠোর মনে করা হয়, বাস্তবে তারা ছিলেন অনেক বেশি সহনশীল। সুলতানি বা মোঘল যুগের কোনো শিলালিপিতেই ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের কথা লিপিবদ্ধ নেই। বরং সিলেটের ‘গায়েবি দিঘি’ মসজিদের আরবি শিলালিপিতে আন্তধর্মীয় বিবাহের প্রমাণের দেখা মেলে।
১৪৬৪ খ্রিষ্টাব্দের (৮৬৮ হিজরি) এই লিপি থেকে জানা যায়, খান জাহান রহমত খানের মা ছিলেন ‘লক্ষ¥ী’ নামের এক নারী, যিনি সিলেটে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এটি সেই সময়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শিলালিপির বয়ানে বোঝা যায়, সম্মানিত ইসলাম ধীরে ধীরে বাংলার জনজীবনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে একীভূত হয়েছিলো। এটি গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য একটি নতুন সামাজিক ব্যবস্থা ও সভ্যতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো। বগুড়ার ‘বাবরগ্রাম’ শিলালিপি (১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ/৯০৫ হিজরি) থেকে বোঝা যায়, বাংলার ইসলাম স্থানীয় উপজাতি, যাযাবর ও বিভিন্ন গোষ্ঠীকেও আপন করে নিয়েছিলো।
পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে বাংলার মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে এসব শিলালিপিতে। ১৪৯৩ খ্রিষ্টাব্দে (৮৯৮ হিজরি) উৎকীর্ণ একটি আরবি শিলালিপিতে বাংলার ‘তুঘরা’ ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলার বিভিন্ন গ্রামীণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
উত্তর আফ্রিকায় কর্মরত এক ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রশাসক একবার ইসলামি বিশ্বকে একটি ‘প্রতিধ্বনিময় বাক্সে’র (ইকো চেম্বারের) সঙ্গে তুলনা করেছিলো- যেখানে এক কোণে করা সামান্য শব্দও পুরো বাক্সজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। ইসলামি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলার ক্ষেত্রেও এই রূপকটি প্রযোজ্য।
বর্তমানে বিশ্বের দিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। স্থানীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও শিলালিপিগুলোতে আমরা যে বার্তা পাই, তা হলো ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’। এই ঐক্য দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদী বাঙালি সংস্কৃতি এবং বিশ্বজনীন ইসলামি ইতিহাস-উভয় প্রেক্ষাপটেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
দেশে প্রথম টাকার প্রচলন শুরু হয় যেদিন থেকে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
যে ভুলে লেন্স পরার সময় চোখ নষ্ট হয়
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
দেশে প্রথম টাকার প্রচলন শুরু হয় যেদিন থেকে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ডায়াবেটিসের নতুন কারণ আবিষ্কারের দাবি বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
অসংখ্য অচেনা আমের জাত! যে নামগুলোর অধিকাংশই জানা নেই কারো
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বানানোর নতুন পরিকল্পনা জানালো নাসা
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের এক সফল বিপ্লব
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
এআই চশমা পরে পরীক্ষায় নকল বাড়ছে, কীভাবে কাজ করে এটি?
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রচুর গরমে সুস্থ থাকতে যেসব বিষয় সতর্ক থাকা উচিত
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অটোরিকশার অর্থনীতি: কেন এই বাহনের এত বিপুল চাহিদা?
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হাতের লেখা কেন বর্তমান যুগেও গুরুত্বপূর্ণ
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বাংলা কিউআর কী, কেন ব্যবহার বাধ্যতামূলক?
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












